নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলিতে ভয়াবহ বন্যার পর কাদামাটিতে ঢেকে যাওয়া বাড়িঘর ও সম্পত্তির একটি ড্রোন দৃশ্য।
নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলিতে ভয়াবহ বন্যার পর কাদামাটিতে ঢেকে যাওয়া বাড়িঘর ও সম্পত্তির একটি ড্রোন দৃশ্য।

মতামত

নেপাল ট্র্যাজেডি: পর্যটনকেন্দ্র নিয়েই যত আলোচনা, গ্রামগুলোর কী অবস্থা

পাহাড়ি নদীব্যবস্থার সব অবকাঠামো চূড়ান্তভাবে ভন্ডুল করে ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন (তিব্বত) সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তার সঙ্গে আগের কোনো ঢলের তুলনা সম্ভব নয়। মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানি প্রায় ৩০ ফুট বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল অকল্পনীয়। অকল্পনীয় ছিল এর গতি।

একটি হিমবাহ বা বরফ-শিলাধস থেকে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও ধ্বংসস্তূপের যে স্রোত সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে তর্কবিতর্ক করার অনেক সুযোগ পাবেন। থিসিসে ভরে উঠবে গবেষকদের পাঠাগার। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ নেপালিদের খবর কত দূর পৌঁছাবে, সেটা বলা কঠিন।

এখন পর্যন্ত আলাপ-বিলাপে ভাগ্যহত বিদেশি পর্যটকদের নিয়েই বেশি আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নেপালের স্থানীয় অধিবাসীরা সবাই বেঁচেবর্তে আছেন, অথবা তাঁদের প্রাণের দাম অন্যদের চেয়ে কম।

নেপাল সরকারের ২৭ আগস্টের তথ্যেই বলা হয়েছিল, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষ ও পর্যটক—উভয়েই নিখোঁজ আছেন। এরপর ২৮ আগস্ট নেপাল সরকারের হালনাগাদ তথ্যে ৫৩৮টি মৃতদেহ উদ্ধারের কথা বলা হয় এবং বলা হয়, স্থানীয় ও পর্যটক—দুই পক্ষেরই বহু মানুষ তখনো নিখোঁজ।

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে স্থানীয় গ্রামগুলোর পুরো বসতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে শুধু গ্রামবাসী নন; জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক, পর্যটনকর্মী, গাইড ও নিরাপত্তাকর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত ও নিখোঁজ হয়েছেন।

নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের উদ্ধারের অধিকার নিয়ে নেপালে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়েছিল অনেক দেশ। নেপাল প্রথমে তা চায়নি, কিন্তু চাপের কাছে বেশিক্ষণ দম ধরে রাখতে পারেনি দেশটি। তবে এখন পর্যন্ত সব বিদেশি উদ্ধারকারী বাহিনীকে ঢালাওভাবে অবাধ প্রবেশের অনুমতি দেয়নি নেপাল। সীমিত ও বিশেষায়িত বিদেশি সহায়তা অনুমোদন করেছে। তাদেরই স্বাগত জানানো হবে, যারা—

১. টানেলে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে জানে;

২. ডিএনএ পরীক্ষা ও মৃতদেহ শনাক্তকরণের কাজে অভিজ্ঞ;

৩. ফরেনসিক পরীক্ষায় দক্ষ;

৪. বিশেষ ধরনের উদ্ধারকাজে অভিজ্ঞ।

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলিতে আকস্মিক বন্যার পর এক ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন

ইতিমধ্যেই ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ দল কাজে নেমে গেছে।

নেপাল জানত, বিদেশি দলগুলো কাজে নামলে সবার জন্য সমান ব্যবস্থা ও কাঠামো আর কার্যকর থাকবে না। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নেপালি হলে বৈষম্যের শিকার হবেন। উদ্ধারকাজ শ্লথ হবে। মাঠপর্যায়ে ন্যায্য সমন্বয় কঠিনতর হয়ে উঠবে। গত ভূমিকম্পে নেপাল সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।

নেপাল এলাকায় এখন পর্যন্ত (৩০ আগস্ট) মৃতদেহ মিলেছে ৭৩৪ জনের। এর মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুর বিভাজন এখনো দেখানো হয়নি। নিখোঁজের তালিকাও বেশ লম্বা—২ হাজার ৪৯৮ জন। আর চীন (তিব্বত) অংশে মৃতদেহ পাওয়া গেছে ১৬ জনের; সেখানে নিখোঁজের তালিকায় আছেন ৫৪৬ জন।

ইউনিসেফের (জাতিসংঘের শিশু তহবিল) প্রধান মুখপাত্র নেপালের এই ট্র্যাজেডি সম্পর্কে এককথায় বলেছেন, ‘দুঃখজনক, তবু বলছি, আমরা সবে ট্র্যাজেডির শুরুটা দেখছি।’ সব ট্র্যাজেডিই এমন হয়।

শেষ পর্যন্ত দেখার ধৈর্য থাকে না। কিন্তু দুঃখ-কষ্টের ভার যত দিন যায়, ততই বাড়তে থাকে। সংবাদমাধ্যমও তার আগ্রহ হারায়। সংবাদমাধ্যম থেকে একবার খবর পেছনে চলে গেলে তার আর কোনো হদিস থাকে কি?

নয়টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে এখনো আটকে আছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। সুড়ঙ্গগুলোয় আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নেপালের সেনাবাহিনী।

নেপাল থেকে একজন কর্মী ঘটনার প্রথম দিনই জানিয়েছিলেন, এ দুর্যোগে শুধু পর্যটক ও পর্যটনকর্মীরা প্রাণ হারাননি, ব্যাপক হারে স্থানীয় মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন, ভেসে গেছেন চিরতরে। অনেক গ্রামের চিহ্ন পর্যন্ত নেই।

মনে রাখা প্রয়োজন, নেপালের আট থেকে দশটি জেলা–এলাকা প্রায় ধুয়েমুছে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাসুয়া, রাসুয়া-ত্রিশূলী করিডর, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, চিতওয়ান, সিন্ধুপালচোক, তানাহুন, নাওয়ালপরাসি পূর্ব ও নাওয়ালপরাসি পশ্চিম। সর্বশেষ জনশুমারি (২০২১) অনুযায়ী এসব এলাকার জনসংখ্যা ছিল কমপক্ষে ২৮ থেকে ২৯ লাখ। একেক জেলায় গড় জনসংখ্যা হবে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭ লাখ।

নেপালের ত্রাণকর্মী সুরেশ পোখরার মতে, এসব অঞ্চলের গড়ে চার ভাগের এক ভাগ মানুষের—মানে কমপক্ষে সাত লাখ—কোনো হদিস নেই। এর মধ্যে অনেকেই হয়তো বেঁচে আছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত নিখোঁজ।

রাসুয়া-ত্রিশূলী করিডরে নদীতীরবর্তী এলাকায় ছিল শ্রমিক ক্যাম্প। জলাধার আর জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করতেন তাঁরা। এই শ্রমিক ক্যাম্প বা কলোনির কোনো চিহ্ন এখন আর নেই। নয়টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে এখনো আটকে আছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। সুড়ঙ্গগুলোয় আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নেপালের সেনাবাহিনী।

নেপালি পত্রিকার সূত্রে জানা যাচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপ এতটাই বেশি জমে গেছে যে থার্মাল ড্রোন দিয়েও কিছু শনাক্ত করা যাচ্ছে না। চার দিন চলে গেলেও সুনির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না, কোন সুড়ঙ্গের ভেতরে কতজন আটকে রয়েছেন।

আগে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আনুমানিক ৯০০ শ্রমিক আটকে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগকেই এখনো উদ্ধার করা যায়নি। যত সময় যাচ্ছে, তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই নিভে যাচ্ছে। গত রোববার বিকেল পর্যন্ত নেপালের বিপর্যস্ত এলাকাগুলো থেকে মাত্র ৭৮১ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে।

মূল সমস্যা হলো, বিদেশি পর্যটকদের জাতীয়তা অনুযায়ী নিখোঁজের তালিকা সহজে প্রকাশিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম তাদের নাগরিকদের নিয়ে আলাদা খবর করছে।

কিন্তু স্থানীয় নেপালি মানুষদের ক্ষেত্রে অনেক এলাকায় পরিবার, পুরো গ্রাম ও কর্মস্থল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত হিসাব তৈরি করা অনেক কঠিন। সংবাদে পর্যটকদের কথা বেশি শোনা গেলেও এ দুর্যোগের সবচেয়ে বড় মানবিক বোঝা বহন করছেন স্থানীয় নেপালি জনগণ।

নেপালের আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর

মৃতদেহ শনাক্ত, সংরক্ষণ ও সৎকারের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে

যতই দিন যাচ্ছে, মরদেহ চেনার পথ ততই সংকুচিত হচ্ছে। পচেগলে যাওয়া মরদেহের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। নেপালের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের তরাই এলাকার জেলা চিতওয়ানের নারায়ণী–গণ্ডকী ও পূর্ব রাপ্তি নদী দিয়ে ভেসে আসা ২৩৩টি (২৯ আগস্ট) মরদেহের মধ্যে মাত্র ৪টির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে।

বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান ও নদীতীর থেকে সংগৃহীত মরদেহ ও দেহাবশেষ পচেগলে গেছে এবং চেনার উপায় নেই। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মরদেহগুলোর আরও পচন রোধ করতে, সেগুলোকে শ্রদ্ধাপূর্ণ, নিরাপদ ও আইনি উপায়ে দাফন বা সৎকার করতে এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে একটি বাধ্যতামূলক বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

চিতওয়ান জেলা নিরাপত্তা কমিটি ‘শনাক্তহীন, বেওয়ারিশ ও দাবিহীন মরদেহ ব্যবস্থাপনা (প্রথম সংশোধনী) নির্দেশিকা, ২০৮৩’-এর ধারা মেনে সব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কিংবা ভূগর্ভস্থ দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি মরদেহের কোড নম্বর অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রেকর্ড রাখা হবে।

এরপর ভারতপুর মহানগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের দেবঘাটের একটি উন্মুক্ত স্থানে এসব মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অথবা দাফন ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করার অনুরোধ করা হয়েছে।

২৬ আগস্টের ভয়াবহ হিমালয়ীয় আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসস্রোতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি বা ঘরবাড়ির ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব অর্থনীতি, জলবিদ্যুৎ, পর্যটন, খাদ্যব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগঝুঁকির ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে দেখা যেতে পারে।

শিশুদের কী হবে

বেঁচে যাওয়া অনেক শিশু তাদের পরিবারকে আর আগের মতো পাবে না। তারা যে ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছে, তা তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে অনেক দিন। দুর্যোগের পানির স্রোত কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু একটি শিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব বহু বছর স্থায়ী হতে পারে।

বিশেষ করে নেপালের পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় দুর্যোগ, দারিদ্র্য, বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরিবার হারানোর ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে একটি শিশুর জীবনপথ স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে।

শিশুদের জন্য সবচেয়ে জরুরি ১০টি পদক্ষেপ

১. পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা;

২. শিশু নিবন্ধন ও পরিবার পুনর্মিলনের ব্যবস্থা চালু করা;

৩. আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও শিশুবান্ধব স্থান তৈরি করা;

৪. মনঃসামাজিক প্রাথমিক সহায়তা প্রদান করা;

৫. অস্থায়ী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা;

৬. শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করা;

৭. নিরাপদ পানি ও শিশুবান্ধব টয়লেটের ব্যবস্থা করা:

৮. পাচার, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও সহিংসতা প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার করা;

৯. কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রী নিশ্চিত করা;

১০. যত দ্রুত সম্ভব ‘ব্যাক টু লার্নিং’ কর্মসূচি শুরু করা।

আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর কাদামাখা বাড়িঘর। ত্রিশূলী, নুয়াকোট, নেপাল, ২৬ আগস্ট

নতুন করে ভাবতে হবে

এ দুর্যোগ সম্ভবত নেপালের জন্য ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দুর্যোগ নীতির মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ হিমালয়ীয় আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসস্রোতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি বা ঘরবাড়ির ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব অর্থনীতি, জলবিদ্যুৎ, পর্যটন, খাদ্যব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগঝুঁকির ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে দেখা যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো: হিমালয়ে একটি পাহাড় বা হিমবাহধস কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি নদী উপত্যকার বহু কিলোমিটার এলাকায় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আর শুধু জাতীয় বিষয় নয়; এটি সীমান্ত অতিক্রমকারী আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়।

জলবিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। নদীর কাছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পুরোনো ধারণা হয়তো বদলাতে হবে। হিমালয়ের উজানে বড় ভূমিধস বা হ্রদ-প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়া এখন শুধু নেপালের সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক নদীঝুঁকি।

নেপালের এ দুর্যোগ মনে করিয়ে দিয়েছে, নেপাল-চীন-ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত নদীতথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

নেপালের এ দুর্যোগ আন্তর্জাতিক উদ্ধার নীতিতে পরিবর্তন কতটা জরুরি, সে প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে। চলতি দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও শ্রমিক নিখোঁজ হওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।

একটি দেশের দুর্যোগে যখন বহু দেশের নাগরিক আটকে যান, তখন আন্তর্জাতিক উদ্ধার সহযোগিতার অধিকার ও কাঠামো কী হবে?

বহুজাতিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজের প্রটোকল কেমন হবে? কোন ব্যবস্থায় বিদেশি নাগরিকদের দ্রুত তথ্য বিনিময় হবে? ডিএনএ ডেটাবেজ সহযোগিতা কীভাবে কাজ করবে? আন্তর্জাতিক ডিজাস্টার আইডেন্টিফিকেশন টিমের কাঠামো ও কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে?

দূতাবাসভিত্তিক সমন্বয়ের কাজ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও এখন নতুন করে ভাবতে হবে।

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক, গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ

    *মতামত লেখকের নিজস্ব