
এখন চলছে বর্ষা। পবিত্র কোরআনে বৃষ্টিকে বলা হয়েছে রহমত। অথচ বাংলাদেশে বৃষ্টি মানেই এখন আতঙ্ক, জলাবদ্ধতা, ফসলহানি।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২ হাজার ২০ থেকে ২ হাজার ৩২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল দেশগুলোর একটি আমরা।
বর্ষায় যে পরিমাণ পানি পড়ে, তার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ধরে রাখতে পারলেও দেশের বার্ষিক পানির চাহিদার বড় অংশ মেটানো সম্ভব। অথচ বর্ষা শেষ হতে না হতেই শুনি পানির সংকটের কথা।
এত পানি পেয়েও আমরা পানি ধরে রাখতে পারছি না। এটা প্রকৃতির ব্যর্থতা নয়, এটা পরিকল্পনার ব্যর্থতা।
পানি ব্যবস্থাপনা এখন আর কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি অর্থনীতিরও প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু ও পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শুধু ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যানজটে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ২০২৪ সালের গবেষণা বলছে।
গাছ লাগানোর কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু কোন গাছ, সেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না।
হিজল, বরুণ, কদম, তাল, করচ, বটের মতো দেশীয় প্রজাতির গভীর মূলতন্ত্র মাটিতে পানির পথ তৈরি করে এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। অথচ আমরা রাস্তার পাশে লাগাচ্ছি ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি।
গবেষণা বলছে, একটি ইউক্যালিপটাসগাছ বয়স অনুযায়ী দৈনিক ৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত ভূগর্ভের পানি শুষে নেয়। এই গাছ মাটি শুকিয়ে দেয়, পানি ফেরত দেয় না।
ভারতের রাজস্থানে বছরে মাত্র ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সেখানে দেশীয় গাছ ও ঐতিহ্যবাহী পানি সংরক্ষণের পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৬ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত ওপরে তুলে আনা হয়েছে। আমরা পাচ্ছি তার সাত গুণ বৃষ্টি।
বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে নিষ্কাশনের দুটো পথ আছে। হয় মাটিতে ঢুকবে, নয়তো প্রবাহিত হয়ে চলে যাবে।
ঢাকায় এখন প্রায় সব পানিই প্রবাহিত হয়ে চলে যায়, কারণ মাটির বদলে সর্বত্র কংক্রিট। এই ছুটে যাওয়া পানিই একদিকে জলাবদ্ধতা তৈরি করে, অন্যদিকে ভূগর্ভে রিচার্জ না হওয়ায় পানির স্তর নামিয়ে দেয়।
অর্থাৎ একই সমস্যার দুটি মুখ। বৃষ্টি বেশি হলে রাস্তায় পানি, শুকনো মৌসুমে পানির হাহাকার। সমাধান তাই ড্রেনে নয়, মাটিতে পানি ফেরানোয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে প্রায় ২৩ লাখ ঘনমিটার পানি। ফেরত যাচ্ছে কতটুকু? নগণ্য।
কারণ, মাটি ঢেকে গেছে কংক্রিটে। ২০২৪ সালে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমেছে ৮৬ মিটারে, যেখানে ১৯৯৬ সালে ছিল মাত্র ২৫ মিটারে।
বর্তমানে প্রতিবছর এই স্তর ২ থেকে ৩ মিটার করে নামছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকার উপরিভাগের জলাধার শুষ্ক মৌসুমে সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
ঢাকা ওয়াসার পানির চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আসে ভূগর্ভ থেকে, উপরিভাগের উৎস থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এই অনুপাত উল্টে না দিলে সংকট আরও গভীর হবে।
একটি এক হাজার বর্গফুটের ছাদ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ লিটার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি গৃহস্থালির ব্যবহৃত পানি, রান্নাঘর ও বাথরুমের হালকা দূষিত পানি সামান্য পরিশোধন করে বাগানে সেচ, শৌচাগার বা মেঝে ধোয়ায় পুনরায় ব্যবহার করা যায়। সিঙ্গাপুর এই পদ্ধতিতে দেশের ৪০ শতাংশ পানির চাহিদা মেটাচ্ছে।
সমাধান জটিল নয়। মাটিতে ৩ থেকে ৫ ফুট গর্ত করে বালু ও নুড়ি ভরে দিলে বৃষ্টির পানি সরাসরি ভূগর্ভে যায়। জাপানের টোকিওতে প্রতিটি নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক বৃষ্টির পানির পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
চীন এখন উহান, সাংহাই, হারবিনসহ একাধিক শহরে ‘স্পঞ্জ শহর’ মডেলে নগর তৈরি করছে, যেখানে শহর বৃষ্টির পানি শোষণ, ধরে রাখা এবং পুনরায় ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে।
একটি এক হাজার বর্গফুটের ছাদ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ লিটার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি গৃহস্থালির ব্যবহৃত পানি, রান্নাঘর ও বাথরুমের হালকা দূষিত পানি সামান্য পরিশোধন করে বাগানে সেচ, শৌচাগার বা মেঝে ধোয়ায় পুনরায় ব্যবহার করা যায়।
সিঙ্গাপুর এই পদ্ধতিতে দেশের ৪০ শতাংশ পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। একটি পরিবার এ দুই পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করলে মাসিক পানির খরচ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহৃত পানির পুনর্ব্যবহার এখন আর বিকল্প নয়, বাধ্যতামূলক করার সময় এসেছে।
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে পুনঃখনন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সমন্বয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। অর্থাৎ সমাধান অসম্ভব নয়, সমস্যা মূলত অগ্রাধিকারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে ১ টাকা বিনিয়োগে ৪ থেকে ৭ টাকা সাশ্রয় হয় পানি কেনা ও স্বাস্থ্য খরচ থেকে।
রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকার ৯২ শতাংশ নতুন ভবনে তা নেই।
কারণ, জরিমানা মাত্র ৫০ হাজার টাকা। জার্মানিতে বৃষ্টির পানি না ধরে রাখলে বাড়তি কর দিতে হয়। সেই মডেলে গেলে ভবনমালিক নিজেই ব্যবস্থা নেবেন।
উপকূলীয় বাংলাদেশের মানুষের সামনে একটা নির্মম বাস্তবতা আছে। চারদিকে পানি, তবু খাওয়ার পানি নেই—সমুদ্রের পানি লবণাক্ত, নদীর পানি লবণাক্ত, মাটির নিচেও লবণ।
উপকূলীয় এলাকার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে। গত চার দশকে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং লবণাক্ততার বিস্তার এখন ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ এই ঝুঁকিতে আছে। ইউএনডিপির ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, উপকূলীয় পাঁচটি জেলার ৭৩ শতাংশ পরিবার অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে।
পরিণতি শুধু তৃষ্ণা নয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রসহ একাধিক গবেষণা বলছে, লবণাক্ত পানি পানে উপকূলীয় নারীদের মধ্যে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও অকালপ্রসবের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
লবণাক্ততার কারণে শুষ্ক মৌসুমে উপকূলের লাখ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে। বর্ষার পানি ছোট জলাধারে ধরে রাখলে সেই জমিতে রবিশস্য চাষ সম্ভব।
সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য দিনে ২ থেকে ৩ কিলোমিটার হাঁটে। একটি পরিবারের জন্য ১০ হাজার লিটারের একটি ট্যাংক পুরো শুষ্ক মৌসুম পার করে দেয়।
সাতক্ষীরার শ্রীফলতলায় একটি সমবায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ৫০টি পরিবার শুকনো মৌসুমেও পানির জোগান পাচ্ছে।
এই মডেল জাতীয় কর্মসূচিতে নেওয়া দরকার ছিল আরও ১০ বছর আগে। অগভীর নলকূপে পানি তুলতে যে জ্বালানি খরচ হয়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করলে সেই খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের আদর্শ মাত্রা ৩ থেকে ৫ শতাংশ। আমাদের বাস্তবতা হলো ১ শতাংশ বা তারও কম, কোনো কোনো এলাকায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত নেমে গেছে। দুর্বল মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না, বন্যায় ভেসে যায়, খরায় ফেটে যায়।
সুস্থ মাটি তার ওজনের ২০ শতাংশ পর্যন্ত পানি ধরে রাখতে পারে। গবেষণা বলছে, মাটিতে প্রতি ১ শতাংশ জৈব পদার্থ বাড়ালে প্রতি হেক্টরে দেড় লাখ লিটার বাড়তি পানি ধরে রাখার সক্ষমতা তৈরি হয়। বৃষ্টির পানি ও কম্পোস্টের সমন্বয় ফসলের ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৭০ শতাংশই জৈব এবং কম্পোস্টযোগ্য। সেটা এখন মাটিতে পুঁতে বিষ তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি পরিবার রান্নাঘরের বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি শুরু করলে মাটির স্বাস্থ্য এবং ভাগাড়ের চাপ—দুটোই কমবে।
ঢাকায় এক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, একসময় ঢাকায় ৭৫টি খাল ছিল। তার বেশির ভাগ এখন দখল হয়ে গেছে বা ভরাট হয়ে গেছে, অবশিষ্ট আছে মাত্র ২৬টি।
গত ৩০ বছরে ঢাকার ৬০ শতাংশ জলাভূমি এবং ৬৫ শতাংশ খাল হারিয়ে গেছে। ঢাকার ড্রেনেজ–ব্যবস্থা ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি সামলাতে পারে, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টির তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবছর বর্ষা শুরুর পর খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের তোড়জোড় শুরু হয়। এটা উল্টো হওয়া উচিত। বর্ষার আগেই সব খাল, ড্রেন, নালা পরিষ্কার না করলে পানি নামার পথ বন্ধ থাকবে, যত বড় ড্রেনই বানানো হোক।
ড্রেন বড় করলেই সমস্যার সমাধান নেই। পানির গন্তব্য দরকার। নেদারল্যান্ডস বুঝেছে পানিকে আটকানো যায় না, তাকে পথ দিতে হয়। তারা নদী ও খালের চারপাশের জমি ছেড়ে দিয়ে বন্যা ধরে রাখার জলাধার তৈরি করেছে।
ঢাকার বেগুনবাড়ি খাল বা কল্যাণপুর এলাকাকেও এভাবে পানি ধরে রাখার পার্কে রূপান্তর করা সম্ভব, হাতিরঝিলের মতোই।
টোকিওতে শহরের নিচে একটি বিশাল পানি ব্যবস্থাপনা সুড়ঙ্গ শহরকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখে। আমাদের শহরে সেই বিনিয়োগ নেই। কিন্তু ছোট পরিসরে খাল পুনরুদ্ধার এবং নগর জলাধার তৈরি এখনো সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।
এই কাজগুলো হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নয়; বরং সঠিক পরিকল্পনা, স্থানীয় উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।
বৃষ্টি প্রতিবছর আসে। প্রতিবছর চলেও যায়। প্রশ্ন একটাই, এবার কি আমরা শুধু ভিজব, নাকি পানিটা ধরে রাখব? প্রকৃতি প্রতিবছর সুযোগ দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত আমাদের।
সুবাইল বিন আলম, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক
ইমেইল: contact@subail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব।