
সামাজিক মাধ্যমের টুকরা টুকরা আলাপের গণ্ডি পেরিয়ে এখন মূলধারার গণমাধ্যমেও উঠে আসছে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর নিপীড়নের ভয়াবহ কাহিনি। এ ধরনের ঘটনায় আলেমসমাজের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন মনযূরুল হক।
লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা এক শিক্ষক দুই হাতে ধরা মোটা একটি লাঠি দিয়ে ৮-৯ বছরের এক শিশুকে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। হাত ক্লান্ত হয়ে পড়লে মারলেন লাথি। এরপর শিশুর সামনে বসে তার মুখে-পেটে ঘুষির পর ঘুষি চালালেন। একই বয়সী কতগুলো শিশু লাইন বেঁধে বসে আতঙ্ক নিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই বর্বর দৃশ্যটি দেখেছেন অসংখ্য মানুষ; আমিও দেখেছি।
যদিও এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়। গৌরনদী মাদ্রাসা-মসজিদের দোতলায় মুফতি হুজুর দুই হাতে বাঁশের মোটা লাঠি দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পেটাচ্ছেন, আর আমরা ছোট ছোট শিশুরা তাদের কাতরাতে দেখছি, তীব্র চিৎকার শুনছি—এই দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে। ছাত্রদের অপরাধ ছিল—ফুটবল বিশ্বকাপের সময় তারা টেলিভিশনে খেলা দেখতে গিয়েছিল। আর হুজুরের হাতের লাঠিটি ছিল আসলে রান্নাঘরের বিশাল ডেগের তরকারি নাড়ানোর হাতা।
মনে পড়ে, হুজুরের ছুড়ে মারা বেতের আগা নেয়ামতের ঊরুতে এসে গেঁথে গেছে; রক্তে পায়জামা ভিজে গেছে ছেলেটার। মনে পড়ে, হলরুমের মতো বিরাট হেফজখানার এক মাথা থেকে হুজুর লাথি মারা শুরু করেছেন, শিশুটি গড়াতে গড়াতে অন্য মাথায় চলে গেছে। কারও হাত-পায়ের সঙ্গে শিকল দিয়ে ভারী গাছের টুকরা বেঁধে দেওয়া—যেন মাদ্রাসা থেকে পালাতে না পারে।
এতে যে শিক্ষকেরা খুব দুঃখিত হতেন তা নয়; বরং সম্প্রতি টিকটকে যেমন ভেসে বেড়াচ্ছে—এক শিক্ষক বাচ্চার মুখে বেত দিয়ে খোঁচা মারছেন এবং ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, ‘বাচ্চাদের কান্না করাতে ভালোই লাগে’—ঠিক তেমনই আমাদের শিক্ষকেরাও ছাত্রদের দেওয়া শাস্তি নিয়ে নানান মুখরোচক টিপ্পনী কাটতেন। অভিভাবকেরাও ছিলেন এক কাঠি সরেস। তারা সন্তানকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে বলে আসতেন, “হুজুর, গোশত আপনার, আর হাড্ডি আমার।”
তবে শুধু শারীরিক শাস্তি দেওয়াই মাদ্রাসাশিক্ষকদের একমাত্র অপরাধ নয়, সামাজিক মাধ্যমের টুকরা টুকরা আলাপের গণ্ডি পেরিয়ে এখন মূলধারার গণমাধ্যমেও উঠে আসছে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ কাহিনি। ধারণা করি, আমাদের সময়ে শিক্ষক কর্তৃক নিপীড়নের ঘটনা শোনেনি, এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এখন তো মহিলা মাদ্রাসায় ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাও সামনে আসছে; এমনকি উঠে আসছে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড কিংবা আত্মহত্যার অভিযোগও।
যেমন গত ১৯ মে দেশব্যাপী রামিসা হত্যাকাণ্ডের আলোচনার দিনই আমরা দেখলাম বনশ্রীর একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের শিশু আবদুল্লাহর ঝুলন্ত লাশ, যার পায়ুপথে ছিল যৌন নির্যাতনের আলামত। দেখলাম কুমিল্লার এক মহিলা মাদ্রাসায় একের পর এক অস্বাভাবিক মৃত্যু, যার ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এসেছে নির্যাতনের চিহ্ন। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে পাঠরত শিশুর ছবি বা ভিডিও রেকর্ড করে আপত্তিকর ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যসহ পোস্ট করছেন খোদ শিক্ষক।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দিন দিন বেড়ে মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নিপীড়নের ঘটনায় অনেকগুলো অপরাধের বিন্যাস ঘটেছে: ১. শিশুকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া; ২. ছেলেশিশুকে ধর্ষণ করা; ৩. মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করা, ৪. নিপীড়নের পর হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার পরিবেশ তৈরি করা, ৫. শিশু নিপীড়নের দৃশ্য রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা, ৫. শিশুর ছবি/ভিডিও নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যসহ ছড়িয়ে দেওয়া। এর প্রতিটিই বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ এবং এর শাস্তি সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
আইন থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগের চিত্র পুরোই উল্টো—‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। এর একটি চরম উদাহরণ টাঙ্গাইল সদরের একটি মাদ্রাসায় ৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর যৌন হেনস্তার ঘটনা। অভিভাবকের অভিযোগ, মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শিশুদের জিনের ভয় দেখিয়ে শরীরের সংবেদনশীল স্থানে স্পর্শ করতেন এবং তা মুঠোফোনে ধারণের নির্দেশ দিতেন। অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হলেও মাত্র দুই মাস পর জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন নামে আরেকটি মাদ্রাসা খুলে বসেন; তা-ও আবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে!
এটা কীভাবে সম্ভব হলো? কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ বোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া’র প্রধান পরিচালক মাওলানা নদভীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি নেত্রনিউজকে জানান, ‘এমন হতে পারে যে নতুন রেজিস্ট্রেশনটি ভিন্ন নামে অন্য কাউকে দিয়ে করানো হয়েছে।’ এমনকি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আইনগতভাবে তো কিছু করার ক্ষমতা বোর্ডের নেই।’ প্রশ্ন হলো—অভিযুক্তকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে মামলা করার ক্ষমতাও কি বোর্ডের নেই? তারা কি তা করেছেন?
এর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, গত তিন মাসে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ৫৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫২টিই মিথ্যা ও চক্রান্তমূলক। যদিও তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি এবং কী ধরনের তদন্ত পরিচালনা করেছেন, গণমাধ্যমে তা জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। একের পর এক শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠান ও বোর্ডের প্রথম তাগিদ কেন নিজেদের ‘নিরপরাধ’ প্রমাণ করা হলো, কেন জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলো না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল কয়েকজন বিকৃত মানুষের নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা।
ডেইলি স্টার–এ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি’র দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, শিশু নিপীড়নের সিংহভাগ ঘটে পরিবারে বা পরিচিত পরিবেশে। মাদ্রাসার পাশাপাশি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গৃহশিক্ষকদের হাতেও শত শত শিশু নিপীড়িত হচ্ছে। সুতরাং সমস্যাটিকে শুধু ‘মাদ্রাসার সমস্যা’ বলে সরলীকরণ করার সুযোগ নেই। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দায়ও তাতে কমে না। কারণ, প্রশ্নটা তুলনামূলক অপরাধের হার নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, যেখানে অপরাধ ঘটছে, সেখানে প্রতিষ্ঠান ও বোর্ড কী ভূমিকা পালন করছে।
অপরাধবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব হলো ‘রুটিন অ্যাকটিভিটি থিওরি’। এটি বলে, যেকোনো অপরাধ ঘটার জন্য তিনটি উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে হয়—একজন অপরাধপ্রবণতাসম্পন্ন ব্যক্তি, একজন সহজলভ্য শিকার এবং একজন সক্ষম তদারককারীর অনুপস্থিতি।
শিশুদের আবাসিক হেফজখানা বা মাদ্রাসার বিদ্যমান কাঠামো এই তিনটি শর্তকেই অস্বাভাবিকভাবে সহজ করে দেয়। শিশুটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন; সেখানে তদারকি ব্যবস্থা একজন বা দুজন শিক্ষকের হাতে কেন্দ্রীভূত; কোনো তৃতীয় পক্ষের নজরদারি নেই এবং শিক্ষকের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া হয়।
এটি কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহজাত দোষ নয়—যেকোনো বদ্ধ, তদারকহীন ও একচ্ছত্র কর্তৃত্বের প্রাতিষ্ঠানে এই ঝুঁকি বাড়ে (বিশ্বজুড়ে এতিমখানা, বোর্ডিং স্কুল বা স্পোর্টস একাডেমিতেও একই প্যাটার্ন দেখা গেছে)। কিন্তু কাঠামোগত ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও তা প্রশমনের ব্যবস্থা না নেওয়াটাই বড় দায় তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এ ধরনের প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা হয় ‘মোরাল লাইসেন্সিং’ দিয়ে। ধর্মীয় পরিচয় একজন মানুষকে সমাজের চোখে এমন এক জ্যোতির্বলয় এনে দেয়, যার আড়ালে সন্দেহ সহজে প্রবেশ করতে পারে না। জোব্বা-টুপি, কোরআনের হাফেজ কিংবা ‘হুজুর’ পরিচয়—এসব সমাজে গভীর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। অপরাধী সচেতন বা অবচেতনভাবে এটাকেই হিসেবে ব্যবহার করে।
টাঙ্গাইলের যে মাদ্রাসায় শিক্ষক শিশুদের ‘জিনের ভয়’ দেখিয়ে স্পর্শ করতেন, সেটিও এমন এক ধ্রুপদি কৌশল। এখানে ভীতি ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব মিলিয়ে শিশুকে এমন এক মানসিক অবস্থায় রাখা হয়, যেখানে সে প্রতিরোধ বা প্রকাশের কথা কল্পনাও করতে পারে না। আর যখন সত্য প্রকাশ পেয়েই যায়, তখন প্রতিষ্ঠান যদি শিশুর কথা বিশ্বাস না করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন ভুক্তভোগী দ্বিতীয়বার আঘাত পায়। মনোবিজ্ঞানে একে বলে ‘ইনস্টিটিউশনাল বিট্রেয়াল’ (প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসভঙ্গ), যা মূল নিপীড়নের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতি তৈরি করে।
আবাসিক ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কেবল অভিভাবকের অন্ধবিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও মাদ্রাসা বোর্ড—উভয়েরই দায়। কাঠামোগত ঝুঁকি জানার পরও প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিরোধের বদলে অপরাধীকে রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তবে সেই নিষ্ক্রিয়তা অপরাধের সহযোগী হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। আলেমসমাজ যদি নিজেদের ভেতরের এই পচন নিজেরা পরিষ্কার না করে, তবে ইতিহাস তাদের ধর্মের রক্ষক হিসেবে নয়, বরং অপরাধের নীরব সহযোগী হিসেবেই চিহ্নিত করবে।
এখানে দাঁড়িয়ে বেফাকের ‘প্রোপাগান্ডা’ বক্তব্যকে সুবিচারের সঙ্গে পরীক্ষা করা জরুরি। এই আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক নয়, কোনো কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ভুল–বোঝাবুঝি থেকেও আসতে পারে—যেমনটা ৭ বছর জেল খেটে আসা নেত্রকোনার নিরপরাধ শিক্ষক মোজাফ্ফরের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। একইভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগের ঝুঁকিও বাস্তব। কিন্তু তার সমাধান সত্য অস্বীকার করা নয়, বরং স্বচ্ছতা আনা। মিথ্যা অভিযোগের দাবি সত্যি হলে তার প্রমাণ হলো, স্বাধীন তদন্তের ফলাফল উপস্থাপন করা। বিবৃতিতে কেবল একটি সংখ্যা বলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
এখানে আরও একটি দ্বন্দ্ব কাজ করে, যাকে দর্শনের ভাষায় বলা যায় ‘পবিত্রতার ভার’। কোনো প্রতিষ্ঠান যত বেশি ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক হয়ে ওঠে, তার সমালোচনাকে তত বেশি ‘ধর্মের ওপর আক্রমণ’ বলে ভুল বোঝা হয়। এই ভুল–বোঝাবুঝিই সমালোচককে থামিয়ে দেয় আর অপরাধীকে দেয় নির্বাধ সুযোগ। ইসলামি আইনশাস্ত্র অবশ্য এর একটি কার্যকর সমাধান দিয়েছে। ফিকহের একটি স্বীকৃত নীতি হলো ‘সাদ্দুজ জারায়ে’ (সদ-উদ্-জারা’ই), অর্থাৎ ‘ক্ষতির পথ বা উপায়কে আগেভাগে বন্ধ করা’। যে নীতির প্রয়োগ মাদ্রাসায় সবার আগে ঘটার কথা ছিল, বাস্তবে তা অনুপস্থিত।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শিশুকে বেধড়ক মারধরের সেই শিক্ষককে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো নজির কি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ স্থাপন করেছে? বরং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার মধ্যেই অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রে’র (আসক) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরই মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে অন্তত ৫২ জন শিশু, যাদের মধ্যে ৩ জন প্রাণ হারিয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের মাদ্রাসাগুলোতে অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, সিংহভাগ ঘটনাই স্থানীয় সালিসে ধামাচাপা পড়ে যায়।
মাদ্রাসায় নিপীড়নের এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, অন্যান্য দেশেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে, তবে তারা সংস্কারের পথ বেছে নিয়েছে। সেনেগালে ‘দারা’ (আবাসিক কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র) নামক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বছরের পর বছর নির্যাতন চলত। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থার (এসিইআরডব্লিউসি) রায়ের পর রাষ্ট্র দারাগুলোকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় এনে ‘আধুনিক দারা’ গড়ার কর্মসূচি শুরু করে।
পাকিস্তানে ২০২১ সালে মুফতি আজিজুর রহমান নামের এক শীর্ষ শিক্ষকের ধর্ষণের ভিডিও ফাঁসের পর তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর মাদ্রাসা বোর্ডগুলো কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন করে এবং ফেডারেল শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব মাদ্রাসাকে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসে। ইন্দোনেশিয়ায় ‘পেসানত্রেন’ বা বোর্ডিং স্কুলগুলোতে নিপীড়ন বন্ধে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ধর্ম মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। প্রতিটি মাদ্রাসায় ‘চাইল্ড প্রোটেকশন টাস্কফোর্স’ গঠন, গোপন কমপ্লেইন বক্স, হটলাইন চালু এবং শিক্ষক নিয়োগে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা (সাইকোলজিক্যাল স্ক্রিনিং) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকায় শিক্ষক নিয়োগে কোনো পূর্ব-রেকর্ড যাচাই হয় না, মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিং নেই এবং ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর সুরক্ষা বিধান তদারকির কোনো স্বাধীন প্রক্রিয়া নেই। এই শূন্যতা পূরণে প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মীদের অতীত রেকর্ড যাচাই, একান্তে সাক্ষাৎ সীমিত করার নীতিমালা, গোপন অভিযোগের হটলাইন এবং বোর্ড-স্বীকৃত স্বাধীন শিশু সুরক্ষা সেল গঠন করা জরুরি। পাশাপাশি ছোট শিশুদের আবাসিক হেফজ–ব্যবস্থার বদলে অনাবাসিক বিকল্প বিস্তৃত করা উচিত, যেখানে অভিভাবকদের নিয়মিত উপস্থিতি সম্ভব।
মহানবী (সা.) থেকেও একই রকম একটি নির্দেশনা পাওয়া যায়। কয়েকজন কিশোর-তরুণ তাঁর কাছে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য এলে তিনি তাদের সর্বোচ্চ ২০ দিন থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপর পরিবারের প্রতি তাদের আকুলতা দেখে সস্নেহে বলেছিলেন, ‘তোমরা ফিরে যাও, পরিবারের সঙ্গে গিয়ে থাকো, তাদের ধর্মীয় শিক্ষা দাও এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করো’ (সহিহ্ মুসলিম, হাদিস: ৬৩১)। তাহলে ৬ থেকে ১০ বছরের শিশুদের বছরের পর বছর আবদ্ধ কামরায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার আয়োজন কীভাবে ন্যায়সংগত হতে পারে?
আবাসিক ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কেবল অভিভাবকের অন্ধবিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও মাদ্রাসা বোর্ড—উভয়েরই দায়। কাঠামোগত ঝুঁকি জানার পরও প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিরোধের বদলে অপরাধীকে রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তবে সেই নিষ্ক্রিয়তা অপরাধের সহযোগী হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। আলেমসমাজ যদি নিজেদের ভেতরের এই পচন নিজেরা পরিষ্কার না করে, তবে ইতিহাস তাদের ধর্মের রক্ষক হিসেবে নয়, বরং অপরাধের নীরব সহযোগী হিসেবেই চিহ্নিত করবে।
মনযূরুল হক, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, ধর্ম বিভাগ, প্রথম আলো
মতামত লেখকের নিজস্ব