
১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে অস্থায়ী কাঠামোগত সমঝোতা ঘোষণা করা হয়েছে, তা কেবল স্থবির হয়ে থাকা পারমাণবিক আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা নয়। এটিকে ২০১৫ সালের চুক্তিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও বলা যেতে পারে।
এটি আসলে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক এক বিস্তৃত রূপরেখা। এর লক্ষ্য যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে সমগ্র অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করা। এর গুরুত্ব শুধু এর বিষয়বস্তুর মধ্যে নয়, বরং সময়ের মধ্যেও নিহিত।
লেবাননকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘাত ও উত্তেজনার পর এই কাঠামো প্রকাশিত হওয়ায় স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরে গিয়ে ইরান, লেবানন, গাজা, ইসরায়েল ও সম্ভাব্যভাবে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ—এসব আন্তসংযুক্ত সংকট নিয়ন্ত্রণকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও বিনিয়োগব্যবস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আবারর যুক্ত করার প্রস্তাবও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। অর্থাৎ এটি শুধু পারমাণবিক চুক্তি নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতা নতুনভাবে সাজানোর এক প্রচেষ্টা।
এই কাঠামো অনুযায়ী সব ধরনের সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে লেবাননের যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশ থেকে সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করবে এবং দেশটির ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এর বিনিময়ে ইরান প্রথম ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
এরপর এই চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাবে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং দেশটির ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করবে।
পারমাণবিক ইস্যুটি ইচ্ছাকৃতভাবে আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রথম ৬০ দিনের আলোচনায় এর সমাধানের চেষ্টা হবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে তা বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি এই কাঠামোতে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলিয়ে ইরানের পুনর্গঠন কর্মসূচির কথাও ভাবা হয়েছে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সীমিত দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া হিসেবে ধরা কঠিন। বরং এটি একই সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক আঞ্চলিক ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, যাতে এই চুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট না হয়। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রস্তাব এবং উপত্যকাটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চলছে। আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে গাজার পুনর্গঠন উদ্যোগও সামনে এসেছে।
বর্তমান জোট সরকার ক্ষমতায় থাকলে আঞ্চলিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং চুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম ডানপন্থী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ বাড়াতে পারে, যদিও ইরানের প্রতি নীতি পুরোপুরি বদলাবে না, তবে মতপার্থক্যগুলোকে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে মূলত সামরিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে। তবে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরে একটি নতুন রাজনৈতিক পর্বের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যা এই চুক্তির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ইরানের তেল রপ্তানি আবার শুরু করা, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইরানকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ২০১৫ সালের মতো পারমাণবিক ইস্যুর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতা এবং তার কারণে সব পক্ষের ওপর যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি সামাল দেওয়া।
ইরান বলেছিল, যদি লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোঝাপড়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে ইসরায়েল এই শর্ত মানতে রাজি হয়নি। তারা মনে করে, তাদের সামরিক অভিযান কোনো আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ায় যাতে লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করা হয়, কারণ অতিরিক্ত উত্তেজনা আলোচনাকে ব্যর্থ করতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন। এখন ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সরাসরি এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।
এমনকি লেবানন এখন এই চুক্তির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। আগের আলোচনায় ইসরায়েলকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হতো, কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। এই পরিবর্তন কেবল লেবাননেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনাকে নতুনভাবে সংযুক্ত করছে।
ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের চাপের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া নিউইয়র্ক ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের দিকে আন্তর্জাতিক অগ্রগতিকে প্রতিফলিত করে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে ইসরায়েলের ওপর, যাকে এখন সবচেয়ে জটিল ভেরিয়েবল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান ইসরায়েলি সরকার এই কাঠামোকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পথ হিসেবে দেখে না। বরং তাদের মতে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ও আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক—এই মৌলিক নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো সমাধান করে না।
এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও তেল আবিবের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার পথে যেতে চায়, এমনকি যদি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো ভবিষ্যতের আলোচনায় রেখে দিতে হয়। কিন্তু ইসরায়েল এমন কোনো পন্থায় আস্থা রাখে না, যা চূড়ান্ত নিরাপত্তা সমস্যাগুলোকে স্থগিত রাখে।
এই পার্থক্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত। সেখানে আসন্ন নির্বাচন এবং সরকারের প্রতি জনসমর্থন হ্রাসের প্রবণতা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যদিও ইসরায়েলি জনগণ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিরাপত্তা নীতির পক্ষে রয়ে গেছে, তবু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
বর্তমান জোট সরকার ক্ষমতায় থাকলে আঞ্চলিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং চুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম ডানপন্থী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ বাড়াতে পারে, যদিও ইরানের প্রতি নীতি পুরোপুরি বদলাবে না, তবে মতপার্থক্যগুলোকে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এই কাঠামোগত সমঝোতা নিঃসন্দেহে নতুন এক কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা বাস্তব ও কার্যকর ব্যবস্থায় এটিকে রূপ দিতে পারে তার ওপর।
এই প্রচেষ্টা শুধু ইরানকেন্দ্রিক হতে পারে না। এর সঙ্গে লেবানন, পশ্চিম তীর ও গাজা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমন্বয়ের ভবিষ্যৎও যুক্ত থাকতে হবে, তবেই একটি টেকসই আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি সম্ভব হবে, যা গোটা অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
সানিয়া ফয়সাল এল-হুসাইনি ফিলিস্তিনের আরব-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক গবেষক ও লেখক
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত