বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিতর্ক কোনো নতুন বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেধাতান্ত্রিক’ শাসনব্যবস্থা বা মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মেরিটোক্রেসি কি শুধু পরীক্ষায় পাওয়া নম্বরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে? না, বস্তুত মেরিটোক্রেসি হলো দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতার সমন্বিত রূপ।
ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল ইয়ং তাঁর দ্য রাইজ অব মেরিটোক্রেসি বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন, এ ব্যবস্থাও একসময় নতুন ধরনের অভিজাততন্ত্র তৈরি করতে পারে, যদি না এর সঙ্গে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনে সেই মেধা ও জবাবদিহির অবস্থান ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না?
বিশ্বের প্রথম মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থা হিসেবে প্রাচীন চীনের সাম্রাজ্যিক পরীক্ষাপদ্ধতির কথাও উল্লেখ করা যায়। সেটি কনফুসীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ শাসনামলের আইসিএস এবং পাকিস্তান আমলের সিএসপি ছিল উচ্চ প্রতিযোগিতাভিত্তিক অভিজাত প্রশাসনিক কাঠামো।
স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে নতুন বিসিএস গঠন করা হলেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাব প্রশাসনের ভেতরে প্রবেশ করে। ১৯৭২-৭৫ সময়ে প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রবণতা শুরু হয়। ১৯৮০-৯০ দশকে ক্যাডার বিভাজন তীব্র হয়। বিশেষ করে ২০০৯-২০২৪ সময়ে প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ ছিল। ফলে বর্তমান সংকট শুধু কোনো এক সরকারের সৃষ্টি নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ফল।
অন্যদিকে বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র ছয় বছর আগে স্বাধীন হয়ে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ ‘স্কলারশিপ টু সার্ভিস’ মডেলের মাধ্যমে বিশ্বসেরা গ্র্যাজুয়েটদের প্রশাসনে টেনে এনেছিলেন, যা দেশটিকে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সরকার সিনিয়র সার্ভিস পুল চালু করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ১৯৮৭ সালে অ্যাডমিন ক্যাডারদের বাধার মুখে তা বাতিল হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় সিনিয়র সিভিল সার্ভিস মডেল চালু হয়েছে ২০০৬ সালে।
এই মডেলে রিগোরাস অ্যাসেসমেন্ট (কোনো বিষয়, কাজ, প্রকল্প, নীতি বা ব্যক্তির কর্মদক্ষতাকে অত্যন্ত কঠোর, গভীর, পদ্ধতিগত ও নিরপেক্ষ মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা) এবং মেরিট-বেজড কমপেনসেশনের (যোগ্যতা, দক্ষতা ও পারদর্শিতার ভিত্তিতে বেতন, বোনাস বা আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের পদ্ধতি) মাধ্যমে সেরা মেধা নিয়োগ করা হয়, এটি নীতি বাস্তবায়নকে শক্তিশালী করেছে। ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রশাসনে সংস্কার করা হয়েছে ২০১৪-১৫ সালে। দেশটিতে মেরিট-বেজড সিস্টেম চালু করায় গভন্যান্স ইনডেক্স ২০ শতাংশ উন্নত হয়েছে।
বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে বর্তমানে উপসচিব থেকে ঊর্ধ্বতন পদে প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রাধান্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ফলে অন্যান্য ক্যাডারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং আন্তক্যাডার প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে কাঠামোগত বৈষম্যে রূপ নিয়েছে।
সিনিয়র সার্ভিস পুল আবার চালু করা গেলে ক্যাডারভিত্তিক প্রাধান্যের বদলে পরীক্ষা ও পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারে। তবে এটি করতে গেলে শক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার যুগ্ম সচিব বা এর চেয়ে ওপরের পোস্টে ল্যাটারাল এন্ট্রির ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিল। আমাদের দেশে অনেক পদে বাইরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও সরকার ইচ্ছা করলে তাঁদের নিয়োগ দিতে পারে না। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ আনলে অবশ্যই প্রশাসনে গতি আসবে।
ভারতে ২০১৮ সাল থেকে যুগ্ম সচিব পর্যায়ে ল্যাটারাল এন্ট্রি চালু হয়েছে। যুক্তরাজ্যে সিনিয়র সিভিল সার্ভিসে যেকোনো পদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিশেষজ্ঞরা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন, যা প্রশাসনে নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা ও গতিশীলতা আনে।
আমাদের মন্ত্রী বা সচিবেরা অনেক সময় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ না হয়ে থাকতে পারেন। এ কারণে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সব আমলা ও মন্ত্রীর সঙ্গে একজন বিশেষজ্ঞ পলিসি অ্যাডভাইজর রাখা উচিত, যাঁরা কাজ কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, তা দুই পক্ষকেই সাহায্য করবেন। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ক্ষেত্রে এ কাজ করে সাফল্য পেয়েছে।
এই তিন ক্ষেত্রেই মেধাকে হতে হবে একমাত্র চাবিকাঠি। এ জন্য প্রয়োজনে এইচআর ফার্মের সহযোগিতায় মেধা মূল্যায়ন নীতিমালা গঠন করা উচিত। সময়ভিত্তিক প্রমোশন বা সবার এক–বেতন–বৃদ্ধি বন্ধ করতে হবে। কেউ ঠিকমতো কাজ না করলে তাঁর চাকরি চলে যাওয়ারও ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই কাজ করতে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, পাবলিক সার্ভিস কমিশনেরও স্বাধীনতা দরকার।
জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়মিত ভিত্তিতে মিডিয়ার সামনে আনতে হবে। সব দপ্তরে অনলাইন অভিযোগ এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড গভন্যান্স ইন্ডিকেটর অনুযায়ী ‘সরকারের কার্যকারিতা’ সূচকে বাংলাদেশ এখনো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, শ্রীলঙ্কা বা ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানের তুলনা করা যেতে পারে, যা আমাদের পশ্চাৎপদতাকে আরও পরিষ্কার করবে।
১৫ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারী নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। এই বিশাল মানবসম্পদ যদি দক্ষভাবে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। একটি সক্রিয় ও স্বাধীন গণমাধ্যম এবং তদবিরহীন সুশীল সমাজ প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারে।
প্রশাসনের অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির খবর প্রকাশের মাধ্যমে তারা প্রশাসনকে সৎ ও দক্ষ থাকতে বাধ্য করবে।
জনবান্ধব প্রশাসন গঠনে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর বিকল্প নেই। যতটা সম্ভব সব অনলাইনে নিয়ে যেতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থা যেখানে অনলাইনে আবেদন করে আবার ব্যক্তিগতভাবে দেখা করিয়ে কাজ করতে হয়, তা বন্ধ করতে হবে।
সব মন্ত্রণালয়ের সার্ভার, ওয়েবসাইট ও ডোমেইন সিকিউরিটি আপডেট করতে হবে। এখনো অনেকে ব্যক্তিগত ই–মেইল অফিসের কাজে ব্যবহার করে, যা শুধু দৈন্য নয়, সিকিউরিটিও হুমকির মুখে ফেলে।
এস্তোনিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ডিজিটাল রাষ্ট্র, যার ৯৯ শতাংশ সরকারি সেবা অনলাইনে প্রদান করে। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সরকারি ক্রয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে ‘কোনেপস’ নামে ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম চালু করেছে, যা মধ্যস্বত্বভোগী ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করেছে।
সবার এবং তাদের পরিবারের সম্পত্তির হিসাব নিয়ে তা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মুক্ত করে দেওয়া উচিত। সরকারি সব ডিপার্টমেন্টের ফিন্যান্সিয়াল এবং পারফরম্যান্স অডিট করা উচিত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সার্ভে অনুসারে, ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ পাবলিক সার্ভিসে দুর্নীতির শিকার। রুয়ান্ডার কথা বলা যেতে পারে, যেখানে ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহির মাধ্যমে প্রশাসনকে পুনর্গঠিত করা হয়। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের অনেক আইন এখনো বলবৎ, যা আধুনিক প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অকার্যকর।
আইন কমিশনকে শক্তিশালী করে পুরোনো আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। দুদককে স্বাধীন এবং শক্তিশালী করতে হবে। মেরিটোক্রেসি কেবল পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না, প্রমোশন বোর্ডে, ট্রান্সফার অর্ডারে ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় এটি প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক সুরক্ষা ভেঙে না দিলে দুর্নীতিবিরোধী নীতি কার্যকর হয় না।
বর্তমান বেতনকাঠামো আধুনিকীকরণ করে বেসিকের পরিবর্তে আধুনিক কস্ট টু কোম্পানি (সিটিসি) ফরম্যাটে আনতে হবে। সবাইকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিয়ে আসতে পারলে সরকারের অনেক খরচ কমে যাবে। বর্তমান বাস্তবতায় আসলেই সবার বেতন বাড়ানো উচিত। দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে যথোপযুক্ত সময়ে সৎ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য পে স্কেল দেওয়া উচিত।
সরকারি পেনশন দায় বর্তমানে জাতীয় বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের সমপরিমাণ আর্থিক দায় ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের আর্থিক ঝুঁকি কমবে। বর্তমানে ভিয়েতনাম তাদের সিভিল সার্ভিসে ‘পারফরম্যান্স-বেজড পে’ বা কর্মদক্ষতাভিত্তিক বেতনব্যবস্থা চালু করে অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। কিন্তু বাংলাদেশে জবাবদিহির অভাবে ২০১৫ সালের পে স্কেলের পর দুর্নীতি কমেনি, বরং বেড়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি উদ্যোগ লোকসানে আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেতন–ভাতা যত দিন নিজেদের আয়ে করতে না দেওয়া হবে, সেগুলো লোকসানে থাকবে। তাই এসব প্রতিষ্ঠান মার্জ করা অথবা বেসরকারি খাতে দেওয়া কিংবা বা বন্ধ করে দেওয়াটাই সমাধান। ট্যাক্সের টাকা দিয়ে এই বিশাল ক্ষতি আর কত দিন পূরণ করব?
আমলাতন্ত্র দলীয়করণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের এবং তারপর রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীরা কোন দলীয় আনুগত্য এবং সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী আন্দোলন করতে পারে না। তাই এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নিতে হবে।
মেরিটোক্রেসি বাস্তবায়ন মানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ না হলে মেধাবী কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করার আগ্রহ হারান। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকারে মেধাবী পেশাদারদের (যেমন নগর–পরিকল্পনাবিদ বা কৃষিবিশেষজ্ঞ) সরাসরি নীতিনির্ধারণী ভূমিকা প্রদান করা প্রয়োজন।
যদিও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ, এতে আনুগত্যের জায়গায় প্রতিযোগিতা আসে এবং দলীয় সুবিধাভোগীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু এই ঝুঁকি না নিলে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার লড়াইয়েও রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হবে। কারণ, একটি অদক্ষ ও জবাবদিহিহীন প্রশাসনের ভার কাঁধে নিয়েও দেশ এগোতে পারবে না।
সরকার বদলায় পাঁচ বছরে, কিন্তু প্রশাসন থাকে পাঁচ দশক। যদি প্রশাসন দলীয় হয়, রাষ্ট্র কখনো নিরপেক্ষ হয় না।
সুবাইল বিন আলম টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক
*মতামত লেখকের নিজস্ব