সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে), ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু (ডানে)
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে), ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু (ডানে)

মতামত

সৌদির নতুন পরিকল্পনা: ইসরায়েলকে বর্জন নাকি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল?

সৌদি আরব একটি ফাইবার অপটিক কেব্‌ল প্রকল্পে সিরিয়াকে ট্রানজিট দেশ হিসেবে বেছে নিতে চায়। এই কেব্‌লটি ভূমধ্যসাগর হয়ে সৌদি আরবকে গ্রিসের সঙ্গে যুক্ত করবে। প্রকল্পটির সঙ্গে পরিচিত দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এর আগে আলোচনা ছিল, কেব্‌লটি ইসরায়েল হয়ে যাবে। কিন্তু রিয়াদ এখন জোর দিচ্ছে সিরিয়া হয়ে গ্রিসের সঙ্গে সংযোগে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণ বদলাচ্ছে। সৌদি আরব একদিকে দামেস্কের আঞ্চলিক অবস্থান শক্ত করতে চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করতে চায়।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। গাজায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইয়েমেন, সুদান ও লোহিত সাগর ইস্যুতেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের মতপার্থক্য রয়েছে। আরব বিশ্বের মধ্যে আমিরাতই ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার।

এদিকে গ্রিস নিজেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে জ্বালানি, রিয়েল এস্টেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এথেন্স কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তবে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে গ্রিস ইসরায়েলকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখে। তুরস্কের সঙ্গে বিরোধের প্রেক্ষাপটে এথেন্স মনে করে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সক্রিয় রাখার একধরনের নিশ্চয়তা।

সৌদি আরব যদি নতুন রুটে ইসরায়েলকে বাদ দেয়, তাহলে গ্রিসের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।

ফাইবার অপটিক কেব্‌ল আলোর স্পন্দনের মাধ্যমে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ডিজিটাল তথ্য পৌঁছে দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ইউরোপে তথ্য পাঠানোর জন্য এই অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়ছে।

২০২২ সালে গ্রিস ও সৌদি আরব ‘ইস্ট টু মেড ডেটা করিডর’ বা ইএমসি প্রকল্প ঘোষণা করে। এটি সৌদি টেলিকম কোম্পানি এসটিসি, গ্রিসের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী পিপিসি, গ্রিক টেলিকম কোম্পানি এবং স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশন কোম্পানি টিটিএসএ–এর যৌথ উদ্যোগ।

রিয়াদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের দৃষ্টিতে দামেস্ক আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। তারা চায় সড়ক, কেব্‌ল ও রেলপথ সিরিয়া হয়ে যাক।

সে সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা চালাচ্ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যা জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইসরায়েল লেবানন, সিরিয়া ও ইরানেও হামলা চালায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাবমেরিন ফাইবার অপটিক কেব্‌ল বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান রল বলেন, আগে কয়েকটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েল হয়ে যাওয়ার। এই প্রকল্পও তার একটি ছিল। এখন সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সিরিয়া হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নতুন বিষয়। ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে বিকল্প স্থলপথ খোঁজা হচ্ছে। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আস্থা তৈরি হলে এটি একটি বিকল্প হতে পারে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে গ্রিসের পিপিসির একটি উপস্থাপনায় দেখা যায়, ইএমসি নেটওয়ার্কে সিরিয়ার সংযোগ দেখানো হয়নি। সেখানে করিডরটি ইসরায়েল ও তার উপকূলীয় জলসীমা হয়ে গেছে বলে চিত্র রয়েছে।

আরেকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব গ্রিসের সঙ্গে একটি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্পও কল্পনা করছে, যা ইসরায়েলকে এড়িয়ে সিরিয়া হয়ে যাবে। এটি হবে উচ্চ ভোল্টেজ ডাইরেক্ট কারেন্ট সংযোগের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের মধ্যে বিদ্যুৎ আদানপ্রদান।

সৌদি আরব সিরিয়াকে এসব প্রকল্পে যুক্ত করতে চাওয়ায় বোঝা যায়, রিয়াদ আঞ্চলিক মিত্রদের শক্ত করতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ইঙ্গিতও দেয়।

রিয়াদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের দৃষ্টিতে দামেস্ক আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। তারা চায় সড়ক, কেব্‌ল ও রেলপথ সিরিয়া হয়ে যাক।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসটিসি ঘোষণা দিয়েছে, তারা সিরিয়ার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত একটি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিরিয়াকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত করাই লক্ষ্য।

রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন বলেন, ইসরায়েলের বদলে সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা দেখায়, অঞ্চলটি কতটা নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এটি সিরিয়াকে আঞ্চলিক পরিসরে ফিরিয়ে আনার সৌদি প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পর্ক কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়।

২০২২ সালে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল। বর্তমান অবস্থান রিয়াদের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

গ্রিস একাধিক কেব্‌ল রুটের কেন্দ্র হতে চায়। উপসাগরীয় দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং সিঙ্গাপুরের মতো পূর্ব এশীয় ব্যবসাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ জোরদার করছে।

একসময় ইউরোপে প্রবেশের প্রধান বন্দর ছিল মার্সেই ও জেনোয়া। এখন রুট বৈচিত্র্যের কারণে প্রবেশপথ পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। এতে গ্রিস ও তুরস্ক নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বহু উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প অতীতে বাস্তবায়িত হয়নি। গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলকে যুক্ত করার গ্যাস পাইপলাইন পরিকল্পনা থেমে গেছে। একইভাবে গ্রেট সি ইন্টারকানেক্টর কেব্‌ল প্রকল্পও একাধিকবার বিলম্বের মুখে পড়েছে।

তুরস্ক পূর্ব ভূমধ্যসাগরের একটি বড় অংশে দাবি জানায়, যা গ্রিসের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। এ ছাড়া ভারত, গ্রিস, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্ত করার একটি বাণিজ্য করিডর নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইস্ট টু মেড ডেটা করিডর তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্পে অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ। গ্রিক ও সৌদি ব্যাংক প্রকল্পের ৬০ শতাংশ অর্থায়নে চুক্তি করেছে। ২০২৩ সালে ইএমসি আলকাতেল সাবমেরিন নেটওয়ার্কসের সঙ্গে দুটি সাবসি ও স্থলভিত্তিক ডেটা কেব্‌ল নির্মাণে সরবরাহ চুক্তি সই করে।

  • শন ম্যাথিউস সাংবাদিক মিডল ইস্ট আই

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত