বিশ্ব আবহাওয়া দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘আজকের পর্যবেক্ষণ, আগামী দিনের সুরক্ষা’। এই প্রতিপাদ্য বর্তমান সময়ের রূঢ় বাস্তবতাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আধুনিক বিশ্বে আবহাওয়া ও জলবায়ু এখন আর শুধু প্রতিদিনের সংবাদ বা ঘরোয়া আলোচনার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, জননিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পরিবর্তিত এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষণ, পূর্বাভাস ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
গত এক দশকে আবহাওয়া পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতিতে একটি বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। একসময় পূর্বাভাস মানে ছিল কেবল বৃষ্টিপাত হবে কি না, তাপমাত্রা কেমন থাকবে কিংবা বাতাসের গতিবেগ কত হবে, এমন কিছু সাধারণ তথ্য। বর্তমানে আবহাওয়াবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ইমপ্যাক্ট–বেজড বা প্রভাবভিত্তিক পূর্বাভাস। এখন শুধু বৃষ্টির সম্ভাবনা বলা হয় না, বরং ওই বৃষ্টির ফলে কোথায় বন্যা বা জলাবদ্ধতা হবে, বজ্রপাতের সুনির্দিষ্ট সময় ও স্থান এবং তাপপ্রবাহ কিংবা শৈত্যপ্রবাহ জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মূলে রয়েছে আমাদের উন্নত ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
জনগণের অর্থে সংগৃহীত আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করা কি উচিত নয়? এমন এক মৌলিক প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তথ্যের অবাধ বিনিময়ের ওপর জোর দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য আবহাওয়ার উপাত্ত সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রে বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ও জটিল।
সমুদ্রনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখন যেকোনো দেশের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাগরে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় ‘ওশান বয়া’ সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ এবং স্রোতের গতির মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি ও এর গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এই উপাত্তগুলো অমূল্য। বাংলাদেশের মতো একটি দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় দেশের জন্য এমন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো।
আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা এখন উন্নত নিউমারিক্যাল ওয়েদার প্রেডিকশন বা এনডব্লিউপি মডেল ও সমন্বিত উপাত্ত আত্তীকরণের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম উপগ্রহ, রাডার এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। এর ফলে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে দুর্যোগ আসার আগেই আর্থিক ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। একে বলা হয় পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনেছে।
আবহাওয়া বা জলবায়ু যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমানা মানে না, তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি অগ্রাধিকার। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক বিশেষায়িত মেটিওরোলজিক্যাল সেন্টারগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আঞ্চলিক পর্যায়ে দক্ষিণ এশিয়ার গবেষণার ক্ষেত্রটিতে একটি বড় শূন্যতা লাখ করা যায়। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্ক আবহাওয়া গবেষণাকেন্দ্রটি প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে ২০১৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ছিল এক বিশাল ভুল সিদ্ধান্ত। আঞ্চলিক আবহাওয়া গবেষণার সেই সক্ষমতা পুনরায় অর্জনে বিমসটেক সেন্টার ফর ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেটসহ সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আন্তসীমান্ত নদীগুলোর উজানে বৃষ্টিপাত ও পানির প্রবাহ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ছাড়া আমাদের নিম্নাঞ্চলের বন্যা মোকাবিলা করা অসম্ভব।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আবহাওয়ার রূপান্তর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের পূর্বাঞ্চলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুই বছর যে অভাবনীয় বন্যা দেখা গেছে তা এই জলবায়ু পরিবর্তনেরই সতর্কসংকেত। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা ও দেশের অন্যান্য স্থানে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্পষ্ট করে দেয় যে প্রাকৃতিক ধারা বদলে যাচ্ছে। ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর ৪৭ শতাংশই ঘটেছে এশিয়ায়। আর সেই তালিকায় সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র বাংলাদেশের। এ পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে।
বিপদ শুধু গ্রাম কিংবা উপকূলীয় এলাকায় নয়, শহরাঞ্চলেও বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাশয় ভরাটের ফলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ তৈরি হচ্ছে, যা শহরের ভেতরের তাপমাত্রা অসহনীয় করে তুলছে। পাশাপাশি সমুদ্রের তাপপ্রবাহ প্রবালপ্রাচীরের অপূরণীয় ক্ষতি করছে এবং পাহাড়ি অঞ্চলের তাপপ্রবাহ নিয়ে গবেষণা এখনো অনেকটাই উপেক্ষিত। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও বেশি ফলিত ও মাঠপর্যায়ের গবেষণার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। বিদেশি সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি সমাধান দানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর শতভাগ নির্ভর না হয়ে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
জনগণের অর্থে সংগৃহীত আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করা কি উচিত নয়? এমন এক মৌলিক প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তথ্যের অবাধ বিনিময়ের ওপর জোর দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য আবহাওয়ার উপাত্ত সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রে বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ও জটিল। এই তথ্য সহজলভ্য করা হলে একদিকে নীতিনির্ধারণী গবেষণা যেমন বেগবান হবে তেমনি ‘সিটিজেন সায়েন্স’ বা নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি সহজতর হবে।
বিনিয়োগের ভাষায় বলতে গেলে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু সরকারের একটি খরচ নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মতে যথাযথ সতর্কবার্তার মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদহানি ঠেকানো সম্ভব, যার সামগ্রিক সুফল বছরে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অবদানের সমান। আজ আমরা আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণে যতটা সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করব, আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর সম্ভাবনা ততটাই জোরালো হবে। এটাই হোক দিবসটির প্রকৃত অঙ্গীকার।
ড. মোহন কুমার দাশ লিডিং সায়েন্টিস্ট, স্কুল অব আর্থ সায়েন্স, ইউনান ইউনিভার্সিটি, চীন
ই-মেইল: mohan.smrc@gmail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব