
ইসরায়েলে সর্বশেষ নির্বাচন যে মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন একটি নতুন জোট গঠনের জন্য আলোচনা করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ‘ইহুদি রাষ্ট্রটি’র শত্রু-মিত্র সবার মনে সমানতালে ফ্যাসিবাদ কথাটি এসেছিল। তখন থেকেই ইসরায়েল ‘একটি ফ্যাসিবাদী ধর্মতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’ কিংবা ইসরায়েল ‘ঘুমের ঘোরে হেঁটে ইহুদি ফ্যাসিবাদের দিকে যাচ্ছে’—এ ধরনের সতর্কতামূলক কথা বলা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
কিন্তু এসব সতর্কবার্তা যে কানকে লক্ষ করে বলা হচ্ছে, সেই কান বধির বলে মনে হচ্ছে। কারণ, নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রিত্বে ফিরে আসার একটি পথনকশা তৈরি করেছেন। তিনি ইসরায়েলের গণতন্ত্রের সম্ভাব্য মৃত্যু এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান কুখ্যাতি নিয়ে তোলা যেকোনো উদ্বেগকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইহুদি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে তিনিই শেষ কথা বলবেন। সেটি তিনি আমেরিকায় যেভাবে বলে থাকেন, সেটি ইসরায়েলেও বলবেন।
বেশ কিছু বিশিষ্ট আমেরিকান ইহুদি ইসরায়েলি ব্যালট বাক্স ফ্যাসিবাদী হুমকির জন্ম হচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিলেও ওয়াশিংটন এখনো ইসরায়েলের রাজনীতি নিয়ে অনেকাংশে চুপ রয়েছে।
যদি বলা হয় ট্রাম্প বেপরোয়া ছিলেন, তাহলে বলতে হবে বাইডেন তাঁর সহযোগী। নেতানিয়াহুকে তাঁর বিজয়ের জন্য যেসব আরব দেশ অভিনন্দন জানিয়েছে, তাদের কী বলে অভিহিত করব, সে উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
ইসরায়েলে ফ্যাসিবাদের সমস্যার জন্য সেই সব চরমপন্থী দল ততটা দায়ী নয়, যারা নেতানিয়াহুর পরবর্তী সরকারের শরিক হবে; বরং নেতানিয়াহু ও তার চরম উগ্রপন্থী লিকুদ পার্টি বেশি দায়ী। কারণ, তিনি ও তাঁর দোসরেরা জর্ডান নদীর উভয় পাড়ে আধিপত্যশীল একটি ইহুদি রাষ্ট্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন বহুদিন ধরে।
নিজের আত্মজীবনীতে নেতানিয়াহু তাঁর প্রয়াত পিতা বেনজিয়নকে একটি অধ্যায় উৎসর্গ করেছেন। সেখানে তিনি তাঁর পিতাকে পুরো ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া জঙ্গি সংশোধনবাদী আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং এ নিয়ে রীতিমতো গর্ব করেছেন। এই সংশোধনবাদী যোদ্ধারাই বর্তমান লিকুদ পার্টির আদি সংগঠন হেরুত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁরা ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সন্ত্রাসী অভিযানের জন্য কুখ্যাত ছিলেন।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের দুটি প্রধান উগ্র ধর্মীয় দলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এর একটি হলো শাস এবং অপরটি হলো ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম। এই গোষ্ঠী দুটি ইহুদি রাষ্ট্রে ধর্মীয়, শিক্ষাগত এবং সামাজিক বিষয়ে তাদের কর্তৃত্ব চায়। নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কর্তৃত্ব পাবে। বিনিময়ে তারা পার্লামেন্টে বিচার বিভাগে নেতানিয়াহুর হয়ে তদবির চালাবে।
সেই বছর, আলবার্ট আইনস্টাইন, হান্না আরেন্ত এবং আরও অনেক বিশিষ্ট ইহুদি হেরুত পার্টিকে নাৎসি এবং ফ্যাসিস্ট দলগুলোর মতো নিষ্ঠুর বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
এখন দেখা যাচ্ছে, যেমন বাপ, তেমন বেটা। নেতানিয়াহুর পিতার গুরু ভ্লাদিমির জাবোতিনস্কি তাঁর ‘দ্য আয়রন ওয়াল’ শীর্ষক একটি কুখ্যাত প্রবন্ধে যেমনটি বলেছিলেন, ঠিক সেভাবে নেতানিয়াহুও বিশ্বাস করেন, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের অবশ্যই সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি আরবদের স্বদেশের অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি করাতে হবে।
নেতানিয়াহু এ প্রত্যয় নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। ধীরে ধীরে নিজেকে তিনি আধুনিক ইসরায়েলি ফ্যাসিবাদের জনক হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি অসলো শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনকে শয়তান হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু করেছিলেন এবং তাঁর প্ররোচনাতেই একজন ইহুদি ধর্মান্ধ রবিনকে হত্যা করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ফ্যাসিবাদী এবং বর্ণবাদী নেতাদের একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে শুরু করেন। আভিগদর লিবারম্যান, গিডেওন সার, নাফতালি বেনেট এবং আয়েলেত শাকেদের মতো সবাই লিকুদ পার্টিতে তাঁর উইংয়ের অধীনে পরিপক্ব হয়ে ওঠেন।
গত নির্বাচনের আগে, নেতানিয়াহু ফ্যাসিস্ট ধর্মীয় দল ওটজমা ইয়েহুদিত এবং ধর্মীয় জায়নবাদের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্কের মধ্যস্থতা করেছিলেন। এসব গোষ্ঠীর নেতা ইতামার বেন জিভির এবং বেজালেল স্মোত্রিচকে ব্যক্তিগতভাবে এক করার জন্য তাঁর বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নেতানিয়াহু তাঁদের নির্বাচনী তালিকায় একত্র করতে চেয়েছিলেন, যাতে তাঁরা পার্লামেন্টে যেতে পারেন এবং তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারেন। এবং তিনি সফল হয়েছেন।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের দুটি প্রধান উগ্র ধর্মীয় দলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এর একটি হলো শাস এবং অপরটি হলো ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম। এই গোষ্ঠী দুটি ইহুদি রাষ্ট্রে ধর্মীয়, শিক্ষাগত এবং সামাজিক বিষয়ে তাদের কর্তৃত্ব চায়। নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কর্তৃত্ব পাবে। বিনিময়ে তারা পার্লামেন্টে বিচার বিভাগে নেতানিয়াহুর হয়ে তদবির চালাবে।
এটি কেবল নেতানিয়াহুকে দেশের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়াবে না, বরং ঘুষ, জালিয়াতি এবং বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর তাঁকে আইনি জবাবদিহি থেকে বাঁচতে সাহায্য করবে। এতে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠবেন তিনি।
আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
● মারওয়ান বিশারা আল-জাজিরার সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক