
বিশ্বের প্রায় সর্বত্র উগ্র জাতীয়তাবাদের কদর এখন। এই মতাদর্শের বড় এক উপাদান ‘অপর’কে অশান্তিতে রাখা। এটাই অনেক অঞ্চলে তার জনপ্রিয়তার জাদু। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের কবলে পড়েছে।
বামার জাতীয়তাবাদ বহুকাল দক্ষিণ সীমান্তে বাংলাদেশকে প্রায় স্থায়ী এক অশান্তিতে রেখেছে। ২০১৭ সালে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে ঠেলে দিয়েছিল তারা। এরপরও ওদিক থেকে থেমে থেমে আসছেই রোহিঙ্গা, ম্রো, খুমিরা। আর কয়েক দিন পরই রোহিঙ্গা বড় ঢেউয়ের ৯ বছরপূর্তি। এর মাঝেই শুরু সীমান্তের ভারতীয় দিক থেকে মানবতরঙ্গ।
পুশ ইন সমস্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। তবে এবার নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া মাত্র পুশ ইনের সুনামি শুরু হয়েছে বলা যায়। গত দুই সপ্তাহে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১০ জায়গা দিয়ে নানা বয়সী মানুষদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সেই ঠেলে দেওয়া নারী-পুরুষ-শিশুদের বাংলাদেশ জিরো লাইনে আটকে রাখছে। এভাবে মাইলের পর মাইল সীমান্তজুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্য এখন।
গ্রীষ্মের ভয়াবহতায় এই মানুষেরা পুড়ছে, ভিজছে; আর দুই দেশের রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যম সেসব দেখছে। উভয় রাষ্ট্র সীমান্তজুড়ে যার যার উদ্যোগের পক্ষে স্থানীয় মানুষদেরও জড়ো করছে। ফলে আধা যুদ্ধংদেহী অবস্থা এখন সীমান্তের বিভিন্ন স্পটে।
রোহিঙ্গাদের আরাকান থেকে বিতাড়নকালে ‘আন্তর্জাতিক বিবেক’ যেভাবে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, এবার অবশ্য তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমনকি রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে নানা মহল যেভাবে উচ্চকণ্ঠ ছিল, তেমন কাউকেও এবার পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রায় তিন দশক ধরে থেমে থেমে এভাবে পুশ ইন কর্মসূচি চালাচ্ছে ভারতের প্রশাসন। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে এই কর্মসূচি কিছুটা স্থগিত বা বন্ধ ছিল। মাঝে মাঝে এ রকম উদ্যোগ বন্ধ বা স্থগিত দেখে অনুমান করা হয়, এটা ভারতীয় শাসকদের একধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এবার বিশেষ কারণে সেই পদক্ষেপ বেশ ছন্দোবদ্ধ শক্তিতে এগোচ্ছে।
ভারতের কেন্দ্রে ও পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামে একই মতাদর্শের সরকার কায়েম হওয়ায় পুশ ইন এবার সমন্বিত চেহারা নিয়েছে। এই পদক্ষেপের পক্ষে নতুন করে জনমত তৈরিতে নেমেছে আরএসএস-বিজেপি পরিবারের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমগুলো। ভারতবাসীকে বোঝানো হচ্ছে জিরো পয়েন্টে রোদ-বৃষ্টিতে উন্মুক্ত হয়ে থাকা মানুষগুলোকে বাংলাদেশ নিয়ে নিলেই তাদের দেশটা নিরাপদ হবে। ভারতের উন্নয়নের পথে এই মানুষগুলো হলো বাধা।
গত আমলে পুশ ইন বন্ধ থাকার পর বিএনপি সরকার আসামাত্রই যদি পুশ ইন শুরু হয়, তাহলে সেটা ভারতের জন্য অবশ্যই ভুল কূটনীতি। কারণ, এটা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নবযাত্রায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখা হবে।
সংঘ পরিবারের সারকথা, যাদের পুশ ইন করা হচ্ছে, তারা ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ এবং ‘নিরাপত্তা হুমকি’। মুশকিল হলো বাংলাদেশের ভেতরে বিগত দিনগুলোতে যাঁদের সফলভাবে পুশ ইন করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অনেক ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। দারিদ্র্য, বাংলা ভাষা এবং মুসলমান পরিচয়ের কারণে তাঁরা অনেকে পুশ ইনের গণকর্মসূচিতে পড়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সীমান্তের ওদিকে পুশ ইন কর্মসূচির তাত্ত্বিকদের ভাষ্য হলো, ‘পোকা বাছাই’ করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে মাত্র। অর্থাৎ পুশ ইনের শিকার মানুষগুলো হচ্ছে ‘পোকামাকড়’তুল্য। আর বাংলাদেশ হলো পোকামাকড় ফেলার জায়গা।
এই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে বলে ভারতীয় প্রশাসন গর্বও করে বিভিন্ন সময় এবং সেটা মিথ্যাও নয়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে এভাবে হঠাৎ বাড়তি উত্তেজনা সঞ্চার হলো কেন?
ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মাঝে এই প্রশ্নের নানা উত্তর ঘুরছে। কেউ কেউ বলছেন, বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বা চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে নব আঙ্গিকে পুশ ইন শুরু হয়েছে। সেই ‘বার্তা’টি কী? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান হয়তো সেটা জেনে থাকবেন। সরকারকেও নিশ্চয়ই সেসব অবহিত করেছেন তিনি। সাধারণ বাংলাদেশিরা তার কিছু জানেন না। তাঁরা কেবল দেখছেন সীমান্তে উদীয়মান উসকানি ও ত্রাস।
ভারত বরাবরই নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশকে তার স্বঘোষিত নিরাপত্তাবলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপে তারা নজর রাখে। বাংলাদেশের এ রকম সব বিষয়ে তাদের পছন্দ-অপছন্দ ও মতামত রয়েছে। সেসব মতামতের কিছু তারা স্পষ্ট ভাষায় বলে, কিছু পরোক্ষ ভাষায় বোঝাতে চায়। বাংলাদেশও কিছু তার বোঝে, কিছু না বোঝার ভান করে, কিছু অগ্রাহ্য করে।
বাংলাদেশ ভারতের ক্ষুদ্র প্রতিবেশী হলেও স্বতন্ত্র, স্বাধীন দেশ। বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক আদর্শের সরকার ক্ষমতায় থাকবে, সেটা বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। যেমনটি ভারতের কেন্দ্রে ও রাজ্যে কারা সরকার গড়বে, সেটা সেই দেশের জনগণের পছন্দের বিষয়। উভয় দেশের শাসকদের অপর দেশের যেকোনো আদর্শের বা দলের শাসকদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
ফলে গত আমলে পুশ ইন বন্ধ থাকার পর বিএনপি সরকার আসামাত্রই যদি পুশ ইন শুরু হয়, তাহলে সেটা ভারতের জন্য অবশ্যই ভুল কূটনীতি। কারণ, এটা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নবযাত্রায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখা হবে। এটা এদিকেও পাল্টা জাতীয়তাবাদী উগ্রতা বাড়াবে।
কোনো কোনো ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকার পুশ ইনের নবতরঙ্গের পেছনে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনার’ কথাও বলছেন। তিস্তার পানিতে যে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা রয়েছে, সেটা ভারতীয়দের তরফে স্বীকৃত। উভয় দেশ চুক্তি হওয়ার দ্বারপ্রান্তেও ছিল। তখন বলা হয়, নয়াদিল্লি বাংলাদেশকে জল দিতেই চায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধায় চুক্তি আটকে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ আর কত অপেক্ষা করবে?
ভারত যদি আন্তনদীতে পানি ছাড় না দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প দুটি; জাতিসংঘে যাওয়া বা অবকাঠামোগত উপায়ে সমস্যার সমাধান খোঁজা। বাংলাদেশের সরকার দ্বিতীয় পথে হাঁটছে।
তিস্তার ভাটিতে অবকাঠামোগত উপায়ে আদৌ পানির অভাব মিটবে কি না, সেটা মহা বিতর্কিত বিষয়। পরিবেশবিদেরা সেসব নিয়ে কথা বলছেন। ভারত যদি এ রকম পরিকল্পনায় আপত্তি তোলে, পানির জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীতে আপত্তি তুলে পুশ ইনের পথ বেছে নেয় সেটা কতটা ন্যায়সংগত, শোভন কিংবা সৎ প্রতিবেশীসুলভ হবে?
এমনকি, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তাতেও ভারতের আপত্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভারত যে ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমাগত তার সম্পর্ক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, নানা ধরনের সামরিক প্রকল্প নিচ্ছে, সেটা মুসলমানপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। অর্থনীতির নানা বিষয়ে চীনের সঙ্গেও ভারতের ব্যাপক ও বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত বা সামরিক বিষয়ে সম্পর্ক গড়তে চায়, তাতে ভারতীয় আপত্তির কোনো যৌক্তিকতা থাকার কথা নয়।
ভারত সরকার একসময় বেশ জোরের সঙ্গে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলত। এই নীতি নিশ্চয়ই প্রতিবেশীর আবেগ, প্রয়োজন ও অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশে একটা নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চলতি ব্যাপকভিত্তিক পুশ ইন ওই নীতির সঙ্গে কি সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বাংলাদেশ সরকার এখন নানা পথ ধরতে পারে। প্রথমত সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পুশ ইনের শিকার মানুষের অমানবিক দশা আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে তুলে ধরতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টিও আকর্ষণ করতে পারে। পাশাপাশি ভারত সরকারের কাছে কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের তালিকা চাওয়া এবং সেই তালিকা ধরে অনুসন্ধান করে পদক্ষেপ নেওয়া। পুশ ইনের নামে কোনো ভারতীয় নাগরিককে এদিকে ঠেলে দেওয়া হলে সেটাও আন্তর্জাতিক সমাজকে দেখানো দরকার।
সীমান্ত পরিস্থিতি এই মুহূর্তে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ এবং বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সর্বোচ্চসংখ্যক রক্ষীকে ইতিমধ্যে সীমান্তে মোতায়েন করে ফেলেছে। ভারতের দিক থেকে বাড়তি উসকানি থাকলেও তাতে সাড়া না দেওয়াই শুভবুদ্ধির পরিচয় হবে। যদিও সীমান্ত আরও সুরক্ষিত করতে হবে।
ভারত সীমান্তে যে সংকট তৈরি করছে সেটা মানবিক, এই বিষয়টিকে মাথায় রেখেই বাংলাদেশকে এগোতে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সময়টা বাংলাদেশের কূটনীতিক দক্ষতা প্রদর্শনের।
সম্পর্ককে জিরো লাইনে ঠেলে দেওয়া ভারতের দিক থেকে একটা ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া। উগ্র জাতীয়তাবাদ জুয়া খেলতে ভালোবাসে, আর গণতন্ত্র বাজি ধরে আলাপ-আলোচনার শক্তিতে।
আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব