সংবাদপত্র
সংবাদপত্র

মতামত

যে মতলবে গণমাধ্যমকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হচ্ছে

‘ডেমোক্রেসি ডাইজ ইন ডার্কনেস’ (অন্ধকারে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়)—এই বাক্যটি ২০১৭ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট-এর স্লোগান হয়ে। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন জেফ বেজোস পত্রিকাটি কিনে নেওয়ার চার বছর পর এই স্লোগান নেওয়া হয়। কিন্তু আজ সেই বেজোস ওয়াশিংটন পোস্ট-এর মতামত পাতাকে কার্যত গলা টিপে ধরেছেন এবং পত্রিকাটির কর্মীসংখ্যাও ব্যাপকভাবে কমিয়েছেন। 

আমেরিকায় গণতন্ত্র মরে যাচ্ছে। কারণ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ওরাকলের ল্যারি এলিসনের মতো মিডিয়া ও প্রযুক্তি মালিকের (যিনি সিবিএস নিউজের সঙ্গে ঠিক সেটাই করছেন, যা বেজোস ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সঙ্গে করেছেন) মতো ক্ষমতাধর অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা তথ্যকে নিষ্ক্রিয় করার কায়দা শিখে ফেলেছেন। একটি ভুল তথ্য (ডিসইনফরমেশন) প্রচারণা হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন একটি সুসংহত প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। 

বহু বছর ধরে সাংবাদিকতার সংকটকে মূলত পক্ষপাত, মেরুকরণ এবং আস্থা হ্রাসের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই সমস্যাগুলো বাস্তব এবং এগুলোই মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কথিত ‘উদারপন্থী পক্ষপাত’-কে পেশাদার মানদণ্ড দুর্বল করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু এখন সংকটটি আরও গভীর। যারা আগে এসব প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা তৈরির চেষ্টা করছিল, তারা আর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিতর্কে জয়ী হওয়ার প্রয়োজনই বোধ করে না। বরং তারা সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি আরোপ করার ক্ষমতাটিকেই খর্ব করে দিয়েছে। 

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা খুব ব্যয়বহুল। এর জন্য সময় লাগে, আইনি সহায়তা লাগে, দক্ষ সম্পাদক লাগে আর এমন রিপোর্টার লাগে, যাঁরা মাসের পর মাস একটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারেন। যখন বড় বড় পত্রিকা কর্মী ছাঁটাই করে, বাজেট কমায় (যেমন ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ৩০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে) তখন তাদের এই কাজ করার ক্ষমতাই ভেঙে পড়ে। 

সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খবর ছড়ানোর ব্যবস্থা। অনেক বছর ধরে টুইটার ছিল এমন একটা জায়গা, যেখানে সাংবাদিক, গবেষক, রাজনীতিক—সবাই একই মঞ্চে কথা বলত। ভালো রিপোর্ট বা গবেষণা দ্রুত ছড়াত, বিতর্ক হতো, ভুল হলে ঠিক হতো, আর অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতো। 
ওয়াশিংটন পোস্ট–এর মালিক জেফ বেজোস

সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খবর ছড়ানোর ব্যবস্থা। অনেক বছর ধরে টুইটার ছিল এমন একটা জায়গা, যেখানে সাংবাদিক, গবেষক, রাজনীতিক—সবাই একই মঞ্চে কথা বলত। ভালো রিপোর্ট বা গবেষণা দ্রুত ছড়াত, বিতর্ক হতো, ভুল হলে ঠিক হতো, আর অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতো। 

ইলন মাস্ক টুইটার কিনে সেটার নাম বদলে ‘এক্স’ করার পর সেই ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। এখন এখানে যাচাই করা তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা আর এনগেজমেন্ট বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে বিশ্বাসযোগ্য খবর ঠিকমতো ছড়ায় না। এটা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, মালিকানার ক্ষেত্রেও ঘটে। যখন কোনো সংবাদমাধ্যম বড় কোনো করপোরেট গোষ্ঠীর অংশ হয় (যাদের ব্যবসা, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক আছে) তখন ওপরে থেকে কিছু না বললেও সম্পাদকেরা বুঝে যান কোন
খবর ঝুঁকিপূর্ণ। 

এ অবস্থায় সেলফ-সেন্সরশিপ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কিছু খবর আর করা হয় না, কিছু অনুসন্ধান মাঝপথে থেমে যায়, কিছু ক্ষমতাবান মানুষকে খুব সাবধানে
কভার করা হয়—যাতে মালিকপক্ষ বিপদে না পড়ে। একসময় ঝুঁকি এড়ানোই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে সাংবাদিকতা থাকে, তথ্যও থাকে—কিন্তু সেগুলো আর কিছু বদলাতে পারে না। সত্য প্রকাশ পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তথ্য শক্তি হারালে ক্ষমতাবানেরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়। 

কার্লা নরলফ টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত