মোবারক হোসেনের দেখা মিলল রামপুরা ব্রিজের কাছে, হাতিরঝিলর ঢোকার মুখে ৩ ফেব্রুয়ারি, বেলা ১১টায়।
মোবারক হোসেনের দেখা মিলল রামপুরা ব্রিজের কাছে, হাতিরঝিলর ঢোকার মুখে ৩ ফেব্রুয়ারি, বেলা ১১টায়।

মতামত

‘এইবার নির্বাচনে হ্যাগরে একটা সুযোগ দিবার চাই’

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে যে কত প্রতিকূলতা উজিয়ে চলতে হয়, তার জাজ্বল্য উদাহরণ মোবারক হোসেন। অঙ্গ হারানোর দুঃখ আছে, আর দশজন সুস্থ মানুষের মতো কাজ করতে না পারার বেদনা আছে; কিন্তু থামলে যে চলে না।

এমন নয় যে অঙ্গহানিতে খিদের অনুভূতি কমে, একটু ভালো পরার খায়েশ কমে, এগিয়ে চলার আকাঙ্ক্ষা কমে; কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা—বলা চলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁদের পিছিয়ে রাখে। এই হাহাকার নিয়ে লড়াই জারি রাখতে হয় মোবারক হোসেনদের।

লড়াইটা দ্বিমুখী—একদিকে টিকে থাকার, অন্যদিকে মনোবল ধরে রাখার।

অবশ্য এ নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা নেই! সড়কে প্রাণ হারানো ব্যক্তির পরিবারই যেখানে প্রায় কিছুই পায় না—না যথাযথ ক্ষতিপূরণ, না সুষ্ঠু বিচার, সেখানে আহত ব্যক্তিদের নিয়ে আলাপ রীতিমতো ‘অরণ্যে রোদন’! মোবারকের অবশ্য এ নিয়ে কোনো আক্ষেপও নেই। কারণ, তিনি চোখের সামনে আজদাহা বাস্তবের রূঢ় ছবিটা দেখতে পান।

২০০৯ সালে ফেনীর ছাগলনাইয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান হাত মারাত্মক জখম হয় মোবারক হোসেনের। পরে সেটি কেটে জোড়া দেওয়া হয়েছে। এতে হাতটি লম্বায় যেমন কমে গেছে, তেমনি কমেছে শক্তি-সক্ষমতা। কোনো রকমে হালকা কিছু ধরে রাখতে পারেন। আর এ হাতেই চিপসের প্যাকেট ধরে রাখেন তিনি। সামনে দিয়ে যাওয়া পথচলা মানুষকে একটি করে কিনতে বলেন। কেউ কেউ শোনেন, অনেকেই শোনেন না।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি—উভয়ই বেড়েছে। বেড়েছে আহত মানুষের সংখ্যাও। গত বছর সড়কে প্রাণ গেছে ৭ হাজার ৩৫৯ জনের। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে, ৪০ শতাংশ। এমনই এক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন মোবারক হোসেন, ১৬ বছর আগে।

মোবারক হোসেনের দেখা মিলল রামপুরা ব্রিজের কাছে, হাতিরঝিলর ঢোকার মুখে ৩ ফেব্রুয়ারি, বেলা ১১টায়। এখানেই তিনি প্রতিদিন নিজের হাতে ভাজা চিপস বিক্রি করেন। অবশ্য আলুর এই চিপসের কাঁচামাল আসে জয়পুরহাট থেকে। মুঠোফোনে ফরমাশ দেন, মুঠোফোনের মাধ্যমেই টাকা পাঠান। কাঁচামাল চলে আসে। এরপর ঘরে নিজেরা ভাজেন, প্যাকেট করেন। এরপর বিক্রির পালা। এতে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা থাকে।

যে দলগুলো এ পর্যন্ত এককভাবে ক্ষমতায় যায়নি, তেমন একটি দলকে এবার ভোট দেওয়ার চিন্তা করছেন। এর কারণ হিসেবে মোবারকের ভাষ্যটা এ রকম—তাদের সুযোগ দিয়ে একবার দেখা যেতে পারে! অন্য দলগুলো তো ক্ষমতায় ছিল। তাদের শাসন আমাদের অজানা নয়। তাঁর জবানিতে, ‘এইবার নির্বাচনে হ্যাগরে একটা সুযোগ দিবার চাই।’

মোবারক হোসেনের পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার বাররা গ্রামে। ১৯৯৬ সালে প্রথম ঢাকা আসেন। সেই থেকে এই মহানগরের বাসিন্দা। থাকেন পশ্চিম রামপুরার উলন এলাকায়। ভোটারও সেখানকার।

যে দলগুলো এ পর্যন্ত এককভাবে ক্ষমতায় যায়নি, তেমন একটি দলকে এবার ভোট দেওয়ার চিন্তা করছেন। এর কারণ হিসেবে মোবারকের ভাষ্যটা এ রকম—তাদের সুযোগ দিয়ে একবার দেখা যেতে পারে! অন্য দলগুলো তো ক্ষমতায় ছিল। তাদের শাসন আমাদের অজানা নয়। তাঁর জবানিতে, ‘এইবার নির্বাচনে হ্যাগরে একটা সুযোগ দিবার চাই।’

আর গণভোট? যে দলটিকে তিনি ভোট দেবেন বলে মনস্থির করেছেন, তারা যেহেতু ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলছে, তাই তিনিও হ্যাঁ-তেই টিক চিহ্ন দেবেন। যদিও গণভোটের পুরো বিষয়টি তাঁর কাছে তত পরিষ্কার নয়। তিনি মোটামুটি এই ধারণা রাখেন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমবে, দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরবে—এ-ই তো অনেক!

মোবারকের বয়স এখন ৩৬। বাবা মারা গেছেন ২০১৩ সালে। সাত বোন, মোবারক একাই ভাই এবং তিনি সবার বড়। সুতরাং তাঁর লড়াই শুরু ছোট থাকতেই। ফাজিল পরীক্ষা পুরো দিতে পারেননি। এ পর্যন্ত পাঁচ বোনের বিয়ে দিয়েছেন। একজন মারা গেছেন। অবিবাহিত বোনটি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। এ বোনকে বিয়ে দিতে পারলে অনেকটা নির্ভার হতে পারবেন, বলছিলেন মোবারক।

চব্বিশের জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো দেখেছেন। এত প্রাণহানি এখনো হৃদয়ে বেদনা জমায়, বুকে মোচড় দেয়! এত রক্তপাতের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা ছিল? এমন প্রশ্নে মোবারক বললেন, ‘কী আর কমু হে কথা! কাম না করলে তো খাওন নাই!’

নিজের দুই সন্তান। মেয়েটি বড়, মিম নাম তার, পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে। ছেলে আবদুল্লাহ মাত্র প্লেতে। মোবারক চান, অন্তত ছেলেমেয়েদের আগামীটা যেন ভালো হয়! দেশটা যেন ভালো চলে।

  • হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক। ই–মেইল: hello.hasanimam@gmail.com