
সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি আলোচিত বিষয় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) তাদের ২০২৫-২৬–এর এক গবেষণায় ২০ থেকে ৩২০ মাইক্রোপ্লাস্টিক পার্টিকেল প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে শনাক্ত করেছে বলে দাবি করেছে। অধিকাংশ টুথপেস্টই বাংলাদেশের নিয়মিত ব্যবহৃত ও পরিচিত ব্র্যান্ডের এবং ২৫টি টুথপেস্টের মধ্যে ২২টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এমন কোনো আইন নেই, যা প্রসাধনসামগ্রীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার বা সীমা নির্ধারণ করে। শুধু প্রসাধনসামগ্রী নয়, বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো জাতীয় মানদণ্ড, পরীক্ষাপদ্ধতি বা লেবেলিংয়ের কোনো বাধ্যতামূলক নীতি নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, কী এই মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং কেন সেটা উদ্বেগের বিষয়। সহজ ভাষায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো মাইক্রো বা অণু আকারের প্লাস্টিক, যার আকার পাঁচ মিলিমিটারের কম। এর উৎপত্তি হয় বড় প্লাস্টিকের ক্ষয়, প্লাস্টিক তৈরির উপকরণ থেকে এবং এগুলো দীর্ঘদিন আমাদের পরিবেশে থেকে যায়। মাইক্রোবিড এই মাইক্রোপ্লাস্টিকেরই অংশ, যা প্রাইমারি লেভেলের মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং তা তৈরিই করা হয় প্রসাধনসামগ্রী ও শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য।
এই মাইক্রোবিড শুধু টুথপেস্টেই নয়, শ্যাম্পু, সেভিং ক্রিম, কসমেটিক পণ্য, ক্রিম, ফেসওয়াশেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। এর মূল কারণ মাইক্রোবিড তৈরির খরচ ভেষজ উপকরণের থেকে কম এবং সহজলভ্য। বিভিন্ন দেশি–বিদেশি ব্র্যান্ড তাদের পণ্যে মাইক্রোবিডের ব্যবহারকে দৈনন্দিন ত্বক এবং দাঁত মসৃণ ও পরিষ্কারের জন্য কার্যকর পণ্য হিসেবে বাজারজাত করত, যা ভোক্তারা নিয়মিত ব্যবহার করেন। সমস্যা হলো, এই মাইক্রোবিড পানিতে খুব সহজেই মিশে আমাদের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
এখন পর্যন্ত আমাদের জলব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে এবং বর্জ্য পানি শোধনাগারগুলো এই প্লাস্টিকের বিস্তার বন্ধের জন্য এখনো উপযুক্ত নয়। পানি থেকে এগুলো জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে এবং সঞ্চিত হয়, যা খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে এক জীব থেকে অন্য জীবে স্থানান্তরিত হয়।
এই স্থানান্তর শুধু প্রাণীতেই নয়, এসব প্রাণী খাদ্য হিসেবে মানুষ গ্রহণ করলে এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক–সমৃদ্ধ পণ্য সরাসরি ব্যবহার করলে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন ইউএস প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘ফেডারেল মাইক্রোবিড-ফ্রি ওয়াটার্স অ্যাক্ট’-এ স্বাক্ষর করে এটিকে আইনে পরিণত করেন, যার মাধ্যমে প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যে মাইক্রোবিডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
বাংলাদেশজুড়ে, নদী-নালা, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে প্লাস্টিক দূষণের দৃশ্যমান উপস্থিতি ব্যাপক। তাই সহজেই কল্পনা করা যায় যে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের জলব্যবস্থায় প্রবেশ করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আমাদের উদ্বেগ কেবল ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যে থাকা মাইক্রোবিডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
প্লাস্টিক বর্তমানে মানুষের জীবনের একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বৈশ্বিকভাবে এর বার্ষিক উৎপাদন বর্তমানে ৪০০-৪৫০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। সম্প্রতি বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার খুবই ব্যাপক হারে বেড়েছে, যার প্রমাণ আমাদের আশপাশে তাকালেই বোঝা যায়। সম্প্রতি সারা দুনিয়ায় বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরিবেশে প্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। প্লাস্টিককে ‘ইমারজিং কন্টামিনেন্ট’ বা ‘উদীয়মান দূষক’ হিসেবে চিন্তা করা হয়, যার প্রভাবের মাত্রা বিভিন্ন প্রাণী এবং পরিবেশে এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণ এখনো গবেষকদের জন্য একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ, এর কারণ মূলত এটা সময়সাপেক্ষ এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে, বিশ্লেষণের সময় পটভূমিগত (ব্যাকগ্রাউন্ড) দূষণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে গবেষকদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। এ ছাড়া নমুনার জটিলতা, মানসম্মত প্রটোকলের অভাব, কণাগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত ও গণনা করার অসুবিধা, দীর্ঘ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া এবং উন্নত অণুবীক্ষণ যন্ত্র ও বিশ্লেষণমূলক সরঞ্জামের সীমিত প্রাপ্যতা মাইক্রোপ্লাস্টিক বিশ্লেষণের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণের গাইডলাইনও খুবই ঘন ঘন বদলে যাচ্ছে, কারণ এর অন্তর্নিহিত বিজ্ঞান দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদম সাম্প্রতিক সুপরিচিত জার্নাল, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা, ইপিএ এবং আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ সংস্থা আইএসও মাইক্রোপ্লাস্টিকের শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে মাইক্রো-এফটিআইআর (ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কপি) এবং রামান স্পেকট্রোস্কপি এর ব্যবহার তথ্যের সত্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বের সঙ্গে দেখে।
এই স্পেকট্রোস্কপি বর্ণালি বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো বস্তুর রাসায়নিক গঠন শনাক্ত করে, যা থেকে প্লাস্টিকের সুনির্দিষ্ট ধরন শনাক্ত করা যায়। এই স্পেকট্রোস্কপিক ডেটা ছাড়া কোনো পার্টিকেলকে প্লাস্টিক বলে মেনে নেওয়া হয় না, কারণ শুধু খালি চোখে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণ খুবই অনির্ভরযোগ্য। এতে ভুল প্লাস্টিক শনাক্তকরণের হার ২০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন জৈব পদার্থ ও অ-প্লাস্টিক কণাও দেখতে প্লাস্টিকের মতো হওয়ায় সঠিক শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে।
মাইক্রোবিডের মূল উপাদান সাধারণত পলিপ্রপাইলিন, পলিইথিলিন, যা নিত্য ব্যবহার্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ, খাবার রাখার বাটি, পানির জগের মতো পণ্যেরও মূল উপাদান। এগুলোকে ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ও বলা হয়ে থাকে, যা সাধারণত একবার ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। আইনের ঘাটতি, সহজলভ্যতা এবং স্বল্প দামে পাওয়া যাওয়ার কারণে মানুষ খুব দ্রুতই এসব প্লাস্টিককে আধুনিক জীবনধারার অপরিহার্য অংশ বানিয়ে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্লাস্টিক দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে শুধু ঢাকাতেই মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ২৫ কিলোগ্রাম। বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন করা হয়, কিন্তু মানুষের অসচেতনতা, জৈবভাবে পচনশীল উপকরণের খরচ এবং আইন প্রয়োগের অভাবের কারণে পরিবেশ থেকে প্লাস্টিকের অপসারণ আরও কঠিন করেছে।
বাংলাদেশজুড়ে, নদী-নালা, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে প্লাস্টিক দূষণের দৃশ্যমান উপস্থিতি ব্যাপক। তাই সহজেই কল্পনা করা যায় যে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের জলব্যবস্থায় প্রবেশ করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আমাদের উদ্বেগ কেবল ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যে থাকা মাইক্রোবিডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
বিশ্বজুড়েই প্লাস্টিক বর্জ্য একটি উদ্বেগের বিষয়, যার পদক্ষেপ হিসেবে উন্নত দেশগুলো নির্ধারিত স্থানে প্লাস্টিক পণ্য ফেলা, প্লাস্টিকের বদলে কাচ এবং স্টিলের পণ্য ব্যবহার এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বা রিসাইকেলিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং জীবজগতের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কিত গবেষণা এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে থাকলেও, ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
ড. ঊর্মি নিশাত নিনি এনভায়রনমেন্টাল টক্সিকলজিস্ট, গ্র্যাজুয়েট টিচিং ফেলো, ডেকিন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।