
‘বৈশ্বিক লক্ষ্য’ উন্নয়নের জন্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য নিজে উন্নয়ন ঘটায় না। পরিবর্তন ঘটে যখন সক্ষম রাষ্ট্র, সচেতন নাগরিক, স্বাধীন গবেষক এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান সেই লক্ষ্যকে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেয়। লিখেছেন এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ।
১৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বার্ষিক ‘এসডিজি মোমেন্ট ২০২৬’ শুরু হয়েছে। ‘টুগেদার, উই ক্যান ডু ইট’ আহ্বান সামনে রেখে আয়োজনটিতে বিশ্বনেতাদের বার্তা ও সংলাপের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর রূপান্তরের অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ২০৩০ এজেন্ডার সময়সীমা দ্রুত ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে এর উদ্দেশ্য বৈশ্বিক অঙ্গীকারে নতুন গতি আনা। কিন্তু এমন আয়োজনের সময় আমরা একটি সহজ প্রশ্ন করতে পারি: আন্তর্জাতিকভাবে লক্ষ্য ও সময়সীমা নির্ধারণ করলেই কি কোনো দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়?
প্রশ্নটি শুনতে সরল, কিন্তু উত্তরটি সহজ নয়। ধরুন, একটি দেশ দারিদ্র্য কমাল, শিশুমৃত্যু হ্রাস করল বা বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়াল। আমরা কীভাবে জানব, এই অগ্রগতি জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্যের কারণে ঘটেছে? একই সময়ে দেশটির অর্থনীতি বেড়েছে, সরকারের সক্ষমতা উন্নত হয়েছে, নতুন সামাজিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে কিংবা নাগরিকেরা অধিক জবাবদিহি দাবি করেছেন। বৈশ্বিক লক্ষ্য না থাকলেও কি অগ্রগতিটি ঘটত?
আবার উল্টো প্রশ্নও করা যায়। একই লক্ষ্য, সূচক ও ২০৩০ সময়সীমা মেনে চলার অঙ্গীকার করার পরও কিছু দেশ দ্রুত এগোয়, অন্যরা কেন পিছিয়ে থাকে? লক্ষ্য যদি সবার জন্য অভিন্ন হয়, ফল এত অসম কেন?
প্রায় দুই দশক ধরে এসব প্রশ্নই আমাকে এমডিজি ও এসডিজি নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী রেখেছে। যত বেশি দেশের তথ্য দেখেছি, ততই মনে হয়েছে—বৈশ্বিক লক্ষ্যকে একদিকে সম্পূর্ণ সাফল্য, অন্যদিকে নিছক আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা—দুটিই অতিসরলীকরণ। আসল প্রশ্ন হলো, কখন একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য দেশের ভেতরে পরিবর্তনের শক্তি হয়ে ওঠে এবং কখন তা কাগজে-কলমে অঙ্গীকার হয়েই থেকে যায়।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির সবচেয়ে প্রচারিত সাফল্য ছিল চরম দারিদ্র্য হ্রাস। ২০০০ সালে এমডিজি গৃহীত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমেছে। এর একটি অংশ দেখে বলা যায়, বৈশ্বিক লক্ষ্য কাজ করেছে। এমডিজি দারিদ্র্যকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে এনেছে, অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতা সংগঠিত করেছে এবং সরকারগুলোর ওপর ফল দেখানোর চাপ সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু সময়রেখাটি একটু পেছনে নিলে গল্পটি জটিল হয়ে যায়। চীন ও ভিয়েতনাম বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ উন্নয়ন-আলোচনার জনপ্রিয় ভাষা হয়ে ওঠার আগেই কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছিল। ভিয়েতনামে ১৯৯০-এর দশকে ‘দোই মোই’ (অর্থনৈতিক সংস্কার বা নতুনীকরণ) সংস্কারের পর জাতীয় দারিদ্র্যের হার প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। অন্যদিকে একই এমডিজি কাঠামোর অংশ হয়েও নাইজেরিয়ায় এমডিজি অভিযানের দ্বিতীয়ার্ধে দারিদ্র্য বেড়েছিল।
এসডিজি বিশ্বকে একটি অভিন্ন ভাষা দিয়েছে। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, বৈষম্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিকে পরস্পর সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে দেখতে সাহায্য করেছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষে কিছু বঞ্চনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কঠিন করেছে। কিন্তু অভিন্ন ভাষা কখনো অসম ক্ষমতা আড়াল করতে পারে; অভিন্ন সূচক স্থানীয় অগ্রাধিকারকে সরিয়ে দিতে পারে; আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা বাস্তব পরিবর্তনের বদলে দৃশ্যমান অনুকরণকে উৎসাহিত করতে পারে।
এই বিপরীত অভিজ্ঞতা আমাকে সহকর্মী ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আন্তোনিও সাভোইয়ার সঙ্গে ৮৯টি উন্নয়নশীল দেশের তথ্য পরীক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের প্রশ্ন ছিল: ২০০০ সালে এমডিজি গ্রহণের পর দারিদ্র্য হ্রাসের গতি সত্যিই বেড়েছিল কি? আর একই বৈশ্বিক লক্ষ্য অনুসরণ করেও ফল এত আলাদা হলো কেন?
‘পভার্টি রিডাকশন ডিউরিং ১৯৯০–২০১৩: ডিড মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস অ্যাডপশন অ্যান্ড স্টেট ক্যাপাসিটি ম্যাটার?’ শীর্ষক গবেষণায় আমরা দেখতে পাই, এমডিজি গ্রহণের পর দারিদ্র্য হ্রাসের গতি বেড়েছিল। অর্থাৎ বৈশ্বিক লক্ষ্য একেবারেই অকার্যকর ছিল—এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু যেসব রাষ্ট্র ১৯৯০ সালেই নিজেদের ভূখণ্ড পরিচালনা, নীতি সমন্বয় এবং নাগরিকদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সক্ষম ছিল, তারাই দ্রুত দারিদ্র্য কমিয়েছে এবং এমডিজির দারিদ্র্য-লক্ষ্য অর্জনে বেশি সফল হয়েছে।
এই ফলাফলকে একটি দৌড় প্রতিযোগিতার উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। আন্তর্জাতিক লক্ষ্য হয়তো সবার জন্য একই গন্তব্য নির্ধারণ করে এবং দৌড় শুরুর সংকেত দেয়। কিন্তু প্রতিটি দেশের সূচনাবিন্দু, প্রস্তুতি, প্রতিষ্ঠান ও পথের অবস্থা এক নয়। শুধু গন্তব্য ঘোষণা করলেই সবার সেখানে পৌঁছানোর ক্ষমতা সমান হয়ে যায় না।
এই শিক্ষা শুধু দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের দিকে তাকালেও একই ধাঁধা দেখা যায়। মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজেশ রামাচন্দ্রনের সঙ্গে আমি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আটটি দেশের পরিবারভিত্তিক জরিপের তথ্য ব্যবহার করে চাইল্ড স্ট্যান্টিং বা শিশু খর্বকায়তার পরিবর্তন পরীক্ষা করেছি। আমরা এমডিজির আগের সময়, এমডিজি যুগ এবং এসডিজি অভিযানের প্রথমার্ধে জন্ম নেওয়া শিশুদের তুলনা করেছি।
সামগ্রিক ফল আশাব্যঞ্জক। এসডিজি সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা আগের প্রজন্মের তুলনায় সাধারণভাবে বয়স অনুযায়ী উন্নত উচ্চতা অর্জন করেছে। কিন্তু দেশভেদে বড় পার্থক্য রয়ে গেছে। ভারতের আর্থিক সম্পদ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রশাসনিক পরিধি নেপালের তুলনায় অনেক বড়। অথচ দরিদ্র নেপাল শিশু খর্বকায়তা কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার তুলনায়ও ভারতে খর্বকায়তার হার স্থায়ীভাবে বেশি।
এখানে একজন শিক্ষার্থী যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন: এর অর্থ কি নেপালের রাষ্ট্র ভারতের চেয়ে সব দিক থেকে বেশি সক্ষম? অবশ্যই নয়। একটি তুলনা থেকে এমন বিস্তৃত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। গবেষণার কাজও দ্রুত কোনো দেশকে সফল বা ব্যর্থ ঘোষণা করা নয়। বরং এই অমিল আমাদের নতুন প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা, আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং সম্পদকে মানুষের জীবনের উন্নতিতে রূপান্তরের ক্ষমতা—কোন সমন্বয়টি পার্থক্য তৈরি করছে?
এসব তুলনার একটি সাধারণ বার্তা আছে। বৈশ্বিক লক্ষ্য একটি দেশকে বলে দিতে পারে কোথায় যেতে হবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ, যানবাহন এবং চালকের দায়িত্ব জাতীয় প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হয়।
এসব প্রশ্ন নিয়েই চার বছর আগে জাতিসংঘের এসডিজি একাডেমির গবেষক ড. অ্যাম্বার ওয়েবের সঙ্গে আমার একটি আলাপ শুরু হয়েছিল। অ্যাম্বার তখন জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের এসডিজি একাডেমিতে কর্মরত। আমরা দুজনেই এসডিজির প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করতাম—বিশেষ করে এসডিজি ৪-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার অঙ্গীকারে।
কিন্তু একটি এজেন্ডার উদ্দেশ্যকে সমর্থন করা এবং তার সব অনুমান, সূচক ও বাস্তবায়নপদ্ধতি প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া এক কথা নয়। বরং কোনো লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ বলেই তাকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? আন্তর্জাতিক তুলনার উপযোগী সূচক কি একটি দেশের শিক্ষার মান ও উদ্দেশ্য যথাযথভাবে ধারণ করতে পারে? তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা দুর্বল হলে পরিমাপ করা অগ্রগতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আর বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণে যাঁরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কতটা স্থান পায়?
আমাদের আলাপে পরে যোগ দেন বৈশ্বিক শিক্ষা-শাসনের গবেষক ডি ব্রেন্ট এডওয়ার্ডস জুনিয়র। এরপর আমরা নিজেদের মধ্যে উত্তর খোঁজার পরিবর্তে আলোচনার পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে গবেষক ও পেশাজীবীদের আমন্ত্রণ জানাই। আমরা তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বলিনি। জানতে চেয়েছি: এসডিজি ৪ কোথায় অগ্রগতি এনেছে, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে, এর অন্তর্নিহিত ধারণাগুলোর কোনটি সমস্যাজনক এবং ২০৩০ পর্যন্ত কী ভিন্নভাবে করা প্রয়োজন?
এই আলোচনা থেকে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীর একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেখানে ২৭টি ভাষ্যে শিক্ষা অর্থায়ন, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, পরিমাপ, সংকটকবলিত অঞ্চলে শিক্ষা, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের জ্ঞানের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি উঠে আসে।
সব লেখক একমত হননি। সেটিই ছিল প্রকল্পটির শক্তি। কেউ এসডিজিকে অভূতপূর্ব একটি অভিন্ন কাঠামো হিসেবে দেখেছেন, যা মনোযোগ, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার সংগঠিত করেছে। অন্যরা প্রশ্ন তুলেছেন—অভিন্ন সূচক কি শিক্ষার স্থানীয় অর্থকে সংকুচিত করছে? আন্তর্জাতিকভাবে মানসম্মত তথ্য কি জাতীয় নীতির প্রয়োজন মেটাচ্ছে? বৈশ্বিক লক্ষ্য কি কখনো পরিবর্তনের পরিবর্তে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অনুকরণ তৈরি করছে?
একজন গবেষক বা শিক্ষার্থীর জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে: মতভিন্নতা সব সময় জ্ঞানচর্চার ব্যর্থতা নয়। সবাইকে দ্রুত একমত করানোর চেয়ে কোন যুক্তি কোন প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কী বাদ দিচ্ছে এবং কোন পরিস্থিতিতে ভুল প্রমাণিত হতে পারে—সেগুলো বোঝা বেশি জরুরি।
বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশের পর আমাদের কাজ শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু ২৭টি ভাষ্য যত প্রশ্ন তুলেছিল, একটি সাময়িকীর সীমিত পরিসরে তার সব কটির গভীরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমরা আলোচনাটিকে একটি বইয়ে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিই। উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে আরও গবেষককে যুক্ত করা হয়, আগের যুক্তিগুলো বিস্তৃত করা হয় এবং নতুন বিষয় ও প্রমাণ অন্তর্ভুক্ত হয়।
সেই কাজের ফল, পালগ্রেভ ম্যাকমিলান থেকে দ্য গ্লোবাল গভর্ন্যান্স অব এডুকেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বইটি এই মাসে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির উদ্দেশ্য এসডিজির পক্ষে প্রচারণা চালানো নয়, আবার এসডিজিকে বাতিল করাও নয়। আমরা জানতে চেয়েছি: এজেন্ডাটির কোন অবদান সংরক্ষণ করা প্রয়োজন? কোন দিকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত ফল তৈরি করছে? সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা কেন এখনো এটি নিয়ে ভাবি? আর ভবিষ্যতে কী ভিন্নভাবে করা উচিত?
এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। এসডিজি বিশ্বকে একটি অভিন্ন ভাষা দিয়েছে। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, বৈষম্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিকে পরস্পর সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে দেখতে সাহায্য করেছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষে কিছু বঞ্চনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কঠিন করেছে। কিন্তু অভিন্ন ভাষা কখনো অসম ক্ষমতা আড়াল করতে পারে; অভিন্ন সূচক স্থানীয় অগ্রাধিকারকে সরিয়ে দিতে পারে; আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা বাস্তব পরিবর্তনের বদলে দৃশ্যমান অনুকরণকে উৎসাহিত করতে পারে।
এসডিজির শেষ কয়েক বছরে বিএনপি সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমরা লক্ষ্যগুলোর প্রতি কতবার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি, তা নয়। প্রশ্নটি হলো—প্রমাণের আলোকে নিজেদের নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং কখনো নিজেদের বিশ্বাস সংশোধন করার সক্ষমতা আমাদের আছে কি না।
চার বছর একটি বইয়ের জন্য দীর্ঘ সময় মনে হতে পারে। দ্রুত প্রকাশ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও সংক্ষিপ্ত নীতিবাক্যের যুগে এত সময় নেওয়া প্রায় অস্বাভাবিক। কিন্তু এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াই আমাকে আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে: টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু দ্রুত সমাধান নয়, ধীর চিন্তাও প্রয়োজন।
ধীর চিন্তা মানে জরুরি কাজ স্থগিত রাখা নয়। এর অর্থ হলো, কোনো আকর্ষণীয় ধারণাকে কর্মসূচিতে রূপান্তরের আগে তার অনুমান পরীক্ষা করা; ভিন্নমত শোনা; তথ্যের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা; ফল না এলে পথ সংশোধন করা; এবং একটি সফল উদাহরণ অন্যত্র নকল করার আগে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা।
শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের তাই একটি অনুরোধ করতে চাই। এসডিজিকে শুধু পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করার ১৭টি রঙিন লক্ষ্য হিসেবে দেখবেন না। আবার এটিকে আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্রের অর্থহীন প্রকল্প বলেও উড়িয়ে দেবেন না। বরং প্রতিটি দাবির সামনে কয়েকটি প্রশ্ন রাখুন: অগ্রগতি কীভাবে মাপা হচ্ছে? তথ্যটি কে তৈরি করেছে? গড়ের আড়ালে কারা বাদ পড়েছে? একই নীতি এক দেশে কাজ করলেও অন্য দেশে কেন ব্যর্থ হতে পারে? আর কোনো সরকার লক্ষ্য ঘোষণা করার পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও জবাবদিহিও তৈরি করছে কি?
এই সপ্তাহের ‘এসডিজি মোমেন্ট’ বিশ্বনেতাদের বার্তার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর রূপান্তরের অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প তুলে ধরবে। এসব গল্প প্রয়োজন—সম্ভব পরিবর্তনের উদাহরণ মানুষকে আশাবাদী করে। কিন্তু আয়োজনটির ‘টুগেদার, উই ক্যান ডু ইট’ আহ্বানের সঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতাও জুড়ে দিতে হবে: অনুপ্রেরণা ও প্রমাণ এক জিনিস নয়। একটি ভালো উদাহরণের পাশাপাশি আমাদের জানতে হবে, কোথায় অগ্রগতি হয়নি, কেন হয়নি এবং কোন প্রতিষ্ঠান তার জন্য দায়ী।
‘বৈশ্বিক লক্ষ্য’ উন্নয়নের জন্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য নিজে উন্নয়ন ঘটায় না। পরিবর্তন ঘটে যখন সক্ষম রাষ্ট্র, সচেতন নাগরিক, স্বাধীন গবেষক এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান সেই লক্ষ্যকে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেয়।
এসডিজির শেষ কয়েক বছরে বিএনপি সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমরা লক্ষ্যগুলোর প্রতি কতবার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি, তা নয়। প্রশ্নটি হলো—প্রমাণের আলোকে নিজেদের নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং কখনো নিজেদের বিশ্বাস সংশোধন করার সক্ষমতা আমাদের আছে কি না।
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক।
মতামত লেখকের নিজস্ব