সম্মিলিতভাবে পরস্পরের সহযোগিতায় কাজ করাকে সমবায় বলে। এর মূল ভিত্তি হলো সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থা। সমবায়ের মাধ্যমে মানুষ নিজের উন্নতির পাশাপাশি অন্যের কল্যাণেও ভূমিকা রাখে।
সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমবায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে এ দর্শন বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যকে সাহায্য করবে না। আল্লাহকে ভয় করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২) ‘নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫৯)
সমবায়ের উদ্দেশ্য শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য দূর করা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাও এর লক্ষ্য। সম্মিলিত উদ্যোগে বড় কাজ সহজে সম্পন্ন করা যায়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাজের উন্নয়নে অংশ নেয়। পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাশ্রম, মিতব্যয়িতা ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ সমবায়কে শক্তিশালী করে। ইসলামের লক্ষ্যও ব্যক্তির আত্মপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ও বৃহত্তর মানবকল্যাণ নিশ্চিত করা।
সমবায় ও জাতীয় সংহতি ইসলামের পরস্পর সম্পূরক দুটি দর্শন। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করলেই একটি কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব
সমবায়ী চেতনার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর তরুণ বয়সে গঠিত ‘হিলফুল ফুজুল’। এই সেবাধর্মী সংঘের উদ্দেশ্য ছিল সমাজ থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও বৈষম্য দূর করা; নাগরিক ও আগন্তুকদের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করা; বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এটি প্রমাণ করে, ইসলামের আবির্ভাবের আগেই মহানবী (সা.) সামাজিক সহযোগিতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সম্মিলিত উদ্যোগে অংশ নিয়েছিলেন।
ইসলামে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, পরোপকার, বিপদে সহযোগিতা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, এতিম ও দরিদ্রের সেবা, রোগীর পরিচর্যা এবং নারী-পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, ইবাদতেরও অংশ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১০)
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়তার সঙ্গে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে–ইমরান, আয়াত: ১০৩)। ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ কোরো না, তা করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৪৬)
মহানবী (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের উদাহরণ দিয়েছেন একটি দেহের সঙ্গে। তিনি বলেন, পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার ক্ষেত্রে মুমিনরা একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে অন্য অঙ্গগুলোও তার কষ্ট অনুভব করে। (বুখারি ও মুসলিম) এই শিক্ষা সমবায়ী সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
ইসলামে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি বংশ, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থান নয়; বরং ইমান, আমল, তাকওয়া ও ইখলাস। তাই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ত্যাগের মানসিকতা, সহনশীলতা, উদারতা ও সদাচার। হিংসা, বিদ্বেষ, পরনিন্দা, সন্দেহ ও সম্পর্কচ্ছেদ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, হিংসা কোরো না এবং সম্পর্কছেদ কোরো না। বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকো। (বুখারি ও মুসলিম)
অতএব, সমবায় ও জাতীয় সংহতি ইসলামের পরস্পর সম্পূরক দুটি দর্শন। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করলেই একটি কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com