ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

মতামত

যে কারণে ইরানের একজন খামেনি লাগবেই

ইরানে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ যাঁরা সমর্থন করে আসছেন, তাঁরা বহু বছর ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন—ইরানের বিদ্যমান সরকার দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক ক্ষয় ও সামাজিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে পুরো দেশের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে, তা বাইরের দেশের সহিংস বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকির চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

গত জানুয়ারির রক্তাক্ত দমনাভিযান এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ইরানি বিরোধীদের জোরালো ইতিবাচক প্রচার সেই ‘নৈতিক দ্বিধা’র প্রাচীর অনেকটাই নামিয়ে দেয়।

এর পরেই আসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ইরানিদের ‘উঠে দাঁড়াতে’ আহ্বান জানান। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যার ঘটনাকে বড় সাফল্য হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। কেবলমাত্র একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে সরিয়ে দিলে কি সত্যিই দ্রুত ও নির্ধারক ভাঙন নেমে আসবে? তার পরেই কি আসবে নির্বিঘ্ন ক্ষমতার রদবদল? অভিজ্ঞতা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। খামেনির পরের ইরান হয়তো হস্তক্ষেপপন্থীদের কল্পনায় আঁকা ছবির সঙ্গে মিলবে না।

ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের ফল সরলরৈখিক নয়। তা প্রায়ই অপ্রত্যাশিত ও দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের সূচনা করে। খামেনির মৃত্যু একটি যুগের প্রতীকী ইতি টানতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পরিসংখ্যান বলছে—এ ধরনের সহিংস ভাঙনের সম্ভাব্য ফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়, পুনর্গঠন নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসই তার সাক্ষী। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া—তিন দেশেই বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের পরে স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস’-এর তথ্যেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর আফগানিস্তানে শাসন পরিবর্তন ঘটে। এরপর দুই দশক ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বেসামরিকদের ওপর হামলা চলেছে। ২০২১ সালে পূর্বতন শাসকেরাই ক্ষমতায় ফিরে এলেও স্থিতি অধরাই রয়ে গিয়েছে।

২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর ইরাকেও একের পর এক বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ এবং অস্থিরতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়াস সত্ত্বেও দেশটি ২০০৩-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

২০১১ সালে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপের পরে লিবিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে। একসময় ইতিবাচক স্থিতিশীলতা সূচক থাকা দেশটি বিশ্বের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। আজও দেশটি ত্রিপোলি ও বেনগাজি—এই দুই ক্ষমতাকেন্দ্রে বিভক্ত।

এই তিন দেশের কোনোটিই হস্তক্ষেপের আগের স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারেনি। স্বল্পমেয়াদি ‘সমন্বয়’-এর বদলে তাদের ইতিহাসে জেগে আছে দীর্ঘস্থায়ী ভঙ্গুরতা ও অস্থিরতার ছাপ।

ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিয়া ইসলামের প্রতীকী জগতের অনুসারী। এখানে খামেনির মৃত্যু শহীদির ধারাবাহিকতার পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা পেতে পারে।

ইরানের শাসনব্যবস্থা আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতো নয়। খামেনির হত্যাকাণ্ড গভীর অভিঘাত আনতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার মানেই রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পতন—এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিয়া ইসলামের প্রতীকী জগতের অনুসারী। এখানে খামেনির মৃত্যু শহীদির ধারাবাহিকতার পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা পেতে পারে। ‘ইসলামের শত্রু’ বলে চিহ্নিত শক্তির হাতে মৃত্যু পরাজয় নয় বরং মুক্তির সোপান—এই ধারণা ইরানিদের মনোবল আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের উৎখাত হওয়া অন্য শাসকদের তিক্ত পরিণতির মতো নয়; বরং একধরনের পবিত্রকরণ। এটি ত্যাগের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনের মহিমান্বিত সমাপ্তি।

এই শাহাদাতের ভাষ্য জনতার একটি বড় অংশকে, এমনকি আগের সমালোচকদেরও, ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র বয়ানের চারপাশে টেনে আনতে পারে। পতিত নেতাকে ‘বিদেশি আগ্রাসনের শহীদ’ হিসেবে তুলে ধরলে জাতীয়তাবাদী আবেগ তীব্র হতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনী এবং ঐতিহ্যবাদী সমাজের অংশগুলোও একত্র হতে পারে—যা শাসন পরিবর্তনের সমর্থকেরা হয়তো ভাবেননি।

যদিও জানুয়ারির দমন-পীড়নের ক্ষত এখনো তাজা, এবং ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে আগের সংঘাতের তুলনায় পরিস্থিতি জটিল, তবু এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় শেখায়। তা হলো—বিদেশি হস্তক্ষেপের সময় যদি প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অক্ষত না থাকে, তবে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ইরানের সামনে তাই বড় প্রশ্ন—প্রশাসনিক ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা পাবে কি? তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর স্থায়িত্বে—অর্থাৎ সেই শক্তিশালী আমলাতন্ত্র ও প্রযুক্তিবিদ শ্রেণিতে, যারা দেশের অর্থব্যবস্থা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা চালায়।

যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক প্রশাসন নেতৃত্বহীনতার মাঝেও সচল থাকে, তবে লিবিয়ার মতো দেশ ভেঙে টুকরা টুকরা হওয়া এড়ানো সম্ভব। একইভাবে, ভৌগোলিক অখণ্ডতা নির্ভর করবে নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঐক্যের ওপর।

এ মুহূর্তে একজন ‘জাতীয় ঐক্যের মুখ’-এর সবচেয়ে বড় অভাব। জানুয়ারির রক্তাক্ত দমন-পীড়নে জনগণ ও রাজনৈতিক অভিজাতদের সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো নেতার পক্ষে সর্বজনগ্রাহ্যতা দাবি করা কঠিন।

‘সবার আগে নিরাপত্তা’ নীতির দিক থেকে মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ, হাসান রুহানি বা আলী লারিজানির মতো ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘প্রযুক্তিবিদ-সামরিক পরিষদ’ গঠনের চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু তাঁদের কারও মধ্যেই প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার মতো আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব নেই।

জনতার ক্ষোভ আর নিরাপত্তা কাঠামোর আত্মরক্ষামূলক মানসিকতার মধ্যে যে গভীর ফাঁক তৈরি হয়েছে, তার সেতুবন্ধ করতে না পারলে নতুন নেতৃত্ব কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হিমশিম খাবে।

অস্থিরতার আশঙ্কা

যদি প্রতিষ্ঠানগত ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে, কিংবা সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে, তবে দেশভাগ ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। আজ যে সহিংস ভাঙনের ডাক শোনা যাচ্ছে, তা হয়তো কাঠামোগত অনিরাপত্তার এক দীর্ঘ চক্রের সূচনা। এর ভার ইরানি সমাজকেই বইতে হবে।

দুটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মধ্যবিত্তের ক্ষয়। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞায় রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে স্থিতি আনার মতো সামাজিক স্তম্ভটি দুর্বল হয়েছে। শক্তিশালী মধ্যবিত্ত না থাকলে শূন্যস্থান দখল করতে পারে সশস্ত্র গোষ্ঠী বা নিরাপত্তা কাঠামোর উগ্র অংশ।

আইআরজিসি ও ইরানের একটি স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের কট্টর অংশ, যারা নতুন ব্যবস্থাকে নিজেদের অস্তিত্বের হুমকি মনে করে, তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে যাবে—এ আশা অবাস্তব। বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে সরে গিয়ে তারা বিকেন্দ্রীভূত বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে এবং দেশের অবকাঠামো সম্পর্কে জ্ঞান কাজে লাগিয়ে স্থিতি নস্যাৎ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক বৈচিত্র্য। ইরানের জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য মধ্যপ্রাচ্যের গড় দেশের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে এবং নিরাপত্তা নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত থাকলে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও মিলিশিয়া রাজনীতির ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সীমান্ত অঞ্চলে বালুচ, কুর্দি ও আরব সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পূর্ণমাত্রার বিচ্ছিন্নতাবাদে রূপ নিতে পারে। বড় শহরে নিরাপত্তাশৃঙ্খল ভেঙে গেলে স্থানীয় মিলিশিয়ারা এলাকা দখলে নেমে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষমতার লড়াইয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মধ্যে ‘অভিজাতদের যুদ্ধ’ শুরু হওয়া অবশ্যম্ভাবী—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই তখন উত্তরাধিকার যুদ্ধে রণক্ষেত্র।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘অন্তহীন তিক্ততার চেয়ে তিক্ত সমাপ্তি ভালো’—এই যুক্তিতে বিদেশি হস্তক্ষেপকে সমর্থন করা হয়েছে। যেন সামরিক শক্তিই দ্রুত সমাধান এনে দেবে।

কিন্তু ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের ফল সরলরৈখিক নয়। তা প্রায়ই অপ্রত্যাশিত ও দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের সূচনা করে। খামেনির মৃত্যু একটি যুগের প্রতীকী ইতি টানতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পরিসংখ্যান বলছে—এ ধরনের সহিংস ভাঙনের সম্ভাব্য ফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়, পুনর্গঠন নয়।

ইরানের মানুষের কাছে তাই কোনো শাসনের ‘তিক্ত সমাপ্তি’ হয়তো শেষ নয়; বরং আরেক নতুন, কাঠামোগতভাবে প্রোথিত ‘অন্তহীন তিক্ততা’র সূচনা। এর অভিঘাত বহু দশক ধরে গোটা অঞ্চলকে তাড়িয়ে বেড়াতে পারে।

মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিট্যাট মারবুর্গ-এর মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ