খলিসাকুড়ি নদীর দৈর্ঘ্য ২৩ কিলোমিটার। যার সাড়ে ছয় কিলোমিটার লিজ দিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন
খলিসাকুড়ি নদীর দৈর্ঘ্য ২৩ কিলোমিটার। যার  সাড়ে ছয় কিলোমিটার লিজ দিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন

মতামত

খলিসাকুড়ি নদী লিজ হলো কীভাবে

খলিসাকুড়ি হলো ধরলা নদীর আন্তশাখা নদী। অর্থাৎ ধরলা থেকে উৎপন্ন হয়ে ফের ধরলায় মিলিত হয়েছে। উৎপন্ন হয়েছে কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলায় বাংটুর ঘাটের পাশে। মিলিত হয়েছে সদর উপজেলার মোগবাসায় সাতকুড়ার পাড়ে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ কিলেমিটার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নদীর তালিকায় ৫–সংখ্যক নদী এটি।

স্থানভেদে নদীটির অনেক নাম। নয়া নদী, হাজির নদী, দয়ারকুড়া, খলিসাকুড়ি, ষাণের ঘাট, সন্ন্যাসীর ডারা, শিয়ালডুবি, গর্ভের দোলা, দই খাওয়া, অর্জুনের ডারা ইত্যাদি।

খলিসাকুড়ি নদী সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এ নদীর অনেক নাম হওয়ার কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। নামগুলো যে সবটাই একটি নদীর তা নিশ্চিত হতে নদীর পাড়ে পাড়ে ঘুরতে হয়েছে। অবশেষে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে এ নদীর উৎসস্থল থেকে পতিতস্থল পর্যন্ত।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় কাঁঠালবাড়ি নামক স্থানে নদীটি খলিসাকুড়ি নাম পরিচিত। কুড়িগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের কাঁঠালবাড়ি ডিগ্রি কলেজের পাশে একটি সেতু আছে। সেতুর ওপর থেকে উত্তরে তাকালে দেখা যাবে নদীর দুই তীর থেকে ভরাট করে মাঝবরাবর সামান্য একটি ছোট জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে। ওই অংশে আড়াআড়ি বাঁশের ঘন গাঁথুনিতে বেড়া দেওয়া আছে।

খলিসাকুড়ি নদীর সঙ্গে ধরলার পুরোনো প্রবাহপথ ফেরানো প্রয়োজন। নদীটির প্রবাহ বাধাহীন করতে হবে। নদীকে নদীর শ্রেণিতে ফেরাতে হবে। নদীর ভেতরে থাকা স্থাপনা তুলে দিতে হবে।

নদীর ওপরে আড়াআড়ি ভরাট অংশ ভেঙে দেওয়ার জন্য কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে অতীতে দাবি করা হয়েছিল। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন এ কাজ করেনি। গত ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলাম খলিসাকুড়ি নদীতে। দেখলাম প্রায় তিন শ মিটারের ব্যবধানে দুটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। যে স্থানে বাঁধ দেওয়া সেখানে গিয়ে কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে নদীটি নিয়ে কথা বলি। তাঁরা বললেন, ‘মজাপুকুর’ দেখিয়ে ওই অংশ সরকারের কাছে লিজ দেওয়া হয়েছে। কারা লিজ দিয়েছে—এ কথার উত্তরে ইউনিয়ন পরিষদের কথা জানালেন। বাস্তবে ইউনিয়ন পরিষদের লিজ দিতে পারার কথা নয়।

নদীর অংশ ‘মজাপুকুর’ নাম দিয়ে তো লিজ দেওয়া বেআইনি। এ কথা বলার সময় একজন বয়স্ক লোক যেতে যেতে বললেন, ‘এ দেশের আইন, টাকা দিলে সোগ ঠিক।’ এতে বোঝা গেল নদী দখলে তারা টাকা ব্যয় করেছে। এই টাকা হয়তো সরকারের দায়িত্বশীল কেউ গ্রহণ করেছে। নদীর ভেতরে ‘মজাপুকুর’ হিসেবে লিজ নেওয়ার কথা জীবনে প্রথমবারের মতো শুনলাম।

কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে ‘মজাপুকুর’ নামে ওই অংশটুকু। ফলে কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। তাঁরা নিশ্চিত করেন যে গত বছরের আগে পর্যন্ত কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ ‘মজাপুকুর’ নামে লিজ দিত। এ কাজ এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না সেটি তাঁরা জানেন না।

বিস্তারিত খবর নিতে গিয়ে আরও ভয়ংকর খবর জানতে পারি। খলিসাকুড়ি নদীর কেবল ওই অংশটুকু নয়, বরং ৬৩ দশমিক ৭৬ একর ( প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার) লিজ দেওয়া হয়। কাঁঠালবাড়ির ‘মজাপুকুর’ নামের অংশটুকু দুবার লিজ হয়। একবার ওই ৬৩ দশমিক ৭৬ একরের মধ্যে, আরেকবার ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে। লিজকৃত অংশের মধ্যে ‘মজাপুকুর’ অংশটুকু পড়লেও ইউনিয়ন পরিষদ জোরপূর্বক আরেকবার লিজ দিত। কেউ কেউ বললেন, এই লিজ ছিল কার্যত মুখে মুখে।

খলিসাকুড়ি নদীটি অনেক গভীর ছিল। প্রবল স্রোত হতো। স্থানীয়রা সাহস করে নদীতে নামতে পারত না। অনেকে মনে করত নদীটিতে ভৌতিক কিছু আছে। নদীটি কীভাবে মারা গেল এই আলাপ হলো নদীসংলগ্ন মাদ্রাসা পাড়ায় এসকেন আলী ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, ধরলা নদীর যে স্থান থেকে এ নদীটি এসেছে সেই স্থানে উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কয়েক বছর পাম্প করে ধরলা থেকে পানি তুলে এ নদীতে দেওয়া হতো। কয়েক বছর পর পাম্প করে নদীতে পানি দেওয়া বন্ধ হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নাকি এই কাজ করেছে। এভাবে নদীটির চরম সর্বনাশ করা হয়েছে। এসকেন আলী ব্যাপারীর কাছে আরও জানতে পারি, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই নদী খনন করতে এসেছিলেন। তিনি যে কোদাল দিয়ে মাটি কেটেছেন সেই কোদালের হাতল-লাঠি ভেঙে গিয়েছিল।

ওই এলাকার একজন সার্ভেয়ার রানা। তাঁর সঙ্গেও কথা হয়। সার্ভেয়ার রানার কাছে জানতে পারি খলিসাকুড়ি নদীর জমি সরকারি। ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে কোনো প্রবাহ থাকলেও সেই প্রবাহ কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। বরং কোনো প্রবাহ যদি ব্যক্তিগত হয় তাহলে সেই প্রবাহ দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে সরকারীকরণ করতে হয়। সরকারের রেকর্ডকৃত জায়গায় কীভাবে পুকুর, জলমহাল নাম দিয়ে লিজ হলো তা কারও জানা নেই।

কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়ক থেকে সহজে দেখা যায় এমন একটি স্থানে নদীর ওপর এই নির্যাতন কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির চোখেই পড়েনি—এটাই অবাক করার মতো বিষয়। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা, উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা, ইউএনও, ডিসি কারও চোখে পড়েনি, এটাই বা কীভাবে সম্ভব? খলিসাকুড়ি অবৈধভাবে দখল হচ্ছে, নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া হচ্ছে, পানির প্রবাহ বন্ধ করা হচ্ছে—এগুলো যাঁদের দেখভাল করার দায়িত্ব তাঁদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। নদীগুলোকে রক্ষা করার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কাজও তথৈবচ।

কাঁঠালবাড়ি থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ভাটিতে নদীটিতে রাজারহাট-কুড়িগ্রাম সড়কের পাশে ঘর তোলা হয়েছিল। সেটিও জনসমক্ষে। কয়েক বছর আগে রিভারাইন পিপল থেকে লিখিত আবেদন করার পর সেই ঘরটি ভেঙে দিয়েছিল কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। এখনো সেটি সমূলে উৎপাটন করা হয়নি। আবারও একদিন ওই ভেঙে ফেলা অবশিষ্ট অংশে হয়তো ঘর তোলা হবে। শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ার পরও অপরাধীকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।

খলিসাকুড়ি নদী কয়েকটি নদীর পানি বহন করে। এগুলোর মধ্যে চন্ডিমারী, ভাস্কর ও নাগদহ উল্লেখযোগ্য। খলিসাকুড়ি নদীর একটি শাখানদী আছে, যা বামনী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

খলিসাকুড়ি নদীর সঙ্গে ধরলার পুরোনো প্রবাহপথ ফেরানো প্রয়োজন। নদীটির প্রবাহ বাধাহীন করতে হবে। নদীকে নদীর শ্রেণিতে ফেরতে হবে। নদীর ভেতরে থাকা স্থাপনা তুলে দিতে হবে। আর যদি বয়স্ক ব্যক্তির ওই কথা ঠিক হয়, ‘বাংলাদেশের আইন, টাকা দিলে সোগ ঠিক’ তাহলে নদীর মুক্তি সম্ভব নয়।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক