
সোমবার সকালে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে প্রতিদিনের মতো ডেনহাম কোর্টের পাশের পেট্রলপাম্পের কফির দোকানে ঢুকতেই দৃশ্যটা বদলে গেল। কাউন্টারে দাঁড়ানো স্থানীয় এক অস্ট্রেলীয় মুখ তুলেই একগাল হেসে বললেন, ‘অভিনন্দন!’ ক্রিকেটপ্রেমী আরও দু-একজন এগিয়ে এসে কথা জুড়লেন। ভিনদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশির জন্য এর চেয়ে বুক ফুলিয়ে গর্ব করার মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
কাছেই পত্রিকার স্ট্যান্ডে চোখ যেতেই দেখি মূলধারার সংবাদমাধ্যমে রীতিমতো আলোড়ন। সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে এত চর্চা দেখা যায় না। কিন্তু ডারউইনে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়ের পর চোখ ফিরিয়ে রাখার কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড খেলার পাতায় বড় অক্ষরে শিরোনাম করেছে—‘টাইগার টাউন’। ডেইলি টেলিগ্রাফের স্পষ্ট মূল্যায়ন—ডারউইনে ইতিহাস গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।
পত্রিকার পাতা ওলটাতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল ঠিক ২০ বছর আগের স্মৃতি। ২০০৬ সালের এপ্রিলে ফতুল্লা টেস্টে বাংলাদেশ যখন পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তখন এই ডেইলি টেলিগ্রাফই শেষ পাতায় বড় করে লিখেছিল ‘প্যাথেটিক’—অর্থাৎ করুণ; সঙ্গে উপশিরোনামে লেখা ছিল,‘ আবারও বাংলাদেশের কাছে লজ্জায় ডুবল অস্ট্রেলিয়ার চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটাররা’, ‘লজ্জার স্কোরবোর্ড’ ‘ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার মহাবিপর্যয়’—এমন সব কথা।
পত্রিকার ওই পাতাটি একটি গৌরবের অংশ হিসেবে এখনো আমার কাছে আছে। যদিও সেবার শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া কোনোমতে ৩ উইকেটে ম্যাচ বের করে নেয়। সেদিন সিডনির এক পানশালায় (যেখানে স্থানীয় লোকজন খেলা দেখার জন্য ভিড় জমান) বসে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখেছিলাম।
অস্ট্রেলীয় সমর্থকদের বুক ধড়ফড় অবস্থা দেখে দ্রুত কাগজে লিখে প্রথম আলোর ঠিকানায় ফ্যাক্স পাঠিয়েছিলাম। পরদিন তা ছাপা হয়েছিল ‘কাউসার খান, প্রথম আলোর পাঠক’ পরিচয়ে। আর আজ দুই দশক পর সেই সিডনি থেকেই প্রতিনিধির চোখে দেখছি, সময়ের ব্যবধানে শক্তি আর সম্মানের সমীকরণ কীভাবে পুরো বদলে গেছে।
অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যম এটিকে নিছক ‘অঘটন’ বলে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডারউইনের চার দিনের খেলা যাঁরা সরাসরি দেখেছেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন, অস্ট্রেলিয়া জিতলেই বরং তা অঘটন হতো। টসে জিতে ব্যাটিং নিয়েও প্যাট কামিন্সের দল প্রথম ইনিংসে আটকে যায় মাত্র ১৯৮ রানে; প্রথম দিনেই হাসান মাহমুদ তুলে নেন ৬ উইকেট।
ডারউইনের এই মাঠের উত্তাপ সিডনি হয়ে এখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। টেস্টের লাল বলে এই দাপুটে জয় বিশ্ব ক্রিকেটে বার্তা দিয়ে গেল একটাই—বাংলাদেশ এখন আর বিদেশের মাটিতে সাদামাটা কোনো অতিথি দল নয়; চোখে চোখ রেখে যেকোনো পরাশক্তিকে শাসন করার শক্তি নিয়েই মাঠে নামে।
জবাবে তানজিদ হাসানের অভিষেক শতক আর মেহেদী হাসান মিরাজের লড়াকু অর্ধশতকে বাংলাদেশ তোলে ৪২৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের শতক সত্ত্বেও মিরাজের ঘূর্ণিতে (৫/৬৬) অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে। পুরো ম্যাচে হাসান মাহমুদ একাই শিকার করেন ৯ উইকেট। মাত্র ৫৭ রানের সহজ লক্ষ্য বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলে ১ উইকেট হারিয়েই। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া দলটির এমন রাজকীয় প্রত্যাবর্তন সবাইকে বিস্মিত করেছে, তা-ও দলের মূল পেসার নাহিদ রানাকে বিশ্রামে রেখে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়, আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সব মিলিয়ে দ্বিতীয়। দেশটির প্রায় দেড় শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে ঘরের মাঠে এটি অন্যতম বিপর্যয়। খোদ অধিনায়ক কামিন্স ব্যাটিং লাইনআপ পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং তুলেছেন দল ঢেলে সাজানোর দাবি।
ম্যাকাইয়ে পরবর্তী টেস্ট শুরুর আগে চাপে এখন অজিরাই। নাজমুল হোসেন শান্তর এই বাংলাদেশ এখন আর শুধু স্পিননির্ভর কোনো দল নয়; বিদেশের ঘাসের উইকেটেও গতি আর আগ্রাসনে রাজত্ব করার মতো পরিণত এক দল।
ঐতিহাসিক এই জয়ে সিডনির প্রবাসী কমিউনিটিতে এখন বাঁধভাঙা আনন্দ। ব্যাংকসটাউন থেকে লাকেম্বা—সব আড্ডাতেই কেবল ক্রিকেট। লাকেম্বার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী তারেক রহমান বললেন, ‘সকালে দোকানে আসতেই শ্বেতাঙ্গ কাস্টমাররা নিজে থেকে ম্যাচের প্রসঙ্গ তুলল।
পঁচিশ বছর এ দেশে আছি, ক্রিকেট নিয়ে মাথা উঁচু করার এমন সকাল এর আগে আসেনি।’ ব্যাংকসটাউনের সফটওয়্যার প্রকৌশলী শফিক আহমেদ যোগ করলেন, ‘অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া নিছক একটা জয় নয়; প্রবাসে আমাদের সামাজিক আত্মমর্যাদাকে এটা বহুদূর এগিয়ে দিল।’
ডারউইনের এই মাঠের উত্তাপ সিডনি হয়ে এখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। টেস্টের লাল বলে এই দাপুটে জয় বিশ্ব ক্রিকেটে বার্তা দিয়ে গেল একটাই—বাংলাদেশ এখন আর বিদেশের মাটিতে সাদামাটা কোনো অতিথি দল নয়; চোখে চোখ রেখে যেকোনো পরাশক্তিকে শাসন করার শক্তি নিয়েই মাঠে নামে।
কাউসার খান প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী
ই-মেইল: kawsar.khan.au@gmail.com
মতামত প্রথম আলোর নিজস্ব