
গত ২৬ আগস্ট মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নেপাল ও চীনের মধ্যকার অন্যতম প্রধান সীমান্ত ক্রসিংটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। গলিত হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া এক আকস্মিক বন্যায় নেপাল অংশের রাসুয়াগাধি ও চীন অংশের জিরোং পুরোপুরি ভেসে যায়। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে দুই পাড়ের গ্রাম, সেতু আর সড়ক।
ইতিমধ্যেই কয়েক শ মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে—যাঁদের মধ্যে বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও আছেন। সবচেয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে না পারায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির রূপ পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তবে তিব্বতের কথা ভিন্ন; সেখানকার তথ্য নিয়ন্ত্রণে চীনের দীর্ঘদিনের কঠোর নীতির কারণে হতাহতের আসল সংখ্যা হয়তো কোনো দিনই প্রকাশ পাবে না।
এমনিতেই দরিদ্রতার সঙ্গে লড়তে থাকা নেপালকে ত্রাণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পুনর্গঠনের এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। গত মার্চে তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) এক সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে সরিয়ে যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের জন্য এটিই প্রথম বড় পরীক্ষা।
প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর সরকার দুই বড় প্রতিবেশী—চীন ও ভারতের ওপর একক নির্ভরতা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে; কিংবা তাদের দ্বন্দ্বে জড়াতে চায় না। নয়াদিল্লি, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমান দূরত্ব ও সমতার সম্পর্ক রেখে কাঠমান্ডু নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে নেপালের প্রতিবেশী যে তিব্বত—১৯৫০ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে জোরপূর্বক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকে যা চীন পরিচালনা করে আসছে—সেই সীমান্ত অঞ্চলে এমন ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলাকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
বেইজিংয়ের সঙ্গে কাঠমান্ডুর উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। নেপাল সরকার বরাবরের মতোই ‘এক চীন’ নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তিব্বতিদের যেকোনো ধরনের তৎপরতা সেখানে নিষিদ্ধ। কিন্তু তিব্বতের ওপর চীনের এই চরম রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ নতুন এক জটিলতার জন্ম দিচ্ছে।
পুরো অঞ্চলটিকে একটি সামরিকায়িত সীমান্ত হিসেবে পরিচালনা করে বেইজিং। সেখানে যাতায়াত করতে হয় কঠোর অনুমতি ও ছাড়পত্রের মাধ্যমে। সশস্ত্র পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশিদের—তাঁরা বিদেশি সাংবাদিক, স্বাধীন গবেষক কিংবা এমনকি কূটনীতিক যাই হোন না কেন—প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। তিব্বত যেন এক তথ্যশূন্য অন্ধকার রাজ্য।
বেইজিংয়ের এই নিরাপত্তাশঙ্কা কেবল নিজের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা সীমান্ত পেরিয়ে নেপালেও এসে পড়ে। কারণ, নেপালে ১০ হাজারের বেশি তিব্বতি শরণার্থী বাস করেন এবং তিব্বত থেকে পালিয়ে আসার প্রধান পথও এটি। চীন প্রতিনিয়ত নেপালকে চাপ দেয় যেন তিব্বতি সক্রিয়তাবাদীদের দমন করা হয়, সীমান্ত পারাপার বন্ধ রাখা হয় এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে একটি নিরাপত্তা অংশীদারিতে রূপ দেওয়া হয়—যাতে বাইরের বিশ্ব থেকে তিব্বতকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা যায়।
এই সীমান্তজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান ততটুকুই ঘটে, যতটুকু চীন সরকারের সীমান্ত নিরাপত্তা অনুমোদন দেয়। তবে সর্বশেষ দুর্যোগটি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—নেপালের সংকট শুধু সীমান্ত পারের বৈরী বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে না; তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও এর জন্য সমান দায়ী।
অন্যদিকে, আকস্মিক বন্যার আভাস বা পূর্বাভাস পাওয়ার জন্য তিব্বত মালভূমির হিমবাহ ও নদীর যেসব তথ্য অত্যন্ত জরুরি, চীন সেগুলোকে ‘কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল’ মনে করে গোপন রাখে। চীনের সীমান্ত থেকে রিয়েল-টাইমে হিমবাহ গঠিত হ্রদ বা নদীর ডেটা পাওয়ার মতো কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেপালের নেই। নেপালের কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার সরাসরি বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে তথ্য আটকে রাখার অভিযোগও তুলেছেন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে, যেখানে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানো বা উজানের হ্রদ উপচে পড়া পানির আগাম সতর্কবার্তা ভাটিতে পাঠানো জরুরি হয়ে পড়ে, তখন পুরো প্রক্রিয়াটি গতি পাওয়ার বদলে একটি নিয়ন্ত্রিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার চক্রে আটকে যায়।
সাম্প্রতিক তথ্যপ্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবার হিমবাহ ধসের ঘটনাটি নেপাল সীমান্তের ভেতরের লাংটাং লিরুং চূড়ার কাছাকাছি ঘটেছিল। তবে বন্যা যেখান থেকেই শুরু হোক না কেন, ভাটির মানুষগুলোর কাছে কোনো প্রাক্-সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি।
নেপালের রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বরফ ধসে আসা এই ধ্বংসাত্মক বন্যার কোনো আভাসই তাঁদের কাছে ছিল না। বন্যার তীব্র গতি হয়তো মানুষকে সতর্ক করার মতো পর্যাপ্ত সময় দেয়নি। এমনকি নেপালের নিজস্ব পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোও সতর্কবার্তা পাঠানোর আগেই পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে।
তবে আমার নিজের গবেষণায় যা দেখেছি, এর পেছনে একটি গভীর ও কাঠামোগত সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে। সীমান্ত অঞ্চলজুড়ে রিয়েল-টাইমে সতর্কবার্তা পাঠাবে—এমন কোনো স্থায়ী বা বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সতর্কবার্তা তৈরিতে সাহায্য করতে পারে এমন ডেটার বড় অংশই আটকা পড়ে আছে একটি কঠোর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকাঠামোর ভেতরে।
এর আগেও ২০১৬ সালে তিব্বতের একটি হ্রদ ভেঙে গিয়ে নেপালের ভোটেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল; তখনো কোনো আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে নেপালের পানিবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, চীন বহুকাল ধরেই তিব্বত অংশের বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদগুলোর অত্যাবশ্যকীয় তথ্য দিতে গড়িমসি করছে।
দুই দেশের মধ্যে যে একেবারেই সহযোগিতা নেই তা নয়, তবে তা অত্যন্ত সীমিত এবং কোনো ঘটনা ঘটার পর দেখা যায়। চীন ও নেপাল যৌথভাবে কেবল ‘চিরেনমাকো’ নামের একটি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ করে। এটি এমন এক ব্যবস্থা, যা ধীরে ধীরে জমা হওয়া পানির হ্রদের ওপর নজর রাখে, কিন্তু কোনো নির্জন উপত্যকায় হঠাৎ ধস নামলে এর কোনো কার্যকারিতা থাকে না।
এই সীমান্তজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান ততটুকুই ঘটে, যতটুকু চীন সরকারের সীমান্ত নিরাপত্তা অনুমোদন দেয়। তবে সর্বশেষ দুর্যোগটি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—নেপালের সংকট শুধু সীমান্ত পারের বৈরী বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে না; তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও এর জন্য সমান দায়ী।
নদী উপত্যকাগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ, যত্রতত্র রাস্তা ও বাঁধ তৈরি, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র এবং নিজস্ব সক্ষমতার অভাব পরিস্থিতিকে দিনে দিনে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
এমন বাস্তব কেবল নেপাল বা চীন সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের হিমালয় সীমান্তসহ বিশ্বের অনেক সীমান্ত এলাকাকেই প্রধানত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে দেখা হয়, যার সরাসরি বলি হতে হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে। ২০২৫ সালে কাশ্মীরে একটি সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ‘সিন্ধু পানিচুক্তি’ স্থগিত করে এবং পাকিস্তানে নদী–সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর কয়েক মাস পর যখন মৌসুমি বন্যায় পাকিস্তান প্লাবিত হয়, তখন ইসলামাবাদ স্পষ্ট করে জানিয়েছিল—তথ্য না পাওয়ার কারণেই ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিব্বত মালভূমি এখন নেপাল, ভারত থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত—ভাটির সব দেশের জন্যই এক বিপজ্জনক দুর্যোগের উৎস হয়ে উঠছে। এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে হিমালয়কে কোনো সামরিক সংঘটিত অঞ্চল হিসেবে না দেখে একটি ‘যৌথ পরিবেশগত অঞ্চল’ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সীমান্ত অতিক্রমকারী তথ্য আদান-প্রদান এবং একটি বিশ্বস্ত প্রাক্-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ভূমিকম্প, ভূমিধস ও বন্যার চরম ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। নতুন নেপাল সরকারের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সত্যিকারের পরীক্ষা কোনো পরাশক্তিকে তুষ্ট করার মধ্যে নয়, বরং এটি নিশ্চিত করার মধ্যে—যেন তাদের জনগণের জীবন রক্ষা অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তাশঙ্কার কাছে জিম্মি হয়ে না পড়ে।
পাহাড়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো হয়তো সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, এ অঞ্চলের দেশগুলো কি নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষার চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোকে বেশি গুরুত্ব দেবে?
দিব্যেশ আনন্দ ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক। দ্য কনভারসেশন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।