প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ইসলামে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সম্মান

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে আল্লাহ–তাআলা এই সমস্যার বিনিময়ে তাঁর সন্তুষ্টি, দয়া, ক্ষমা ও জান্নাত দান করতে চান। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমি যার
প্রিয় চোখ নিয়ে নিই, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং নেকির আশা করে; আমি এর বিনিময়ে তাকে জান্নাত দিয়েই সন্তুষ্ট হই।’ (তিরমিজি: ১৯৫৯ ও ২৪০১, বায়হাকি: ৫৩৬৭)

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করণীয় হলো—ভাগ্যের ওপর ধৈর্য ধারণ করা এবং সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের ওপর কোনো বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগৎ সৃষ্টির আগেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা যা হারাও, তাতে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তাতে উল্লসিত না হও। আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা-৫৭ হাদিদ, আয়াত: ২২-২৩)

বিশ্বাস রাখতে হবে—আল্লাহ যখন কোনো মুমিনকে পরীক্ষায় ফেলেন, তখন তিনি তাকে ভালোবাসেন এবং অন্যদের তুলনায় তাকে অগ্রাধিকার দেন। তাই তিনি নবীদের সবচেয়ে বেশি বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছেন।

মনে রাখতে হবে—দয়ালু আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিকে তার প্রতিটি কষ্টের বিনিময় দেন, যদিও সেই কষ্ট নগণ্য হয়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘মুসলিম ব্যক্তিকে কষ্ট, ক্লান্তি, দুঃখ, চিন্তা, আঘাত বা দুশ্চিন্তা গ্রাস করলে—এমনকি তার শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ–তাআলা এর মাধ্যমে তার পাপের কাফফারা করে দেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)

মুমিন ব্যক্তি যেন তার নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধিতাকে ভুলে গিয়ে শরীরের বাকি অঙ্গগুলোকে কাজে লাগায়। কারণ, কোনো এক অঙ্গের অচলতা জীবনের শেষ নয়। দেখা গেছে, যার কোনো একটি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ অচল, তার বাকি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গগুলো আরও বেশি সক্রিয় ও সচল হয়ে ওঠে।

প্রিয় নবী (সা.) একাধিকবার তাঁর অনুপস্থিতিতে মদিনার মসজিদে নববিতে ইমামতির দায়িত্ব প্রতিবন্ধী সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ওপর অর্পণ করে তাঁদের সমাজে সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করার নজির স্থাপন করেন। তাঁকে আজান দেওয়ার কাজেও নিযুক্ত করেছিলেন এবং তিনি অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও ইমামতি করেছেন।

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা তোমাদের শরীর ও আকার-আকৃতির দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তরের দিকে তাকান।’ (মুসলিম)

প্রিয় নবী (সা.) একাধিকবার তাঁর অনুপস্থিতিতে মদিনার মসজিদে নববিতে ইমামতির দায়িত্ব প্রতিবন্ধী সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ওপর অর্পণ করে তাঁদের সমাজে সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করার নজির স্থাপন করেন। তাঁকে আজান দেওয়ার কাজেও নিযুক্ত করেছিলেন এবং তিনি অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও ইমামতি করেছেন। তিনি যখনই তাঁকে দেখতেন, তখনই বলতেন, ‘স্বাগত জানাই তাকে, যার সম্পর্কে আমার প্রতিপালক আমাকে সতর্ক করেছেন।’

 (বুখারি ও মুসলিম; মুসনাদে আহমাদ: ১৩০০০)

ইসলামের বিধানে প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে সহজতা। যে একেবারে অক্ষম—যেমন পাগল ও জ্ঞানশূন্য ব্যক্তি—তার ওপর ইসলামের কোনো বিধান প্রযোজ্য নয়। আর আংশিক প্রতিবন্ধী, যে কিছুটা করতে সক্ষম, তার প্রতি ততটুকুই পালনের আদেশ দেওয়া হয়। পবিত্র কোরআনের বাণী, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না।’ (সুরা–২ বাকারা: আয়াত ২৮৬)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—ঘুমন্ত ব্যক্তি (যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়); নাবালেগ (যতক্ষণ না সে বালেগ হয়) এবং পাগল (যতক্ষণ না সে জ্ঞান ফিরে পায় বা সুস্থ হয়)।’ (ইবনে মাজাহ: ২০৪১; আবু দাউদ: ৪৩৯৮; তিরমিজি: ১৪২৩; সহিহ আলবানি)

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবন্ধী সাহাবি আমর ইবন জামুহ (রা.)-কে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের সরদার হলো ফরসা ও কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট আমর ইবনে জামুহ।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া: ৭/৩১৭)

পঙ্গু আমর ইবনে জামুহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি আল্লাহর পথে জিহাদ করে শহীদ হই, তাহলে জান্নাতে কি আমি সুস্থ ও স্বাভাবিক পায়ে হাঁটতে পারব?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ উহুদের যুদ্ধে আমর (রা.), তাঁর এক ভাতিজা এবং তাঁদের একজন দাস শহীদ হন। ওই সাহাবি লাশের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি যেন তোমাকে জান্নাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক পায়ে হাঁটতে দেখছি।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৫৫৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি মুমিনদের পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে একটি দেহের মতো দেখতে পাবে। যখন দেহের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জেগে থাকে এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়।’ (বুখারি: ৬০১১)

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

    সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

    smusmangonee@gmail.com