দৃশ্যপট পরিচিত। একজন সামরিক কর্মকর্তা জোর করে ক্ষমতা দখল করেন। বিরোধীদের কারাগারে পাঠান বা নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য করেন। এরপর একটি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শাসক তখন তাঁর সামরিক পোশাক ছেড়ে স্যুট-টাই পরেন। আর নিজেকে ‘প্রেসিডেন্ট’ নামে একটু বেশি গ্রহণযোগ্য উপাধিতে ভূষিত করেন। ২০১৩ সালে মিসরে এটা ঘটেছে। গত বছর ঘটেছে গ্যাবনে। আর চলতি বছর এটা ঘটেছে মিয়ানমারে। দেশটির সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং হুবহু সেই পুরোনো চিত্রনাট্য অনুসরণ করছেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা দখল করেন। তার আগে সেখানে একটি অবাধ নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে স্টেট কাউন্সেলর ও গণতন্ত্রের প্রতীক অং সান সু চি এবং তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ভোটে জয় পেয়েছিল। সেই জেনারেল দ্রুত সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন, সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করেন এবং সু চিসহ অন্যান্য দলের নেতাদের জেলে পোরেন। যখন বিক্ষোভ ফেটে পড়ল, তিনি নামিয়ে দিলেন সেনাবাহিনী। শুরু হলো এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। সীমান্ত এলাকার বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে হাত মেলালেন গণতন্ত্রকামী আধা সামরিক যোদ্ধারা।
ক্ষমতাসীন জান্তা এখন দেশটির এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এরপরও তারা মিয়ানমার গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তিন ধাপে তথাকথিত এক নির্বাচনের আয়োজন করে। বহু মানুষ ভোট দিতে পারেননি বা ইচ্ছা করেই দেননি। ভোট গ্রহণ চলাকালেও বিরোধী ঘাঁটিগুলোয় বিমান হামলা চালিয়ে গেছে সামরিক বাহিনী। এটি আসলে কোনো ‘জেনারেল’ বা সাধারণ নির্বাচন ছিল না, ছিল জেনারেলদের নির্বাচন।
ট্রাম্প প্রশাসনও মিয়ানমারের এই বিরল খনিজের দিকে চোখ রাখছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য দেশের নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বা স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করবে না, যা অত্যন্ত খারাপ একটি নজির। এ ছাড়া অনলাইন স্ক্যাম সেন্টার এবং আন্তদেশীয় অপরাধ প্রতিরোধে সহযোগিতার উপায় খুঁজতে জুনে মিয়ানমারের সঙ্গে নিম্ন পর্যায়ের আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কোনো কিছু স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে কেবল আলোচনা চালানোটা ঠিক আছে।
ফলাফল ছিল আগের মতোই অনুমেয়। দেশটির সংবিধান অনুযায়ীই সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকে। আর সেই সংবিধান তৈরি করেছিলেন জেনারেলরাই। বাকি সাধারণ আসনগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি জিতেছে সামরিক সমর্থিত দল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ বা ইউএসডিপি। নতুন সংসদ এপ্রিলে মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে।
এর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টায় আছেন মিন অং হ্লাইং। বৈধ রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই তিনি ভারত ও চীনে সরকারি সফর করেছেন। একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনে থাকা ছোট্ট দেশ লাওসেও তাঁকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান অবশ্য মিয়ানমারকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে রাজি হয়নি (কেবল নিম্নপর্যায়ের বৈঠকের সুযোগ দিচ্ছে)। তবে কিছু উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জোটে থাকা কিছু দেশ তাদের অবস্থান থেকে নড়বড়ে হয়ে পড়ছে এবং এই শাসনের সঙ্গে মেলামেশা করতে রাজি হচ্ছে। ৬ ও ৭ আগস্ট ব্যাংককে জেনারেলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড।
এদিকে ৮১ বছর বয়সী সু চি এখনো বন্দী। দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অবশেষে ৩ আগস্ট জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁকে দেখা করার সুযোগ দেয়। বৈঠকটির দুটি ছবি ও তাঁর জন্মদিনের কেক কাটার দুটি ছবি সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশ করেন জেনারেলরা। সু চি যে বেঁচে আছেন, তা প্রমাণের জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে নতি স্বীকার করতেই তাঁরা এটি করেছেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সু চি দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের নেতৃত্ব দেওয়ার আগে ১৫ বছর কারাবন্দী বা গৃহবন্দী ছিলেন। তবে স্টেট কাউন্সেলর হিসেবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে কথা বলতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি তাঁর বিশ্বব্যাপী সমর্থনের বড় অংশ হারান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট হিউজ কলেজ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা তাঁর প্রতিকৃতি সরিয়ে নেয়। কিন্তু তারপরও মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার তিনি এখনো এক শক্তিশালী প্রতীক।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একজন কৌঁসুলি মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর যে সহিংসতা তিনি নিজে চালিয়েছেন, তার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার অভিযোগে এই পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একজন কৌঁসুলি মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর যে সহিংসতা তিনি নিজে চালিয়েছেন, তার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার অভিযোগে এই পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে।
তাহলে মিয়ানমারের কিছু প্রতিবেশী কেন এই স্পষ্টত অবৈধ শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এত ব্যাকুল? ‘রিয়েল পলিটিকস’ বা বাস্তবভিত্তিক রাজনীতির নানা রূপ এখানে তার কুৎসিত চেহারা দেখাচ্ছে। চীনের জন্য এটি একটি দুর্বল প্রতিবেশীর ওপর প্রভাব বজায় রাখার লড়াই। চীন সব সময়ই দুটি পথ খোলা রাখে। তারা নেপিদোতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তাদের সমর্থন দেয়, আবার তাদের সীমানায় থাকা সশস্ত্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র জোগায় ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে ভারতেরও। দেশটি মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা উপাদানের (রেয়ার আর্থস) দিকে নজর দিচ্ছে। মিয়ানমারে এই উপাদান প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পর মিয়ানমার বিশ্বে বিরল মৃত্তিকা উপাদানের চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক। নয়াদিল্লি চীনের ওপর থেকে নিজেদের নির্ভরতা কমাতে চায়। কিন্তু মিয়ানমারের অধিকাংশ বিরল খনিজ পাওয়া যায় কাচিন রাজ্যে। সেটি রয়েছে ‘কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি’ নামের একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে।
ট্রাম্প প্রশাসনও মিয়ানমারের এই বিরল খনিজের দিকে চোখ রাখছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য দেশের নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বা স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করবে না, যা অত্যন্ত খারাপ একটি নজির। এ ছাড়া অনলাইন স্ক্যাম সেন্টার এবং আন্তদেশীয় অপরাধ প্রতিরোধে সহযোগিতার উপায় খুঁজতে জুনে মিয়ানমারের সঙ্গে নিম্ন পর্যায়ের আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কোনো কিছু স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে কেবল আলোচনা চালানোটা ঠিক আছে।
গত সাড়ে পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে মিয়ানমার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। লড়াইয়ের কারণে ৪০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অনেকেই হারিয়েছে একাধিকবার। অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যার মধ্যে লাখ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখোমুখি।
অনেক ভালো মানুষই এই সামরিক অচলাবস্থা ভাঙার উপায় খুঁজছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে একটি অবৈধ শাসনকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায়ই অপ্রিয় সব সরকারের সঙ্গে লেনদেন করতে হয়। তবে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত নিজের নীতিতে অটল থাকার সুযোগটা পাচ্ছে।
● কিথ বি রিচবার্গ ওয়াশিংটন পোস্ট–এর কলামিস্ট
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত