ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য (ভিসি) হয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তাঁর আরও বড় পরিচয় হলো তিনি এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক ও সাদা শিক্ষক দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ছিলেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে একজন রাজনীতিবিদ শিক্ষকই কি উপযুক্ত ব্যক্তি?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভিসির দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান প্রায় দেড় বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করে সম্প্রতি বিদায় নিয়েছেন। বিদায়ী বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি বলেছেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আমার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, কোনো সময়ে আমার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে আমাকে জানান।’
উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকালে কোনো ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দেননি বলে উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ।
কিন্তু বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাঁর বিরুদ্ধে ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছে।
অভিযোগগুলো কতটুকু সত্য, তা নিয়ে বিভিন্ন সময় তর্কবিতর্ক হয়েছে। তবে অধ্যাপক নিয়াজ জামায়াতে ইসলামীর কোনো পদবিতে ছিলেন না কিংবা সাধারণ সদস্য ছিলেন বলেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখনো বারবার বলেছিলেন, তাঁর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তাই যখন বিতর্ক হয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ বা সন্দেহের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম কি কখনো জোর গলায় কিংবা দুর্বল গলায়ও বলতে পারবেন যে তাঁর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই? তিনি কতটুকু নিরপেক্ষ থাকবেন বা থাকতে পারবেন, সেটা দেখার অপেক্ষা না করেও বলা যায়, তাঁর কাজের নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন উঠবে।
‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ বলে একটা কথা আছে—এই দ্বন্দ্ব থাকলে যেকোনো ভালো সিদ্ধান্তকেই উদ্দেশ্যমূলক ও পক্ষপাতিত্বমূলক দেখাতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত বিএনপি সরকার নিজেদের দল থেকে আটজন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগ করে সাধারণ জনগণের মনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় রাজনীতি ছড়ানোর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলল।
বিএনপি নিজেদের দল থেকে সব ভিসি নিয়োগ করে দেশের শিক্ষাঙ্গনে একটা ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ তৈরি করেছে। এই মডেল আমাদের শিক্ষাঙ্গনে আমরা আগেও দেখেছি—বিএনপি আগেও যখন ক্ষমতায় ছিল, এই মডেল অনুশীলন করেছে, আওয়ামী লীগও তাদের ক্ষমতার সময় তা–ই করেছে।
ফলে এই দেশের শিক্ষাঙ্গন সব সময় দলীয়ভাবে পরিচালিত হয়েছে। যারা যখন ক্ষমতায় ছিল, তাদের ছাত্রসংগঠন দাপট দেখিয়েছে, অন্যরা মার খেয়েছে। এবার নির্বাচনের পর জনগণ ধরে নিয়েছিল, নতুন সময়ের নতুন সরকার এই মডেল থেকে বেরিয়ে আসবে।
সেই একই মডেলে অন্য রকম ফলাফল আশা করার কোনো কারণ নেই।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক রাজনৈতিক বিবেচনায় যে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা অস্বীকার করেননি। তিনি উল্টো প্রশ্ন তুলেছেন, একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাঁদের ডিসকোয়ালিফিকেশন? তিনি মনে করেন, এটা ডিসকোয়ালিফিকেশন নয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক ভিসির বিষয়ে চেক করেছি, সাইটেশন, কোটেশন, গুগল সার্চ, পিএইচডি, পোস্টডক, এমফিল—সব দেখে ক্যাটাগরি করে যাঁরা ভালো পারফরম্যান্স করেছেন, তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
শুধু উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়, এ পর্যন্ত বিএনপির সব নিয়োগেই একদলীয় অগ্রাধিকার বা একক অধিকার লক্ষ করা যায়। নতুন মেয়র নিয়োগ, ২০ বছর আগের পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ এবং আগেকার বিএনপি আমলের আমলাদের পুনর্নিয়োগ সবই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আগের শাসন সময়ের পরিচিত পথ। কিন্তু এসব পদ্ধতি দলগুলোর জন্য আগে কোনো সুফল বয়ে আনেনি; এখনো যে আনবে না, তা আগেভাগে বলে দেওয়া যায়।
প্রশ্ন করা যেতে পারে, বিএনপি সদস্যের বাইরে খুঁজলে বা চেক করলে কি এর চেয়ে আরও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করা যেত না? তাঁর যুক্তিতেও যথেষ্ট গলদ রয়েছে। রাজনীতি করা অবশ্যই অপরাধ নয়। কিন্তু একজন রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যে ভিসি করা যুক্তিসংগত নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
১৯৬৯ সালের আন্দোলনের পর, তৎকালীন সরকারকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মতো একজন নির্দলীয় লোককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত করতে হয়েছিল, যাতে ছাত্রদের আস্থা ফিরে আসে। শিক্ষাঙ্গনের সেই আস্থা আমরা স্বাধীনতার পর আর কখনো পুরোপুরি ফিরে পাইনি।
শিক্ষামন্ত্রী যে বলেছেন প্রত্যেক ভিসির ব্যাপারে চেক করা হয়েছে, সেই যুক্তিতেও যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। আপনি যদি দলীয় কোটা নির্ধারণ করে তারপর ছোট একটা ‘পুল’ তৈরি করেন, তাহলে আপনি সেই সংকীর্ণ পুলের মধ্য থেকে চেক করেই একজনকে নির্বাচিত করবেন। আর আপনি যদি কোটামুক্ত সব উপযুক্ত প্রার্থীকে একটা পুল করে তারপর যাচাই–বাছাই করে নির্বাচিত করেন, তবে আপনি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রার্থীকেই নির্বাচিত করবেন। এই দুই পদ্ধতির যাচাই–বাছাইয়ের পার্থক্য বিপুল।
মুক্ত পদ্ধতিতে একজন নির্দলীয় উপাচার্য নির্বাচন ছাত্রদের ও দেশের সুধী সমাজের অনেক দিনের লালিত ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারত। এই দেশে এই আকাঙ্ক্ষা কি অধরাই রয়ে যাবে?
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের নেতারা যত দিন ক্ষমতার বাইরে থাকেন, তত দিন সুশীল সমাবেশে এসে ভালো ভালো কথা বলেন। ক্ষমতায় গেলে তাঁদের আর সুশীল সমাবেশে পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও তাঁরা সুর পাল্টিয়ে ফেলেন—‘যে যায় লঙ্কায়, সে–ই হয় রাবণ’।
বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায় শুধু দলীয় সদস্যদের পদায়ন নানাভাবে হিতে বিপরীত হতে পারে। একটা দল যখন সরকার গঠন করে, তারা তখন সারা দেশের জনগণের সরকার। দেশে একজন মাত্র প্রধানমন্ত্রী। দেশের আপামর জনতা সবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সবার প্রতি তাঁর দায়িত্ব সমান। তাঁর সরকার যদি বলে বা কার্যকর করে যে বিএনপির লোকদের ডিগ্রি, শিক্ষা, যোগ্যতা চেক করে তারপর সব পদে শুধু তাঁদেরই নিয়োগ করা হবে, তাহলে অন্যরা চাকরি চাইবেন কার কাছে? ছোট চাকরি, বড় চাকরি—সব জায়গায় এই একই প্রশ্ন দেখা দেবে।
শেখ হাসিনার সময়ও এই প্রশ্ন নিয়েই শুরু হয় কোটা আন্দোলন। তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। বাকিটা ইতিহাস। বিএনপি যদি প্রথম থেকেই দেশের সব সুযোগ-সুবিধা সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত না রাখে, তারাও তাহলে জনগণের আস্থা হারাবে।
শুধু উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়, এ পর্যন্ত বিএনপির সব নিয়োগেই একদলীয় অগ্রাধিকার বা একক অধিকার লক্ষ করা যায়। নতুন মেয়র নিয়োগ, ২০ বছর আগের পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ এবং আগেকার বিএনপি আমলের আমলাদের পুনর্নিয়োগ সবই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আগের শাসন সময়ের পরিচিত পথ। কিন্তু এসব পদ্ধতি দলগুলোর জন্য আগে কোনো সুফল বয়ে আনেনি; এখনো যে আনবে না, তা আগেভাগে বলে দেওয়া যায়।
নিউটনের প্রথম সূত্র, যাকে বলা হয় ‘ইনারশিয়া’ বা জড়তার সূত্র, তাতে বলা হয়েছে, কোনো বস্তু গতিশীল থাকলে তা একই গতিতে একই দিকে গতিশীল থাকে, যতক্ষণ না তার ওপর একটা অসম বল প্রয়োগ করা হয়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও একই দিকে একই পথে বারবার হাঁটছে। আর আমরা অনেকবার দেখেছি, তাদের এই জড়তার সুযোগে বাহ্যিক শক্তি বারবার সুযোগ পেয়েছে নানাভাবে বল প্রয়োগ করতে।
আমাদের রাজনীতিবিদেরা কেন যে এই জড়তা ছাড়তে পারছেন না, কেন একই ভুল পথ বারবার অনুসরণ করছেন, তার উত্তরও নিউটনের সূত্র খুঁজলেই পাওয়া যাবে। এবার আমরা আশা করব, রাজনীতিবিদেরা তাঁদের পথ ও গতির পরিবর্তন নিজেরাই করবেন।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব