ইউরোপ কি পারবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে?
ইউরোপ কি পারবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে?

মতামত

যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে নেই, ইউরোপ এখন কোন পথে যাবে?

দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এবারের সম্মেলনে বিশ্বরাজনীতির অভিজাত মহল কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনশৈলী দেখল। এটিকে অনেকে ‘নব্য-রাজতান্ত্রিক’ স্টাইল বলছেন। সম্মেলনের পুরো ঘটনাপ্রবাহ ছিল অতি নাটকীয়। সেখানে ভার্সাইয়ের চেয়ে যেন ‘গেম অব থ্রোনস’ ছিল বেশি। অর্থাৎ সম্মেলনে রাজকীয় শালীনতার চেয়ে ক্ষমতা দেখানোর নাটক বেশি ছিল। কিন্তু এই নাটকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরও গভীর কিছু পরিবর্তন যা আগামী বহু বছর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

ডেনমার্ককে চাপ দিয়ে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে চাওয়ার ঘটনায় আপাতত সংকট কেটে গেলেও, এর মধ্য দিয়ে ‘একীভূত পশ্চিমা বিশ্ব’-এর ধারণাটাই কার্যত ভেঙে পড়েছে। ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত কোনো ন্যাটো মিত্রের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ না-ও করেন, তবু দাভোসের আগে এবং সেখানে তাঁর ও তাঁর উপদেষ্টাদের রূঢ় ও উদ্ধত আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।

এই সন্দেহই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির আলোচিত বক্তৃতার মূল কথা। তিনি একে বলেছেন ‘বিশ্বব্যবস্থায় ফাটল’। একই চিত্র উঠে এসেছে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সর্বশেষ জরিপেও। সেখানে দেখা যায়, মাত্র ১৬ শতাংশ ইউরোপীয় নাগরিক এখন যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র মনে করেন। ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের মতো দেশে প্রায় দ্বিগুণ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা শত্রু হিসেবে দেখছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের অনিশ্চিত ও দোদুল্যমান পররাষ্ট্রনীতি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতারই প্রতিফলন। জরিপের ফলও তা–ই বলছে। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পার হতে না হতেই সবচেয়ে বড় ‘সাফল্য’ হলো, চীনকে আরও শক্তিশালী করে তোলা। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ মনে করছে, ভবিষ্যতে চীনই হবে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি এবং তাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতা থেকে ইউরোপের কী শেখার আছে?

প্রথম শিক্ষা হলো ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। গ্রিনল্যান্ড সংকটের সমাধানে বড় ভূমিকা রেখেছেন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টুব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে। অনেকে বলছেন, গ্রিনল্যান্ড সংকট সামাল দেওয়া গেছে কারণ এই নেতারা ট্রাম্পকে কৌশলে বুঝিয়ে, নরম ভাষায় প্রভাবিত করতে পেরেছেন। তাই তাঁদের বলা হচ্ছে ‘ট্রাম্প-ফিসফিসকারী’ যেন তাঁরা কানে কানে কথা বলে ট্রাম্পকে শান্ত করেছেন। কিন্তু সংকট সামাল দেওয়ার আসল কারণ ছিল অন্য জায়গায়; ইউরোপ এবার স্পষ্টভাবে নিজের সীমারেখা টেনেছিল এবং তা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল।

ইউরোপ দেখিয়েছে যে তাদের হাতেও তাস আছে এবং প্রয়োজনে তা খেলতেও তারা প্রস্তুত। এখন প্রশ্ন হলো ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির রাজনীতির প্রভাব থেকে নিজেকে আরও সুরক্ষিত করবে এবং ভবিষ্যতের সংঘাতে কোন তাসগুলো ব্যবহার করবে, তা ঠিক করতে পারবে?

শেষ কথা হলো, এই মুহূর্তকে যতটা ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে, আসলে তা ততটা নয়। দাভোসে সবচেয়ে চিন্তাজাগানিয়া আলোচনাগুলোর একটি ছিল ১৯২০-এর দশক নিয়ে। বিদ্যুৎ ও গণ–উৎপাদনের যুগ হওয়ায় তখনো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে ছিল প্রবল আশাবাদ। কিন্তু একই সঙ্গে চলছিল গভীর ভূরাজনৈতিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক, সুরক্ষাবাদ ও আত্মনির্ভরতার নীতিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।

এতে আমরা দ্বিতীয় শিক্ষার জায়গায় আসি। সেটি হলো পশ্চিমকেন্দ্রিক বিশ্বের বাইরে তাকানোর সময় এখনই। মার্ক কার্নি স্বীকার করেছেন যে বিশ্বের বড়
একটি অংশ বরাবরই উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভণ্ডামিপূর্ণ মনে করেছে। দাভোসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস—তিনজনই পশ্চিমের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই আহ্বান বাস্তবসম্মত। ভারত, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা অনেক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাঁরা লাগামহীন শক্তির রাজনীতি ও আইনহীনতার বিরুদ্ধে যৌথভাবে কাজ করতে চান। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, ইউরোপ কি সত্যিই এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?

কারণ, ইউরোপের ভেতরের রাজনৈতিক জটিলতা এখনো বড় বাধা। দাভোসে নেতারা যখন বহুপক্ষীয়তার কথা বলছিলেন, তখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ঠিক আগের সপ্তাহে স্বাক্ষরিত ইইউ-মার্কোসুর বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। একইভাবে, ইউক্রেনের পক্ষে বৈশ্বিক জোট গড়তে ব্যর্থ হওয়াও আমাদের দেখায় যে পশ্চিমের বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, ইউরোপ এখনো তা পুরোপুরি শিখতে পারেনি।

শেষ কথা হলো, এই মুহূর্তকে যতটা ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে, আসলে তা ততটা নয়। দাভোসে সবচেয়ে চিন্তাজাগানিয়া আলোচনাগুলোর একটি ছিল ১৯২০-এর দশক নিয়ে। বিদ্যুৎ ও গণ–উৎপাদনের যুগ হওয়ায় তখনো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে ছিল প্রবল আশাবাদ। কিন্তু একই সঙ্গে চলছিল গভীর ভূরাজনৈতিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক, সুরক্ষাবাদ ও আত্মনির্ভরতার নীতিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।

আজকের পরিস্থিতিতেও প্রশ্নটা একই—ইউরোপ কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারবে? পার্থক্য একটাই—এবার ইউরোপ আর কেন্দ্র নয়, এবারের ইউরোপ অনেক বৈশ্বিক শক্তির মধ্যে মাত্র একটি।

  • মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ