এ দেশে একটা কথা বেশ চালু—জনতার আদালত। রাজনীতিবিদদের কাছে এই বচনটি বেশ পছন্দ। খুবই মুখরোচক। মঞ্চে উঠলে আর মাইক্রোফোন হাতে পেলেই তাঁরা জনতার আদালতে দাবি পেশ করেন। এখানে জনতা হলো মঞ্চের সামনে বসে থাকা বা দাঁড়ানো মানুষেরা। তাদের সংখ্যা কখনো দশ-পনেরোজন, কখনোবা লাখের বেশি। তারা কেউ স্বেচ্ছায় আসে, কাউকে কাউকে নানান উপায়ে নিয়ে আসা হয়।
জনসভায় লোক বেশি হলে নেতা ও তাঁর দলের ইজ্জত বাড়ে। লোক কম হলে মুখ দেখানো যায় না। লোক বাড়ানোর জন্য নেওয়া হয় প্রকল্প। নিয়োগ করা হয় দালাল। দালালেরা অনেকেই ওই দলের স্থানীয় পর্যায়ের পাতিনেতা। আবার কেউ কেউ পেশাদার লোক সরবরাহকারী। এ জন্য থাকে বড় অঙ্কের বাজেট। অর্থায়ন হয় দলের কিংবা কোনো নেতার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। এই তহবিল তৈরি হয় চাঁদার টাকায়। এর কোনো লিখিত হিসাব থাকে না। তাই অডিটে ধরা পড়ে না।
ধরা যাক, এক পাতিনেতার দায়িত্ব হলো এক হাজার লোক নিয়ে আসার। পাতিনেতা অনেক সময় সেটা আউটসোর্সিং করেন। মানে আরও দশজনকে দায়িত্ব দেন লোক আনার। এখানে পাতিনেতার ভূমিকা হলো পাইকারের। তারপর শুরু হয় অ্যাকশন। দলে দলে লোক আসতে থাকে ময়দানে। কেউ আসে ট্রাকে, কেউ বাসে। এ উপলক্ষে অনেক ট্রাক-বাস ভাড়া করা হয়। অনেক বাহন রীতিমতো জোর করে নিয়ে আসা হয়। সরকারি দলের সভা হলে তার পাতিনেতার আবদার উপেক্ষা করার হিম্মত খুব কম পরিবহনমালিকের আছে।
এই যে কষ্ট করে লোকজন এল, তাদের তো এক দিনের কামাই নষ্ট হলো। সেটি নগদ টাকা দিয়ে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। এটা অনেকটা সরকারি চাকুরেদের টিএ-ডিএর মতো। অনেক সময় তারা এই বিশেষ ভাতা আগাম পেয়ে যায়। আবার অনেক সময় এর বিলিবণ্টন হয় ময়দানেই। ভাতা ঠিকঠাকমতো না পেলে হইচই হয়। ভাগের হিস্যা নিয়ে হাতাহাতি-মারামারিও হয়। কখনোসখনো কোনো বেরসিক সাংবাদিক কোনো এক গ্রহীতাকে জিজ্ঞেস করে বসেন, কার মিটিংয়ে এসেছেন? বেচারি জানেও না কার সভা, কে বক্তা। কাউকে সে চেনে না। চেনে ওই ঠিকাদারকে, যে তাদের নিয়ে এসেছে। টাকা পেয়েছে, তাই সে এসেছে। কিছুদিন আগে এক সাংবাদিকের জেরার মুখে এক নারীর কণ্ঠে শোনা গেল, সে নাকি ‘পিপিনুল’-এর জনসভায় এসেছে। আমার ধারণা, পিপিনুল একসময় ‘জজ মিয়া’র মতোই জনপ্রিয় হবে এবং আমাদের শব্দভান্ডারে ঢুকে যাবে।
এই শহরে খোলা চত্বর কিংবা সবুজ নেই বললেই চলে। যা-ও ছিল, উন্নয়ন আর নগরায়ণের ধাক্কায় সব গেছে উবে। আশির দশকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ দিকে একটা খোলা চত্বর ছিল। স্টেডিয়ামের টিকিটঘরের ছাদমঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পল্টন ময়দানে জনসভা করার জো ছিল না। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়তেন বায়তুল মোকাররম চত্বরে। মাইক্রোফোনে জনসভার বিজ্ঞপ্তি শোনা যেত—আগামী ...ই এপ্রিল রোজ বুধবার বৈকাল চার ঘটিকায় পবিত্র বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অমুক দলের এক ঐতিহাসিক জনসভা অনুষ্ঠিত হইবে। এ দেশে সব জনসভাই ঐতিহাসিক।
ছোট দলগুলোর নানান সমস্যা। টাকাপয়সা নেই। নেই বিশাল কর্মী বাহিনী। দলের মধ্যে নেই মনকাড়া বক্তা। জনসভায় লোকজন আসে কম। মনে আছে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি মোজাফফর আহমদ একবার পরিহাস করে বলেছিলেন—বায়তুল মোকাররম চত্বরে তো বিকেলে বাদাম খেতেই কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়। এটা দেখিয়ে বলা হয়, জনসভায় অনেক লোক হয়েছে। একবার তিনি এমনও বলেছিলেন—মাঠে বক্তা পনেরো জন, পুলিশ ত্রিশ জন আর শ্রোতা দশ জন। কথাটা একেবারে ফেলনা নয়। এখনো আমরা দেখি পত্রিকা এ রকম জনসভার ছবি ছাপে। ছবিতে দেখা যায়, বক্তারা লাইন ধরে বসে আছেন। ছবিতে দর্শক-শ্রোতাদের দেখানো হয় না।
পত্রিকারও তো দয়ামায়া আছে! অবশ্য ছবি তোলার ব্যাপারেও মতলব থাকে। বেশি লোকসমাগম দেখাতে খুব কাছে থেকে ছবি তোলা হয়। মনে হয়, ময়দানে তিল ধারণের জায়গা নেই। আবার দূর থেকে বা উঁচু কোনো ভবন থেকে ছবি তুললে দেখা যায়, মাঠের অনেকটাই ফাঁকা। তখন এ ছবি নিয়ে শুরু হয় ফিসফাস।
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত অসুবিধা মেনে নিতে হয়। এর নামই তো দেশপ্রেম! কোনো এক ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটা বড় দলের জনসভা হলো শহরের মাঝখানে। সারা শহরে ট্রাফিক জ্যাম। কেউ একজন ক্ষোভ প্রকাশ করতেই তার দিকে তেড়ে আসেন এক পাতিনেতা—ব্যাটার কত বড় সাহস! স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলা!
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। লেখাটা শুরু করেছিলাম জনতার আদালত নিয়ে। জনগণের রায়ই চূড়ান্ত—এ কথা আমরা অনেকেই জোর গলায় বলি। জনগণ ভোটের মাধ্যমে একধরনের রায় দেয়। ভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায় অনেকের পছন্দ নয়। তা ছাড়া পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার তর সয় না অনেকের। তাঁরা রাজনীতিটা নিয়ে আসেন রাস্তায় কিংবা ময়দানে। সেখানে তাঁরা জড়ো করেন হাজার হাজার লোক। কীভাবে জড়ো করেন, তার একটা আভাস ইতিমধ্যে দিয়েছি। তো নেতা মঞ্চে উঠে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। সামনে যত বেশি শ্রোতা, ততই তাঁর আনন্দ। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি জনতাকে আহ্বান জানান—আপনারা কি এই সরকারের পদত্যাগ চান?
জনতা চেঁচিয়ে বলে—চাই। নেতার গলার স্বর সপ্তমে চড়ে—তাহলে হাত তুলে দেখান। জনতা হাত তোলে। উঁহু, এক হাত নয়, দুই হাত তুলে দেখান। জনতা দুই হাত তোলে। নেতা তখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেন—এই তো আমি জনতার রায় পেয়ে গেছি; এই সরকারের আর এক দিনও ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। জনতার হাত নড়াচড়া করে অনেকটা ‘কন্ডিশন রিফ্লেক্স’-এর মতো। আশপাশের সবাই হাত তুললে সে-ও হাত তোলে। পরদিন খবরের কাগজে ছাপা হয়—লক্ষ কণ্ঠে গগনবিদারী স্লোগান!
দেশে একটা সংবিধান আছে। যদিও সবাই সেটা মানেন না। তারপরও নির্বাচন হয়। সংসদ বসে। সংসদ হলো আলোচনার জায়গা। তো আমাদের অনেকেই সংসদকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে যথাযথ ফোরাম মনে করেন না। তাঁরা অনেকেই সংখ্যায় কম। সিদ্ধান্ত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছায়। এটা তো সব সময় মেনে নেওয়া যায় না। তাই আওয়াজ ওঠে—ফয়সালা হবে রাজপথে। রাজনীতিটা সংসদ থেকে রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার এই কৌশল আগে-পরে সবাই এস্তেমাল করেছেন। ভবিষ্যতেও হয়তো করবেন। কেননা গণদেবতা তো সংসদে নেই। তিনি আছেন রাজপথে। সেখানেই হাজারখানেক লোক আদালত বসিয়ে রায় দিয়ে দেবে—এ সরকারকে যেতে হবে।
মাঠে-ময়দানে কিংবা রাস্তার জনতাকে সুপ্রিম কমান্ডার মেনে যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের কথায় জনতা খুব খুশি হয়। জনতা মনে করে, এই নেতা তাদের অনেক দাম দিচ্ছেন, মর্যাদা দিচ্ছেন। নেতার কথায় রাস্তার জনতা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। তারা অনেক সময় চড়াও হয় প্রতিপক্ষের ওপর। তারা সড়কের পাশে লাগানো গাছ উপড়ে ফেলে, নিয়ন সাইন ভাঙে, আশপাশের দোকান লুট করে। জনতার এই যে কাজকারবার, নেতারা এর নাম দিয়েছেন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। তাঁরা মারামারি দেখেন না, ভাঙচুর দেখেন না। তাঁরা দেখেন আন্দোলন।
নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই। রাস্তায় সব মীমাংসা করে ফেলতে হবে। চলো চলো শাহবাগে চলো। শাহবাগের মোড়ে এক ঘণ্টা বসে থাকলে পুরো শহর অচল করে দেওয়া যায়। মানুষ জ্যামে আটকা পড়ে। তারা স্কুলে বা অফিসে যেতে পারে না। রোগী হাসপাতালে না যেতে পেরে পথেই মারা যায়। তাতে কী? জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত অসুবিধা মেনে নিতে হয়। এর নামই তো দেশপ্রেম! কোনো এক ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটা বড় দলের জনসভা হলো শহরের মাঝখানে। সারা শহরে ট্রাফিক জ্যাম। কেউ একজন ক্ষোভ প্রকাশ করতেই তার দিকে তেড়ে আসেন এক পাতিনেতা—ব্যাটার কত বড় সাহস! স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলা!
বেশ কিছুদিন ধরে দেশে আরেকটা উৎপাত লক্ষ করা গেছে। এর নাম হয়েছে মব। একদল লোক জড়ো হয়ে যা খুশি করতে পারে। কিছু বলা যাবে না। এক পলিটিক্যাল পীর ফতোয়া দিয়ে বসলেন—যারা এটাকে মব বলে তাচ্ছিল্য করছে, তারা স্বৈরাচারের দোসর। কারও গায়ে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ লাগিয়ে দিলে তো তার বিরুদ্ধে যা খুশি করা যায়!
‘রাজপথ ছাড়ি নাই’—এই পরম পবিত্র স্লোগানে আমরা বুঁদ হয়ে আছি।
● মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব