
ভারত এখন এক অস্বাভাবিক গ্রীষ্মের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশজুড়ে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে ৪৬ ডিগ্রির দিকে এগোচ্ছে। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের আকোলা শহরে ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৬.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শুধু তা–ই নয়, একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনার খবরও আসছে। জনশুমারির কাজে নিযুক্ত কর্মীদের মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোট দিতে বেরিয়ে মারা গেছেন কয়েকজন ভোটার। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাসে ওঠা এক ব্যক্তি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই গরমের কারণে প্রাণ হারান। এপ্রিলের শেষ দিকে এক দিনে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের সব কটিই ছিল ভারতে।
ভারতের আকাশে ওঠা সূর্যের আলোর মধ্যেই যেন একধরনের জ্বালা আছে, যার কারণে খালি চোখে তাকানোও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এমনকি সকাল সাতটার সময়ও চোখ ঢাকতে হচ্ছে। কৃষকেরা বাইরে কাজ করতে পারছেন না। গবাদিপশু তাপজনিত চাপের মধ্যে আছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়েছে; কারণ, এই তাপপ্রবাহ খাদ্যের সরবরাহকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও ভয়াবহ হলো, এই চরম গরম শুধু হৃদ্রোগ বা হিটস্ট্রোকই নয়, কিডনির ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত এবং ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, মানসিক রোগসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতাকে বাড়িয়ে তুলছে।
ভারতের সংবাদপত্রে কিছু মৃত্যুর খবর এলেও বাস্তবে তাপজনিত মৃত্যুর বড় অংশই নথিভুক্ত হয় না। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, বড় কোনো বিপর্যয়ে যাঁরা প্রথম মারা যান, তাঁরা কেবল সংখ্যা হয়ে যান—যেমন আশির দশকের এইচআইভি রোগী বা সাম্প্রতিক কোভিড মহামারিতে হয়েছে। যতক্ষণ না মৃতদেহের পাহাড় তৈরি হয়, ততক্ষণ আমরা সেটাকে কোনো নাম দিই না, কোনো সতর্কসংকেতের পতাকা তুলি না।
তবে বাস্তবতা হলো, ভারত এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
ভারতের ষোড়শ অর্থ কমিশন সুপারিশ করেছে, তাপপ্রবাহকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হোক। কিন্তু এই সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা তহবিল পাওয়া কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সাহায্য পাওয়া—সবই এমন এক আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে, যা মানুষকে হতাশ করে তোলে।
সমালোচকদের মতে, প্রতিটি সংকটেই সরকার এটিকে প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগে পরিণত করেছে। ক্যামেরার সামনে কর্মকর্তাদের মুখ মুছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর রাজধানীতে চালু করা হয়েছে তথাকথিত ‘কুলিং পয়েন্ট’, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বিশ্বের বহু দেশ যখন সবুজ আচ্ছাদন, গাছপালা, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ভারতে চিত্র উল্টো। সরকার, আদালত এবং বেসরকারি উন্নয়নকারীদের উদ্যোগে চলছে ব্যাপক বৃক্ষচ্ছেদন। মহারাষ্ট্রের নাশিক শহরে শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে প্রতিবাদের পরও। পুনেতেও পুরোনো গাছ কেটে চার লেনের রাস্তা তৈরি হচ্ছে। বেঙ্গালুরুতে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে মেট্রোর জন্য। আর কাশ্মীরে, যেখানে আগে এমন গরমের অভিজ্ঞতা ছিল না, সেখানে মালবেরি, আখরোট ও চিরসবুজ চিনারগাছও কেটে ফেলা হচ্ছে ‘স্মার্ট শহর’ ও প্রশস্ত রাস্তার নামে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার করে বহু বিজ্ঞানী ও গবেষককে চিন্তায় ফেলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জলবায়ু বদলায়নি, আমরা বদলেছি। আমাদের অভ্যাস বদলেছে।’
ভারতের বড় শহরগুলোর এই দহন এখন সামাজিক বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। জাত, শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। বৃক্ষছায়াহীন রাস্তায় পড়ে থাকছে শুধু গৃহহীন মানুষ আর ফুটপাতের বিক্রেতারা। আর ধনীরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাড়ি থেকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে করে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিস, শপিং মল ও স্কুলে যাতায়াত করছে। এখানে দরিদ্ররাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হার্ভার্ডের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট সম্প্রতি একটি হোয়াইট পেপারে প্রশ্ন তুলেছে—কতটা গরম হলে তা মানুষের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়? গবেষণা বলছে, ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর্দ্র তাপমাত্রার ওপরে মানবদেহ আর নিজের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এমন অবস্থায় ছায়ায় বিশ্রাম নিলেও, পর্যাপ্ত পানি পান করলেও শরীরের তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হিটস্ট্রোকে মৃত্যু ঘটতে পারে।
এ গবেষণা আরও জানায়, প্রায় ৩৮ কোটি ভারতীয় এমন পরিস্থিতিতে বাস করছে, যা মানবদেহের সহ্যক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
অথচ জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলার পরও মোদি প্রশাসন প্রতিবছরের তাপজনিত মৃত্যুর সঠিক হিসাব প্রকাশে ব্যর্থ। বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমালোচনা বাড়ছে যে ভারতের তাপমাত্রা তথ্যব্যবস্থা বিভক্ত, অস্বচ্ছ এবং ধীর।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরও তাপমাত্রা পরিমাপ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে একবার ৫২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ভুল রেকর্ড নিয়ে দপ্তরটি পরে জানায়, সেটি ছিল যন্ত্রের ত্রুটি।
প্রতিবছর এই দগ্ধ গ্রীষ্ম ভারতের তাপ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে, যা বহু আগেই হওয়া উচিত ছিল।
এ বছরের তাপপ্রবাহের প্রভাব এখনো বিশ্লেষণাধীন। তবে যারা এই সময়টা পার করেছে, তাদের কাছে এটি ছিল টানা দুই মাসের এক অবিরাম জরুরি অবস্থা, যার কোনো বিরতি ছিল না। দীর্ঘ তাপপ্রবাহের ৪০ দিন পার হওয়ার পর সরকার অবশেষে তাদের বহু প্রতীক্ষিত তাপপ্রবাহ কর্মপরিকল্পনা চালু করে।
সমালোচকদের মতে, প্রতিটি সংকটেই সরকার এটিকে প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগে পরিণত করেছে। ক্যামেরার সামনে কর্মকর্তাদের মুখ মুছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর রাজধানীতে চালু করা হয়েছে তথাকথিত ‘কুলিং পয়েন্ট’, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে।
কোভিড টিকার সার্টিফিকেটে যেমন প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছিল, তেমনি এই নতুন উদ্যোগও রাষ্ট্রীয় সহায়তার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নোটবন্দী, সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা বাতিল বা কোভিড লকডাউনের মতো অতীতের অভিজ্ঞতা ভারতীয় নাগরিকদের মনে একধরনের উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে। তা হলো, এ পরিস্থিতিতে আমরা একা।
এ বাস্তবতায় গভীর কোনো জলবায়ু সংকটের দার্শনিক বিশ্লেষণ আপাতত অনুপস্থিত। সেটি হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য থেকে যাবে। এখন মানুষ কেবল এই দগ্ধ বাস্তবতার সঙ্গে একাই লড়ছে।
আরও একবার প্রশ্ন উঠছে, যে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বাস করেন না, তিনি কি সত্যিই চরম আবহাওয়ার এই সংকটে জনগণের পাশে থাকতে পারেন?
বিদ্যা কৃষ্ণন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার–বিষয়ক অধিকারকর্মী।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।