ভ্লাদিমির পুতিন এবং মোজতবা খামেনি
ভ্লাদিমির পুতিন এবং মোজতবা খামেনি

মতামত

সিআইএ ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: রাশিয়া যেভাবে ‘কলকাঠি’ নাড়ল

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গত বৃহস্পতিবার ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বৈঠকে বসেন। মুখে অফিশিয়ালি বলা হচ্ছিল, এই বৈঠকের প্রধান এজেন্ডা ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ।

তবে রুবিও ও লাভরভের বৈঠকটি এমন এক সময়ে হলো, যার নেপথ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থানগুলোতে ইরানের হামলা নিয়ে প্রকাশ্যে যতটুকু স্বীকার করা হচ্ছে, রাশিয়া আসলে তার চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুর দিকেই প্রথম খবর আসে যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে তেহরান। যুদ্ধ শুরুর তিন দিনের মাথায়, ৩ মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এ–সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ দুটি সূত্রের বরাতে জানায়, রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা একটি সিআইএ স্টেশনে হামলা চালানো হয়েছে। এরপর ৬ মার্চ মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান শনাক্ত করতে তেহরানকে সহায়তা করছে মস্কো।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, সিআইএর অবকাঠামো, বিশেষ করে সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ড্রোন হামলার ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দারা এতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। হামলার নির্ভুল নিশানা ও নিখুঁত কার্যকারিতা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে হয়তো রুশ সহায়তার প্রমাণ রয়েছে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেভস্কি জানান, ইরানের এই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার জড়িত থাকার তথ্যটি বেশ ‘বাস্তবসম্মত’। গ্রাজেভস্কি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টি অনেকটা এমনই সন্দেহ করা হচ্ছিল। কারণ, ইরান আগে যেসব হামলা চালিয়েছে, এবারের হামলাগুলো ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আধুনিক।’

নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘রাশিয়ার মতো ইরানের কাছে মহাকাশভিত্তিক উচ্চ সক্ষমতা নেই। রাশিয়ার তুলনায় সাধারণ নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক মানের স্যাটেলাইটও ইরানের পর্যাপ্ত নেই...তাই মনে হচ্ছে, তারা রাশিয়ানদের সঙ্গেই হয়তো কোনো চুক্তি করেছে।’

তবে নিকোল গ্রাজেভস্কি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজস্ব কিছু হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (সোর্স বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক) রয়েছে ইরানের, যা প্রায়ই অনেকে এড়িয়ে যান।

অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওর স্ক্রিনশট। এতে ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা (বাঁয়ে) এবং পরে সৌদি আরবের রিয়াদে হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা

যুদ্ধ আর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো ও তেহরান তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, দুই দেশের এই সম্পর্ক কোনো স্থায়ী জোট নয়, বরং পশ্চিমের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক সাময়িক সুবিধাভিত্তিক সমঝোতা। তবে এতে দ্বিমত পোষণ করেন গ্রাজেভস্কি।

নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘দুই দেশই নিজেদের বৈশ্বিক রাজনীতিতে একই ধরনের হুমকির মুখে আছে বলে মনে করে। আর ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে তাদের সহযোগিতা সত্যি বেশ জোরালো হয়েছে, যা সম্প্রতি আরও বেড়েছে। তারা এখন একে অপরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তেহরান মস্কোকে শাহেদ ড্রোন ও ফাতেহ-১১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করায় দুটি দেশ সামরিকভাবে আরও কাছাকাছি আসে।

গত বছর দুই পক্ষ ২০ বছর মেয়াদি একটি ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা টানা ১২তম রাতের মতো অব্যাহত ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে ইরাক সীমান্তবর্তী শালামচে ক্রসিংয়ে এক হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়। এর জবাবে গত কয়েক দিনে জর্ডানসহ পারস্য উপসাগরীয় একাধিক দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান।

তবে সেই সময় রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে রুদেনকো স্টেট দুমায় দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, এই চুক্তির অর্থ এই নয় যে ‘ইরানের সঙ্গে কোনো সামরিক জোট বা পারস্পরিক সামরিক সহায়তা গড়ে উঠেছে।’ দ্য মস্কো টাইমস এ তথ্য প্রচার করে।

এ ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘কোমেটা-এম’ অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন সিস্টেম সরবরাহ করে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুল নিশানা বাড়াতে সহায়তা করছে।

গত মার্চ মাসের খবরের বরাতে জানা যায়, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতে ইরানের ব্যর্থ হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে একটি রুশ জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তি পাওয়া গেছে।

যদিও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এই ‘কোমেটা-এম’–সংক্রান্ত রিপোর্টটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া।

তা সত্ত্বেও গ্রাজেভস্কি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ একদিক থেকে মস্কোর জন্যই সুবিধাজনক। কারণ, এটি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয় এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি দুর্বল করার ক্ষমতা রাখে।

গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাশিয়ানরা এটিকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক বৃহত্তর লড়াই হিসেবে দেখছে। আর তারা মনে করে, এই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

‘অবশ্যই তারা চায় না ইরান পুরোপুরি ধসে পড়ুক। তাই তারা সব সময় একটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করে—ইরান একদিকে একাই যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হোক, আবার একই সাথে তাদের ইতিহাসের এই কঠিন সময়ে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট সহায়তাও যেন তারা পায়।’

সাম্প্রতিক হামলা

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা টানা ১২তম রাতের মতো অব্যাহত ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে ইরাক সীমান্তবর্তী শালামচে ক্রসিংয়ে এক হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়। এর জবাবে গত কয়েক দিনে জর্ডানসহ পারস্য উপসাগরীয় একাধিক দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান।

তবে গ্রাজেভস্কির মতে, রাশিয়ার কোনো গোয়েন্দা সহায়তার চেয়ে বরং ইরানের নিজস্ব কৌশল ও সমরাস্ত্রই যুদ্ধের গতিপথে বেশি প্রভাব ফেলছে।

গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘রাশিয়ার সম্পৃক্ততা কিন্তু ইরানিদের জন্য একমাত্র মূল চালিকা শক্তি বা মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিষয় নয়। ইরানের এই সক্ষমতা আগেই ছিল। তারা ইতিমধ্যেই বিশাল ড্রেন ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। যা ঘটেছে তা হলো রাশিয়ার সহায়তা ইরানকে সামান্য বাড়তি সুবিধা দিয়েছে ও শক্তিশালী করেছে।’

  • ইদনা মোহামেদ আল–জাজিরার লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক

আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ