
দামে কম, মানে ভালোর মতো কম ভাড়া আর নিরাপদ যাত্রার জন্য একসময় অনেকেই ট্রেনকে বেছে নিতেন। একই ট্রেনে সব শ্রেণির মানুষের জন্যই কামরা ও আসন থাকায় যাঁর যাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী ট্রেনে সবাই চড়তে পারতেন। ট্রেন ছিল প্রকৃতপক্ষেই গণপরিবহন।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে যখন অর্থনীতিতে উদারীকরণের হাওয়া প্রবেশ করে, তখন থেকেই ধীরে ধীরে ট্রেন থেকে ‘গণ’ ভাবনাটি ক্রমশও দূরে সরে যেতে থাকে। রেলওয়ের যাত্রীসেবার দর্শনও পাল্টে যায়। লোকসানের অজুহাতে অনেক পুরোনো রুট বন্ধ হয়ে যায়, বন্ধ হয়ে যায় অনেক স্টেশনও।
২০১০ সালের পর রেলপথে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত আটটি নতুন রেললাইন চালু করা হয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, নতুন রেললাইন চালু হলেও সক্ষমতা ও চাহিদার তুলনায় এসব রুটে ট্রেন চলছে নামমাত্র। অথচ এসব রেললাইন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ আমলে রেলওয়েতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, যার সিংহভাগটাই অবকাঠামো খাতে। এসব প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠিন শর্তের ঋণ। অথচ রেলওয়ে বহু বছর ধরেই ধুঁকছে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন, বগি ও লোকবলসংকটে। চড়া সুদে নেওয়া ঋণের টাকায় করা রেললাইনে যদি ট্রেনই না চলে, তাহলে লোকসানটা কার?
প্ল্যাটফর্মগুলো এক–দেড় ফুট উঁচু করা বড় প্রকল্প কিংবা সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও নয়। একটু মনোযোগ দিলেই প্ল্যাটফর্মগুলো উঁচু করা যায়, তাতে আরও কিছু মানুষ ট্রেনে চড়তে পারেন
সম্প্রতি ইঞ্জিন, বগি ও জনবলসংকটের কথা বলে বিভিন্ন রুটে চলাচল করা শতাধিক লোকাল–মেইল–কমিউটার ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে বিরতিহীন আন্তনগর ট্রেনের চলাচল বেড়েছে। এসব ট্রেনের টিকিট অ্যাপ ও অনলাইনভিত্তিক হওয়ায় মোট জনগোষ্ঠীর ছোট একটি অংশ রেলওয়ের টিকিট কাটার সুযোগ পান। আবার বড় শহর ছাড়া অন্য সব স্টেশনে না থামায় শুধু নির্দিষ্ট কিছু শহরের মানুষই এই ট্রেনগুলোতে চলাচলের সুযোগ পান।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে রেলের সেবা দেশের অপেক্ষাকৃত সুবিধাভোগী পাচ্ছেন। এই বৈষম্যমূলক নীতি রেলের ওপর জনসাধারণের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, গত ১৭ মাসে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে পাথর নিক্ষেপের শিকার শীর্ষ পাঁচ ট্রেনের সবই বিরতিহীন আন্তনগর ট্রেন।
দুই.
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চালু হওয়া রেললাইনের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল পথটি হলো পদ্মা রেলসংযোগ। ৩৯ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের পথটি ঢাকার সঙ্গে যশোর, খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করেছে। সময় কমিয়েছে অনেকটাই। যেমন ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে সড়কপথে যেখানে যশোরে যেতে ছয়–সাত ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে ট্রেনে মাত্র ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে যশোর চলে যাওয়া যায়। এই পথে খুলনায় যেতে সময় লাগে ৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট।
ফলে এসব শহর থেকে সকালে ঢাকায় এসে কাজ সেরে আবার সন্ধ্যায় ফিরে যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। অথচ এই দুটি রুটে মাত্র একটি ট্রেন চলাচল করে। পদ্মা রেলসংযোগে যেখানে ৪৮টি ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা আছে, সেখানে এখন মাত্র ১০–১১টি ট্রেন চলাচল করছে।
তিন.
এ মাসের শুরুতে পদ্মা রেলসংযোগ দিয়ে ঢাকা–কুষ্টিয়া যাওয়া ও আসার অভিজ্ঞতা হলো। ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু হলো সীমিত বিরতি দিয়ে চলা আন্তনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে। কুষ্টিয়া পর্যন্ত চারটি স্টেশনে থামল, সময় লাগল সাড়ে তিন ঘণ্টা। কুষ্টিয়া স্টেশনে নেমে অটোরিকশা ও সিএনজিতে করে গন্তব্যস্থল কুমারখালীতে যাওয়া। ফেরার ট্রেন মধুমতী এক্সপ্রেস। যাত্রাবিরতি দিয়ে চলা এই আন্তনগর ট্রেনে কুমারখালী স্টেশন থেকেই ওঠা গেল। ঢাকা পর্যন্ত প্রায় ১৬–১৭টি স্টেশনে ট্রেনটি থামল। সময় লাগল চার ঘণ্টা।
দুটি ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সুন্দরবন এক্সপ্রেসে যে বগিতে গিয়েছি, আসনসংখ্যার সমান যাত্রীই উঠেছিল। তবে অনেক বগিতে দাঁড়ানো যাত্রীও ছিলেন। মধুমতীতে ছিল বলে উপচে পড়া ভিড়। বগিতে উঠে নিজের আসনে পৌঁছাতে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হলো। প্রতিটি স্টেশনেই অসংখ্য যাত্রী ওঠানামা করলেন।
পদ্মা রেলসংযোগ পথে সব শ্রেণির মানুষের কথা মাথায় রেখে মেইল, কমিউটার, লোকাল, আন্তনগর—সব ধরনের ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে কুষ্টিয়া থেকে রাজবাড়ী পর্যন্ত স্টেশনগুলোর প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে দুটি বড় সমস্যা রয়ে গেছে।
এক. অনেক প্ল্যাটফর্মই ট্রেনের তুলনায় ছোট। ফলে অনেক যাত্রীকে ঝুঁকি নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে ট্রেনে উঠতে হয়। দুই. ট্রেনের পাটাতন থেকে এসব প্ল্যাটফর্ম অনেক নিচে হওয়ায় যাত্রীদের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে হয়। শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পক্ষে এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠা সম্ভব নয়। ফলে ইচ্ছা ও প্রয়োজন থাকলেও এসব মানুষের অনেকেই ট্রেনে যাতায়াত করতে পারেন না।
প্ল্যাটফর্মগুলো এক–দেড় ফুট উঁচু করা বড় প্রকল্প কিংবা সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও নয়। একটু মনোযোগ দিলেই প্ল্যাটফর্মগুলো উঁচু করা যায়, তাতে আরও কিছু মানুষ ট্রেনে চড়তে পারেন।
● মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
monoj.dey@prothomalo.com