ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক

মতামত

ট্রাম্পের টেক-মাগা জোট কেন ভেতর থেকে ভেঙে যাচ্ছে

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলন এবং সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি ধনকুবেরদের মধ্যে যে জোট তৈরি হয়েছে, সেটিকে সাম্প্রতিক রাজনীতির সবচেয়ে অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক এক সম্পর্ক বলা যেতে পারে।

এই জোটের একদিকে আছে অতীতমুখী জনতুষ্টিবাদ, অন্যদিকে আছে এমন এক প্রযুক্তিনির্ভর শক্তি, যারা বিশ্বাস করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসময় বিপুলসংখ্যক মানুষকে বেকার বানিয়ে দেবে।

ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফিরে আসার পেছনে এই প্রযুক্তি গোষ্ঠীর অর্থ ও প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। তার বিনিময়ে ট্রাম্পও তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু সমস্যা হলো, এ দুই পক্ষ শুধু আলাদা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে না, তারা যেন সম্পূর্ণ আলাদা মানসিক জগতে বাস করে।

মাগা আন্দোলনের মূল কথা হলো পুরোনো আমেরিকাকে ফিরিয়ে আনা। এ হলো সেই আমেরিকা, যেখানে শিল্পকারখানার কাজ ছিল, সমাজের কাঠামো স্থিতিশীল ছিল, পরিবার ও লিঙ্গভূমিকা নির্দিষ্ট ছিল, আর মানুষের জীবন ছিল পরিচিত ও স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা।

অন্যদিকে সিলিকন ভ্যালির চিন্তাধারা ঠিক উল্টো। তাদের কাছে পরিবর্তনই প্রধান চালিকা শক্তি। তারা মনে করে, নতুন প্রযুক্তি আসবে, পুরোনো সবকিছু ভেঙে দেবে, আর সেটাই সভ্যতার অগ্রগতি।

এই পার্থক্য সাধারণ মানুষকে দেখার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। কারখানার শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী এবং দেশের ভেতরের শিল্পকারখানাবিহীন অঞ্চলের যেসব মানুষকে উপকূলীয় শহরের অভিজাতরা উপেক্ষা করে এসেছে, মাগা সেসব ‘ভুলে যাওয়া’ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে আসছে। কিন্তু প্রযুক্তি ধনকুবেরদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি কঠোর। তারা আগাম এমন একটি সমাজ কল্পনা করছে, যেখানে উন্নত প্রযুক্তি লাখ লাখ মানুষের কাজ কেড়ে নেবে। ফলে সম্পদ ও ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হবে বড় কোম্পানি ও পুঁজিপতিদের হাতে। অনেকেই এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘সান ফ্রান্সিসকো ঐকমত্য’ বলে থাকেন।

এই ধারণায় সাধারণ কর্মজীবী মানুষ ভবিষ্যতের কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়, বরং অতীতের এক অবশিষ্ট অংশ—যাদের সামান্য ভাতা দিয়ে শান্ত রাখা হবে, আর প্রযুক্তির অগ্রগতি চলতেই থাকবে।

এত বড় দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও এই জোট এত দিন টিকে ছিল। কারণ, একধরনের ব্যক্তিপূজার মাধ্যমে এটি ঢেকে রাখা হয়েছিল।

প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীরা নিজেদের প্রতিভাবান হিসেবে তুলে ধরেন, আর ট্রাম্প এমন এক ভঙ্গি নেন, যেখানে তিনি একদিকে নিজের উচ্চ বুদ্ধিমত্তার কথা বলেন, অন্যদিকে ‘কম শিক্ষিত’ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথাও জোর দিয়ে তুলে ধরেন। এতে এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হয়। একদিকে দাতাদের খুশি করার মতো মেধাভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা, অন্যদিকে ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো জনতুষ্টিবাদী ভাষ্য। ফলে একই জোটে পাশাপাশি চলেছে দুটি বিপরীত গল্প। একটি ভোটারদের জন্য, আরেকটি অর্থদাতাদের জন্য।

কিন্তু এই ভারসাম্য এখন ভেঙে পড়ছে। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ব্যর্থতার পর তাঁর রাজনৈতিক শক্তি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। এর ফলে একই সঙ্গে দুই রকম প্রতিশ্রুতি ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে গেছে। আগে যে কৌশলে এই দ্বন্দ্ব আড়াল করা যেত, এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। জোটের ভেতরের টানাপোড়েন এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে।

সব মিলিয়ে এখন স্পষ্ট—এই প্রযুক্তিনির্ভর জনতাবাদী জোট নিজের ভেতরেই ভাঙনের বীজ বহন করছে। বিদ্যুৎ ও শক্তির প্রশ্নে দ্বন্দ্ব দ্রুত বাড়ছে। আর এই দ্বন্দ্বই একসময় জোটকে ভেঙে দেবে। কারণ, বিদ্যুতের মিটার কোনো প্রতিশ্রুতি বা স্লোগান দেখে না। এটি শুধু হিসাব রাখে, কে আসলে বিদ্যুৎ পাচ্ছে, আর কে তার মূল্য দিচ্ছে।

ট্রাম্প একসময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমেরিকানদের বিদ্যুতের বিল অর্ধেক করে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো চিত্র। মাগা–সমর্থিত বহু অঞ্চলেই বিদ্যুতের দাম দ্রুত বাড়ছে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার খরচ ১০ গুণের বেশি বেড়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় কারণ হলো ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালাতে এসব ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়। এগুলো প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। হিসাব বলছে, যেখানে এসব কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, সেখানে একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ বিল ২০২৮ সালের মধ্যে গড়ে প্রায় ৭০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ভার্জিনিয়া, ওহাইও, জর্জিয়া ও অ্যারিজোনার মতো অঙ্গরাজ্যে গ্রামীণ ও শহরতলির মানুষ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও ট্রান্সমিশন লাইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ—এই অবকাঠামো মূলত ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে, যার সুবিধা অন্যত্র যাচ্ছে, অথচ খরচ চাপছে স্থানীয় মানুষের ওপর। এমনকি কিছু রাজ্যে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকেরা ভাবছেন, কীভাবে এমন নীতি নেওয়া যায়, যাতে সাধারণ মানুষকে এই বাড়তি খরচ থেকে আলাদা রাখা যায়।

সবচেয়ে বড় তামাশার ব্যাপার হলো—এই প্রতিবাদগুলো উঠছে ট্রাম্পের নিজের সমর্থকদের মধ্য থেকেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রতিরোধ ২০২৬ সালেই দেখা যেতে পারে তাঁর জোটের ভেতর থেকে। কারণ, বাস্তব জীবনের সমস্যার মুখে মানুষ স্লোগান নয়, সমাধান চায়। যেমন পেনসিলভানিয়ার শীতে একটি গ্রামীণ বাড়ি গরম রাখার বিষয়টি এমন একটি বাস্তব সমস্যা, যা কোনো ব্যক্তিপূজা দিয়ে মেটানো যায় না।

এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ–ব্যবস্থার ভেতরের বৈষম্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ গ্রিড, যা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, যেখানে দামের ওঠানামা হয় এবং যেখানে পরিষেবা সব সময় স্থিতিশীল থাকে না। অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে আরেকটি প্রায় ব্যক্তিগত বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা, যা কিনা ডেটা সেন্টারের পাশে গড়ে উঠছে, যা নিজস্ব উৎপাদন ও সরবরাহে সক্ষম এবং অনেকটাই সরকারি নিয়মের বাইরে।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক ও গ্যাসভিত্তিক চুক্তি করেছে। তারা বন্ধ হয়ে যাওয়া রিঅ্যাক্টর আবার চালু করছে। এমনকি তারা নিজেদের জন্য আলাদা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করছে। এটি সরাসরি তাদের ডেটা সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত।

এ ব্যবস্থাকে সহজ করতে ফেডারেল নিয়ন্ত্রকেরাও নিয়ম বদলেছেন। এখন ডেটা সেন্টারগুলো মাঝখানের সাধারণ ট্রান্সমিশন–ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে একদিকে ডেটা সেন্টারগুলো পাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে একই ব্যবস্থায় দামের ওঠানামা ও অনিশ্চয়তা সামলাতে হচ্ছে। এককথায়, এখানে বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা নাগরিকদের টাকায় চলে, কিন্তু তার পূর্ণ সুবিধা তারা পায় না।

মানুষ ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে—প্রযুক্তি দুনিয়ার এ ধারণা এখন আর কোনো কল্পনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত কৌশল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্রগুলো এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যাতে মানুষের কাজ ধীরে ধীরে সেগুলো নিজের মধ্যে টেনে নিতে পারে। আর গৃহস্থালির যে অদৃশ্য শ্রম মানুষ করে, তা হিসেবের মধ্যেই ধরা হচ্ছে না।

অবশ্য ইতিহাস বলছে, অবকাঠামো সব সময়ই সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে না। কোথায় বিদ্যুৎ লাইন যাবে, কারা কত দামে পরিষেবা পাবে—এসব নির্ভর করে সমাজের শ্রেণি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটছে, তা আরও এক ধাপ এগিয়ে।

এখানে যেন সমান্তরাল একটি বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। একটি সাধারণ মানুষের জন্য, আরেকটি শক্তিশালীদের জন্য। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের জন্য আলাদা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে, আর সাধারণ গ্রিডের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে খরচ ও অনিশ্চয়তা। এ অবস্থাকে অনেকটা ‘বিদ্যুৎ বিভাজন’ বলা যেতে পারে।

এই বিভাজনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সেই মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা শিল্পহীন হয়ে পড়া অঞ্চলে বাস করে। তারা সেই মানুষ, যাদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে মাগা আন্দোলন। তারাই ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল। অথচ এখন তারাই এমন এক ব্যবস্থার খরচ বহন করছে, যা ভবিষ্যতে তাদেরই অপ্রয়োজনীয় করে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে এখন স্পষ্ট—এই প্রযুক্তিনির্ভর জনতুষ্টিবাদী জোট নিজের ভেতরেই ভাঙনের বীজ বহন করছে। বিদ্যুৎ ও শক্তির প্রশ্নে দ্বন্দ্ব দ্রুত বাড়ছে। আর এই দ্বন্দ্বই একসময় জোটকে ভেঙে দেবে। কারণ, বিদ্যুতের মিটার কোনো প্রতিশ্রুতি বা স্লোগান দেখে না। এটি শুধু হিসাব রাখে, কে আসলে বিদ্যুৎ পাচ্ছে, আর কে তার মূল্য দিচ্ছে।

স্টিফেন হোমস নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং বার্লিনের আমেরিকান একাডেমির রিচার্ড হলব্রুক ফেলো।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ