ধর্ম

নারী ও শিশুদের হজের বিশেষ বিধান

পবিত্র মসজিদুল হারাম (কাবা শরিফ), মক্কা, সৌদি আরব
ফেরদৌস ফয়সাল

ইসলামি বিধানে রয়েছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ। এই কল্যাণের বিধান সব মানুষের জন্য। ইসলামি বিধানে নারী ও শিশুদের ইবাদতের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি ব্যর্থ করি না কোনো আমলকারীর আমলের বিনিময়, হোক সে পুরুষ বা নারী।’ (সুরা-৩ আলে–ইমরান, আয়াত: ১৯৫) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘যে সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ বা নারী, যদি সে বিশ্বাসী হয়, তবে আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব।’ (সুরা-১৬ নাহল, আয়াত: ৯৭)

কয়েকটি ক্ষেত্রে নারীদের হজের কার্যাবলি পুরুষ থেকে আলাদা। যেমন নারীরা ইহরাম অবস্থায়ও স্বাভাবিক পোশাক পরিধান করবেন। উচ্চ আওয়াজে তালবিয়াহ পড়বেন না। তাওয়াফের সময় রমল (তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে সজোরে বীরদর্পে চলা) করবেন না। সাঈর সময় (সাফা-মারওয়ায় দৌড়ানোর সময়) মিলাইনে আখদারাইন অতিক্রমকালে দৌড়াবেন না। মাথার চুল মুণ্ডন করবেন না, বরং চুলের আগার কিছু অংশ (এক ইঞ্চি পরিমাণ) কাটবেন। ইহরাম অবস্থায় চেহারা খোলা রাখবেন। ইহরাম অবস্থায় হায়েজ (মাসিক ঋতুস্রাব) ও নিফাস (প্রসবোত্তর স্রাব) হলে গোসল করার পর তাওয়াফ ছাড়া হজের অন্যান্য আমল সম্পন্ন করবেন। তবে (হায়েজ নিফাস থেকে) পবিত্র হওয়ার পর তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হবে।

নারীদের হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় মসজিদুল হারাম শরিফে প্রবেশ করা ও তাওয়াফ করা বিধেয় নয়। এ অবস্থায় তাঁরা নামাজ পড়তে বা কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করতে পারবেন না এবং উচ্চ স্বরে তালবিয়া পড়বেন না। কিন্তু ইহরাম বাঁধা ও অন্যান্য দোয়া পড়া যায়। হায়েজ ও নিফাসের সময় তাওয়াফে কুদুম (কাবাঘরে প্রথম আগমনী তাওয়াফ) না করতে পারলে তা মাফ হবে, কিন্তু হজের পর একটা ওমরাহ করতে হবে।

হায়েজ ও নিফাসের সময় অকুফে আরাফাত (আরাফাতে অবস্থান) ও অকুফে মুজদালিফা (মুজদালিফায় রাতযাপন) করতে পারবেন, জামারাতে রমিয়ে জিমার বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করতে পারবেন। কিন্তু তাওয়াফে জিয়ারত বা ফরজ তাওয়াফ সুস্থ হওয়ার পর করবেন। বিদায়ী তাওয়াফ হায়েজ ও নিফাসের ওজরে (অসুবিধায়) না করতে পারলে এবং সময় না পেলে এর জন্য কাফফারা দিতে হবে না; দূর থেকে বিদায় নেওয়া যাবে।

উল্লেখ্য, কোনো নারী ইচ্ছা করলে হজের কার্যাবলি সম্পাদনের সুবিধার্থে হজ চলাকালে ওষুধ বা ট্যাবলেট খেয়ে সাময়িকভাবে মাসিক (ঋতুস্রাব) বন্ধ রাখতে পারেন; যদি এতে শারীরিক কোনো সমস্যা না হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। সাধারণত বাংলাদেশের পরিবেশে ছেলেশিশুরা ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সে এবং মেয়েশিশুরা ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সে সাবালক-সাবালিকা হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের ওপর হজসহ শরিয়তে কোনো বিধান ফরজ নয়।

তবে কোনো নাবালগ ছেলেমেয়ে হজসহ যেকোনো ইবাদত করলে তার জন্য তা নফল হজ বা ইবাদত হিসেবে আদায় হবে। হজ আদায়কালে ছেলেশিশুদের পুরুষদের মতো ইহরামের কাপড় পরতে হবে। কন্যাশিশুরা নারীদের মতো স্বাভাবিক পোশাকেই ইহরামের নিয়ত করবে। শিশু নিয়ত তালবিয়া ইত্যাদি বলতে না পারলে অভিভাবক তার পক্ষ থেকে বলবেন। আর যদি শিশু নিজে হজের কার্যাদি পালনে সক্ষম হয়, তাহলে সে নিজেই তা করবে।

ছোট শিশু (নাবালক-নাবালিকা) ছেলেমেয়েরা ইহরাম অবস্থায় কোনো নিষিদ্ধ কাজ করলে তার কাফফারা দিতে হবে না। শিশুদের হজের কোনো ফরজ ছুটে গেলে বা বাদ পড়লে এই হজ কাজা করতে হবে না। শিশুকালে (নাবালক-নাবালিকা অবস্থায়) হজ করলে পরে বড় (সাবালক-সাবালিকা) হওয়ার পর যদি হজ ফরজ হয়, তবে পুনরায় হজ আদায় করতে হবে।

হিজড়া ব্যক্তিদের জন্যও রয়েছে ইবাদতের বিধান। পুরুষ হিজড়ারা পুরুষদের মতো এবং নারী হিজড়ারা নারীদের মতো হজব্রত পালন করবেন। হজ আদায়কালে ছেলে হিজড়াকে পুরুষদের মতো ইহরাম পরতে হবে এবং মেয়ে হিজড়ারা নারীদের মতো নারীসুলভ স্বাভাবিক পোশাকেই ইহরামের নিয়ত করবেন।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

smusmangonee@gmail.com