
দুই পরাশক্তি থেকে সমদূরত্ব নয়, বরং ‘সমবন্ধুত্বই’ হওয়া উচিত আমাদের মূল নীতি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয় পক্ষ থেকেই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু পাওয়ার আছে। লিখেছেন সফিকুর রহমান
১০ জুন নিউইয়র্ক টাইমসে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এডওয়ার্ড ওং লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন চীনের সঙ্গে একাধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকে সরে এসে একটি ‘গঠনমূলক ভারসাম্যমূলক’ নীতি গ্রহণ করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
অন্যভাবে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান ও নিকট ভবিষ্যতের জন্য দুই পরাশক্তির ‘জি-২’(গ্রুপ অব টু) বিশ্বনেতৃত্বকে মেনে নিয়েছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের এই নতুন সমীকরণ কয়েক মাস ধরে আলোচিত হলেও মে মাসে অনুষ্ঠিত বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের পর থেকে তা আরও বেগবান হয়েছে।
সেই বৈঠকের উদ্বোধনী সভায় প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বক্তব্যের একটি অংশ সারা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সি চিন পিং বলেন, ‘আজকে পৃথিবী একটি যুগসন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কি তথাকথিত সেই থুসিডিডিস ফাঁদ এড়িয়ে বৃহৎ শক্তি সম্পর্কের একটি নতুন সমীকরণ গড়তে পারবে?’
গত বছরের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার আকাশযুদ্ধের ফলাফল দেখিয়েছে যে চীনা সামরিক প্রযুক্তি এখন পশ্চিমের প্রযুক্তির চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা—দুটোই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ক্ষুদ্রতর শক্তি হিসেবে আমাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্বই ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
বক্তব্যটি আলোড়ন তোলে কারণ, প্রায় দেড় দশক ধরেই ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসই প্রথম কোনো রকম নৈতিক বা দৈব ব্যাখ্যা ছাড়াই সম্পূর্ণ বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। থুসিডিডিসের বিখ্যাত রচনা ‘পেলোপনেসীয় যুদ্ধের ইতিহাস’–এ তিনি এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যকার প্রায় তিন দশক ধরে (খ্রিষ্টপূর্ব: ৪৩১ থেকে ৪০৪) চলমান যুদ্ধের বর্ণনা দেন। থুসিডিডিস নিজেও এই যুদ্ধে একজন এথেনীয় সেনাপতি ছিলেন।
সেই সময়ে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে স্পার্টা ছিল গ্রিসের মূল ভূখণ্ড পেলোপনেসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী নগররাষ্ট্র। অন্যদিকে শক্তিশালী নৌবাহিনী, বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সমুদ্র–উপকূলে উপনিবেশ স্থাপনের সুবাদে বন্দরনগরী এথেন্স ছিল এক উদীয়মান শক্তি। থুসিডিডিসের ইতিহাস বর্ণনার অন্যতম প্রতিপাদ্য ছিল, উদীয়মান এথেন্সের কাছে আধিপত্য হারানো এবং নিরাপত্তাঝুঁকিই স্পার্টা ও এথেন্সের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। প্রায় তিন দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সব গ্রিক রাষ্ট্রের একসময়ের সাধারণ শত্রু পারস্য সাম্রাজ্যের সহযোগিতায় স্পার্টা এথেন্সকে সম্পূর্ণ পরাভূত করতে সক্ষম হয়।
বর্তমান সময়ে থুসিডিডিস ফাঁদ ধারণাটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে প্রবর্তন ও জনপ্রিয় করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম এলিসন। তিনি ২০১২ সালের একটি প্রবন্ধে, পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে একটি বইতে এই ধারণার ব্যাখ্যা করেন। তিনি ইতিহাস থেকে ১৬টি পরাশক্তি দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করে দেখান যে উদীয়মান ও বিরাজমান শক্তিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অধিকাংশ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ হলো, ‘সিকিউরিটি ডিলেমা’ বা নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। দ্বন্দ্বমুখী দুই শক্তি বা জোট মনে করে তাদের নিরাপত্তা ও প্রভাব ঝুঁকির সম্মুখীন। ঝুঁকি কমাতে তারা আরও সামরিক ও বেসামরিক শক্তি সঞ্চয় করে, যা দিন শেষে উল্টো ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
এলিসনের বিশ্লেষণে অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উদীয়মান জার্মানির ক্রমে শক্তি বৃদ্ধি কীভাবে বিরাজমান পরাশক্তি জোট ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়ার সঙ্গে দুটো বিশ্বযুদ্ধের পথে নিয়ে গিয়েছিল। এলিসনের মতে, বর্তমান আধিপত্য বিস্তারকারী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও উদীয়মান পরাশক্তি চীনের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব একটি ধ্রুপদি ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’-এর সূচনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’–এর আশঙ্কা এলিসনের লেখার পর থেকেই চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিশ্লেষক মহলে ব্যাপক আলোচিত হয়। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বছরেই ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের সামনে এক বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে থুসিডিডিস ফাঁদ এড়াতে।’ গত মাসের বক্তব্যের আগেও তিনি ২০১৫, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে এই ফাঁদ বিষয়ে জনসমক্ষে কথা বলেছেন।
২.
গত তিন দশকে চীনের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, সামরিক শক্তির উত্থান ধ্রুপদি ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’ সৃষ্টি করেছে। ১৯৯৫ সালে পৃথিবীর সর্বমোট বার্ষিক উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ হতো চীনে, ২০২৫ সালে তা উন্নীত হয় ২০ শতাংশে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ৩০ বছরে ২৮ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ইউরোপের তুলনামূলক অবনমন হয়েছে আরও অনেক বেশি।
৩০ বছর আগে চীন ছিল সস্তা শ্রম ও সহজ ঠুনকো প্রযুক্তির বৃহৎ উৎস। মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানের একটি প্রতিবেদনে এসেছে, বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ৬৪টি প্রযুক্তির মধ্যে ৫৭টিতেই চীন শীর্ষে রয়েছে অথবা শীর্ষের সমকক্ষ। দুই দশক আগেও চীন মাত্র তিনটি প্রযুক্তিতে এগিয়ে ছিল।
গত বছরের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার আকাশযুদ্ধের ফলাফল দেখিয়েছে যে চীনা সামরিক প্রযুক্তি এখন পশ্চিমের প্রযুক্তির চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। এ ছাড়া চলমান ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে চীনের তৈরি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক এফ-৩৫ বিমান ঘায়েল করার ঘটনাটি আবারও চীনা প্রযুক্তির অভাবনীয় উল্লম্ফনের বিষয়টি তুলে ধরছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জোটের প্রভাববলয়ের রাজনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পশ্চাদপসরণ লক্ষণীয়। জোটসঙ্গীদের অগ্রাহ্য করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি মোতায়েন জোটসঙ্গীদের নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন চিন্তা ও নীতির সূচনা করেছে। বিশেষত পূর্ব এশিয়ায় কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান এবং ন্যাটো জোটসঙ্গীরা নতুনভাবে ভাবছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অচিন্তনীয় বক্তব্য এবং ইউক্রেনকে ক্রমাগত সহযোগিতা হ্রাসের ঘটনা ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তো এক বক্তব্যে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান এবং বহু মেরুর এক বিশ্বের সূচনার কথা স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন।
বিশ্বব্যবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন চীনের রাজনৈতিক ও বিশ্লেষক মহলে অনেক সাড়া ফেলেছে। গত কয়েক মাসে চীনের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রতিবেদন থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, চীন মনে করছে কোয়াড, ইন্দো-প্যাসিফিক ইত্যাদি জোটের মাধ্যমে চীনকে ঘিরে ফেলার নীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে এসেছে এবং দুই পরাশক্তি ‘জি-টু’ ভারসাম্যের বিশ্বব্যবস্থা মেনে নেওয়ার পথে রয়েছে।
৩.
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থুসিডিডিস ফাঁদে না পড়ার সম্ভাবনার একটি বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নিরাপত্তার সংকট তীব্র না হওয়া। ইতিহাসের স্পার্টা অথবা ব্রিটেনের মতো, যুক্তরাষ্ট্র উদীয়মান কোনো প্রতিবেশী শক্তির কাছ থেকে নিরাপত্তাঝুঁকিতে নেই। যুক্তরাষ্ট্র হলো দুই পাশে দুই মহাসাগর দিয়ে সুরক্ষিত একটি পরাশক্তি, যার পুরো পশ্চিম গোলার্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি নেই।
একটি দ্বন্দ্বময় পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্র ২০০ বছরের পুরোনো ‘মনরো ডকট্রিনের’ নিরাপত্তানীতিতে ফিরে যেতে পারে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, গত বছরের ভেনেজুয়েলা অভিযান এবং কিউবার প্রতি সাম্প্রতিক হুমকি একটি নতুন মনরো ডকট্রিনের আভাস দিচ্ছে। জনসংখ্যা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সম্পদ ও পরিবেশের দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় কেবল পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বজায় রেখেই সেই অঞ্চলের পরাশক্তিটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারে।
এর মানে কি যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের সঙ্গে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় নিজেদের তুলনামূলক ক্ষমতা কমে যাওয়াটাকে ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো বেশ কিছু তুরুপের তাস রয়েছে। তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য।
বিশ্বের অনেক শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনৈতিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে শিক্ষা বা গবেষণার মতোই একটি নতুন ‘অন্তর্জাত নিয়ামক’। নিজস্ব ‘পুনরাবৃত্তিক আত্ম–উন্নয়ন’ সক্ষমতার কারণে এটি অর্থনীতির অন্য যেকোনো উপাদানের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী। এআইয়ের এই প্রতিশ্রুত ক্ষমতার সামান্য অংশও যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কোনো পরাশক্তির সামান্যতম এগিয়ে থাকাও তাকে দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতি ও সমরশক্তিতে একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দেবে।
উল্লেখ্য, মে মাসের বেইজিং সফরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন ইলন মাস্ক, টিম কুক, জেনসেন হুয়াংসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের। সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে এই বার্তা স্পষ্ট যে এই খাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু এগিয়ে আছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে রয়েছে বর্তমান বিশ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা—মোট প্রজনন হারের (টিএফআর) ক্রমাগত নিম্নগামিতা। চীনের টিএফআর যেখানে এখন মাত্র শূন্য দশমিক ৯, যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে ১ দশমিক ৭। উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও চীনের জনসংখ্যার গড় (মেডিয়ান) বয়স এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালে চীনের মানুষের গড় বয়স হবে ৪৬ বছর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হবে ৪১। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন অনেক দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। কোনো দেশের জনসংখ্যায় তরুণ ও যুবকদের অনুপাত দ্রুত হ্রাস পাওয়া, দীর্ঘ মেয়াদে পরাশক্তি হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী ডলারের আধিপত্য, শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার এবং পুঁজি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ঐতিহ্য—যা চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবেই পৃথক করেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন থাকার কারণে আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক পরাশক্তিগুলো সব সময়ই শক্তির ভারসাম্যে এগিয়ে ছিল, যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীতে ছিল ব্রিটেন এবং বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমান সময়ের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও তার আস্থাশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে শক্তির ভারসাম্যে তাকে এগিয়ে রাখবে।
৪.
একটি গঠনমূলক ভারসাম্যপূর্ণ ‘জি-২’ পৃথিবী বাংলাদেশের জন্য শ্রেয়তর। দুই পরাশক্তি থেকে সমদূরত্ব নয়, বরং ‘সমবন্ধুত্বই’ হওয়া উচিত আমাদের মূল নীতি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয় পক্ষ থেকেই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু পাওয়ার আছে। অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস ও সমাজগত কারণে ভারত অনস্বীকার্যভাবেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা—দুটোই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
একটি ‘জি-২’ পৃথিবী আমাদের এই দ্বৈত লক্ষ্য অর্জনের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং কল্যাণকর। কারণ, একটি একমেরু পৃথিবীতে কোনো একক আধিপত্যশালী পরাশক্তির সঙ্গে গভীর সুসম্পর্ক বজায় রাখা, মধ্যম পরাশক্তি ও বিশাল অর্থনীতির দেশ ভারতের পক্ষে যতটা সহজ, বাংলাদেশের জন্য ততটা নয়। একক পরাশক্তির সঙ্গে ভারতের এই ধরনের বিশেষ সম্পর্কের ফলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভারসাম্যে আমাদের অবস্থানকে অনেকটাই দুর্বল করে তোলে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ক্ষুদ্রতর শক্তি হিসেবে আমাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্বই ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এর বাস্তব নিদর্শন আমরা গত দুই দশকে প্রত্যক্ষ করেছি। পক্ষান্তরে একটি নতুন জি-টু বিশ্বব্যবস্থায় আমরা আমাদের দেশের স্বার্থরক্ষার পররাষ্ট্র কৌশলের জন্য কিছুটা অধিকতর স্থান পাব, যা ইংরেজিতে বলা হয় ‘স্পেস টু ম্যানুভার’।
● সফিকুর রহমান নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)
*মতামত লেখকের নিজস্ব