রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। আগুন নেভাতে পানি দিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ২১ জুলাই।
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। আগুন নেভাতে পানি দিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ২১ জুলাই।

মতামত

ঢাকার রানওয়ে প্রশিক্ষণ বিমান ওড়ানোর জন্য কতটা নিরাপদ

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম আকাশপথ। প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী বিমান, কার্গো, ভিআইপি ও সামরিক-বেসামরিক বিমান, হেলিকপ্টার ওঠানামা করছে এই একমাত্র আন্তর্জাতিক হাব থেকে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সলো ফ্লাইট প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত বা নিরাপদ নয়, কারণ এখানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিমানবন্দরটি একটি নিয়ন্ত্রিত ক্লাস সি–ডি এয়ারস্পেসের মধ্যে পড়ে, যেখানে প্রতিটি ফ্লাইটকে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে প্রতি পদক্ষেপে যোগাযোগ রাখতে হয়।

একজন নতুন প্রশিক্ষণার্থী পাইলট, বিশেষ করে একা থাকার সময়, এ ধরনের জটিল রেডিও যোগাযোগ ও সেই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে মানসিকভাবে চাপে পড়ে, ককপিট ওয়ার্কলোড বা ককপিটে কাজের চাপ বেড়ে যায়, যা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করে। 

এ ছাড়া এই বিমানবন্দরে বোয়িং ৭৭৭ বা এয়ারবাস এ-৩৩০-এর মতো বড় বিমানগুলো ওঠানামা করে, যেগুলোর পেছনে তৈরি হওয়া ওয়েক টারবুলেন্স বা আকাশ ঝাঁকুনি ছোট প্রশিক্ষণ বিমানের জন্য মারাত্মক বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।

আবার কোনো কারণে এই যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হলে মাঝ আকাশে সংঘর্ষও হতে পারে। এর ওপর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এর আশপাশের এলাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ, ফলে কোনো ইমার্জেন্সি বা বিশেষ পরিস্থিতিতে জরুরি অবতরণের উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

সবশেষে এই বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত কোনো আলাদা সময়সূচি বা নির্দিষ্ট ট্রেনিং এলাকা নেই, যা অনেক দেশের প্রশিক্ষণবান্ধব বিমানবন্দরগুলোতে থাকে। এসব কারণেই এই বিমানবন্দর ছাত্র পাইলটদের একক ফ্লাইট অনুশীলনের জন্য উপযুক্ত নয়। বিকল্প হিসেবে লালমনিরহাট, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, যশোরের মতো তুলনামূলকভাবে কম ব্যস্ত ও নিরাপদ বিমানবন্দরগুলো প্রশিক্ষণের জন্য বেশি কার্যকর ও নিরাপদ বলে বিবেচিত।

যেদিন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম এফ-৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে সলো ফ্লাইটে (একা বিমান নিয়ে)  উড়েছিলেন, সেদিনের আবহাওয়া ছিল একেবারে অনুকূলে—উড়ানের জন্য যথাযথ। তৌকির নিঃসন্দেহে একজন মেধাবী, দক্ষ ও চৌকস বৈমানিক।

আশির দশকে যখন ঢাকা রানওয়ে তৈরি হয়, তা শহর থেকে দূরে নিয়ম মেনেই তৈরি হয়েছিল। রানওয়ে শহরে ঢোকেনি। আমরা আমাদের শহর বানিয়ে রানওয়ে গিলে খেয়েছি। এখন যদি আরও নতুন রানওয়ে বানাই, লাভ হবে কী?

তাঁকে সলো ফ্লাইটের অনুমতি প্রদানকারী প্রশিক্ষকও নিঃসন্দেহে একজন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ পাইলট। একজন শিক্ষার্থী পাইলটকে ১০০-তে ১০০ বিবেচনা করেই প্রশিক্ষক তাঁর ছাত্র পাইলটকে একা বিমান চালাতে পাঠান। প্রতিটা পদক্ষেপে কোথায় কেমন জরুরি পরিস্থিতি হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সেই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়গুলো বাস্তবিকভাবেই হাতে–কলমে আকাশে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব শেষ হওয়ার পরই একজন প্রশিক্ষণার্থী পাইলটকে একক ফ্লাইট বা একা বিমান উড়াতে দেওয়া হয়।

একজন বিমানচালক হিসেবে আমার প্রথম প্রশ্ন, ঢাকা রানওয়ের আশপাশে কোথাও কি এই অনুশীলনগুলো করা হয়েছে? ফাঁকা জায়গাটা কোথায়?

ঢাকা টাওয়ার যখন প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের একক ফ্লাইটের অনুমতি দিল, তখন কি টাওয়ার জানত না, সেই সময় রেগুলার শিডিউল ফ্লাইটের অবতরণ আছে এবং নিয়মিত ট্রাফিক চলাচল বিঘ্নিত হতে পারে এ ধরনের ফ্লাইটের অনুমতি দিলে?

রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিআইডি। অন্যদিকে বিধস্ত বিমানের বিভন্ন অংশ সংগ্রহ করেন বিমান বাহিনীর সদস্যরা। ২২ জুলাই

আমরা জানতে পারছি, ক্যাপ্টেন তৌকির একবার ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি চেয়েছিলেন। টাওয়ার তাঁকে হোল্ড করতে বলেছিল। রেগুলার ট্রাফিক বা নির্ধারিত ফ্লাইট নামার পর রানওয়ে ফাঁকা হওয়ার পর টাওয়ার প্রশিক্ষণ বিমানকে ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি দেবে। আর এই সময় ক্যাপ্টেন তৌকির টাওয়ারকে জানিয়েছিল, তার বিমানটি কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা অর্জন করতে পারছে না। সে সময় প্রশিক্ষক তাকে প্যারাস্যুট ইজেক্ট করতে বলেন। যুদ্ধবিমানে প্যারাস্যুট থাকে। যেকোনো জরুরি অবস্থায় প্যারাস্যুট ইজেক্ট করলে, পাইলট ককপিট থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়তে পারেন।

ঘটনার বর্ণনায় আমরা দেখি, ক্যাপ্টেন তৌকিরকে গ্রাউন্ড থেকে ইজেক্ট কমান্ড করার সঙ্গে সঙ্গে ইজেক্ট করলেও বিমানটি নিচু উচ্চতায় থাকার কারণে ঠিকমতো প্যারাস্যুট খুলে নামতে পারেননি। আবার একই সঙ্গে যে বিমান থেকে বেরিয়ে এলেন, সেই বিমানটিও মাটিতে স্কুলের ওপর আঘাত হানে। প্লেনটি তিনি প্রায় রানওয়ের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। আমরা যদি রানওয়ে ৩২-এর সম্প্রসারণ চিন্তা করি, তাহলে মাত্র ১.৯ নটিক্যাল মাইল দূরে প্রায় সেন্টার লাইন বরাবর দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিমানটি স্কুলের যে জায়গায় আঘাত করেছে, সেখান থেকে রানওয়ে ১৪-এর দূরত্ব মাত্র ১.৯ নটিক্যাল মাইল। একজন বিমানচালক হিসেবে আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই অল্প দূরত্বে এই রকম একটা অবকাঠামো তৈরির অনুমতি কোথা থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ পেল?

আশির দশকে যখন ঢাকা রানওয়ে তৈরি হয়, তা শহর থেকে দূরে নিয়ম মেনেই তৈরি হয়েছিল। রানওয়ে শহরে ঢোকেনি। আমরা আমাদের শহর বানিয়ে রানওয়ে গিলে খেয়েছি। এখন যদি আরও নতুন রানওয়ে বানাই, লাভ হবে কী? আজকে একটা নতুন রানওয়ে বানালে, ২০-৩০ বছরের মধ্যে আবার রানওয়ে ঘিরে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হবে না তার নিশ্চয়তা কী? তখন অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, আবার নতুন করে তদন্ত হবে। আমরা কি এভাবেই চলতে থাকব? 

ইথার ফারিয়েল হামিদ বাণিজ্যিক পাইলট

etheremon@gmail.com