
গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলা এলাকার জয়মণি ঠোটা গ্রামের বাসিন্দা মিরাজ শেখকে সাদাপোশাকে থাকা কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েক ব্যক্তি জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান। মিরাজ শেখের পরিবারসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে এই তুলে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে কোস্টগার্ডের সম্পৃক্ততা নানাভাবে উঠে আসছে (প্রথম আলো, ১৬ মে ২০২৬, দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬)। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে চব্বিশ-পরবর্তী প্রথম গুমের ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছে। মিরাজ শেখের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করা দরকার।
মিরাজ শেখকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরদিন তাঁর পরিবার মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড অফিসে গেলে বলা হয়, ‘অভিযানে আছে, বিকেলে আসেন।’ বিকেলে তাঁরা মিরাজের উপস্থিতি অস্বীকার করেন (প্রথম আলো, ১৬ মে ২০২৬)। ২৩ এপ্রিল থানায় জিডি করা হলেও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চারবার থানায় যাওয়ার পর জিডি নেওয়া হয়েছে। আবার জিডিতে বক্তব্য পরিবর্তনেও বাধ্য হয় পরিবার। কোস্টগার্ডের নামও জিডিতে লেখা যায়নি। পুলিশের বক্তব্য ছিল, জিডিতে গুম বা অপহরণ লেখা যায় না, মামলা করতে হবে। আবার মামলা করলে আন্তবাহিনীর বিরুদ্ধে করা যাবে না (দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬)।
নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে গত ৯ জুন তাঁর পরিবার ও গ্রামবাসী মানববন্ধন করলে কোস্টগার্ডের সঙ্গে এলাকাবাসীর পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এই সংঘর্ষের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিরাজের পরিবারের ৩ নারীসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা টানা ২৭ দিন জেল খাটার পর জামিনে মুক্তি পান (প্রথম আলো, ১২ জুন ২০২৬, দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬)।
সম্প্রতি দুটি সংবাদমাধ্যম মিরাজ শেখের গুমের ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, খোদ কোস্টগার্ডের বোটে চড়েই তাদের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পাল্টে ফেলারও অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার (দ্য ডিসেন্ট, ২৯ আগস্ট ২০২৬)। অর্থাৎ কোস্টগার্ড তাদের বক্তব্য প্রচারের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেছে।
সাদাপোশাকে তুলে নেওয়া, দায় অস্বীকার, পরিবারকে হয়রানি এবং সংবাদমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা—বিগত বছরগুলোর পুরোনো ও পরিচিত কৌশলেরই হুবহু পুনরাবৃত্তি। পুলিশকে যখন প্রশ্ন করা হচ্ছে, তখন বারবার পুলিশ ‘জলদস্যুতা’র সঙ্গে মিরাজ শেখের সম্পৃক্ততাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এমনকি সম্প্রতি মিরাজ শেখের ঘটনা প্রসঙ্গে জলদস্যুতার ইস্যু এনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে স্বাধীন তদন্ত করানো হয়েছে, তবে তদন্তে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ এ ঘটনাকে বিভিন্ন জলদস্যু গ্রুপের পারস্পরিক বিরোধের ফল হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি (জাগো নিউজ, ২৯ আগস্ট ২০২৬)।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সংগত কারণেই কয়েকটা প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। প্রথমত, ‘স্বাধীন তদন্ত’ যদি বলা হয়, সেখানে কারা ছিলেন? তদন্ত কমিটিতে বাহিনীর সদস্যের বাইরে আর কারা যুক্ত ছিলেন? যদি যুক্ত না থাকেন, তাহলে সেটাকে স্বাধীন তদন্ত বলা যেতে পারে কি? নাকি কেবল অন্য বাহিনী করেছে বলেই সেটা ‘স্বাধীন’?
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রসঙ্গ কেন আসবে? কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটলেই কি তা গুম হয়? অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র নজির আছে।
তৃতীয়ত, পুলিশের বক্তব্যের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মিরাজ শেখের ঘটনার সঙ্গে জলদস্যুতার বিষয় এনেছেন। কিন্তু যাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী আছে, তিনি যত বড় অপরাধী হোন না কেন, তাঁকে এত দিন থানায় হাজির না করাটাই তো প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন। মিরাজ যদি ‘অপরাধী’ হয়েও থাকেন, তাঁরও মানবাধিকার রয়েছে, আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে—এটা তো একেবারেই ন্যূনতম বোঝাপড়ার অংশ। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ আদতে ঘুরেফিরে মূল প্রশ্নকেই হাজির করেছে: গুমের অভিযোগের তদন্ত কে করবে? বাহিনীই করবে?
প্রতিবাদ করতে গিয়ে মিরাজ শেখের পরিবারের জেল খাটার ঘটনাটি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এতে স্পষ্ট হয় যে ভুক্তভোগী পরিবার আর্থসামাজিক দিক থেকে প্রান্তিক হলে সুবিচারের দাবিতে সরব হতে গিয়েও উল্টো হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে পারে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে ব্যবহারের নজিরের সঙ্গে মিলিয়ে অনুমান করা যায়, কাঠামোগত নীরবতা ও অস্বীকারের পরিস্থিতিও তৈরি করা সম্ভব।
খেয়াল করুন, মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ড তুলে নিয়ে যাওয়ার একের অধিক প্রত্যক্ষদর্শী থাকলেও আদতে লাভ হচ্ছে না। পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে, আন্তবাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া যাবে না। আবার জিডি নিতেও গড়িমসির সাক্ষ্য পাওয়া যায়। জিডিতে ঘটনার ভাষ্য পরিবর্তন করতেও বাধ্য করা হয়। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রে জিডি নেওয়া বা মামলা নেওয়াই যেখানে পুরোপুরি বাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্ভর হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে তদন্ত বা অনুসন্ধানের আলাপ তো দূরের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
মিরাজ শেখের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তবাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করবে না বা করতে সক্ষম হবে না। যদি অন্য বাহিনীকে অনুসন্ধানের দায়িত্বের কথা বলাও হয়, সাদাপোশাকে তুলে নেওয়ার সময় পরিচয় গোপন করতে এক বাহিনীর সদস্যরা অন্য বাহিনীর নাম ব্যবহার করার অজস্র নজির আমরা আগে দেখেছি। এমনকি বিভিন্ন বাহিনীর যৌথ সম্পৃক্ততাও থাকে। ফলে এখানে স্বার্থের সংঘাত অবধারিতভাবেই হাজির হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার গভীর সংকট রয়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রাণহানির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত বাহিনীর মৌলিক সংস্কার ছাড়া সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দুরূহ। ফলে যেকোনো গুমের মতো স্পর্শকাতর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে তাদের ওপর ভরসা রাখা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন।
গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা আর অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত যে এক বিষয় নয়, সেটা জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ তাঁদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, গুমের খবর পাওয়ামাত্র আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলার অপেক্ষা না করে অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত। (প্রথম আলো, ৩০ আগস্ট ২০২৬)
প্রতিবাদ করতে গিয়ে মিরাজ শেখের পরিবারের জেল খাটার ঘটনাটি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এতে স্পষ্ট হয় যে ভুক্তভোগী পরিবার আর্থসামাজিক দিক থেকে প্রান্তিক হলে সুবিচারের দাবিতে সরব হতে গিয়েও উল্টো হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে পারে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে ব্যবহারের নজিরের সঙ্গে মিলিয়ে অনুমান করা যায়, কাঠামোগত নীরবতা ও অস্বীকারের পরিস্থিতিও তৈরি করা সম্ভব।
বর্তমান সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ বিলটিকে এই বাস্তবতায় পাঠ করা প্রয়োজন। মূলত ২০২৫ সালের গুমবিরোধী অধ্যাদেশে গুমের অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার প্রস্তাবিত আইনে সেই ব্যবস্থাকে একপ্রকার অকার্যকর করে ফেলেছে।
আবার মানবাধিকার কমিশনের হাতেও যে ক্ষমতা ছিল, সেটাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত আইনে গুমের ঘটনার তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে অন্য বাহিনী বা আন্তবাহিনীর কাছে। এমনকি আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে কমিশনের হাত থেকে। আদতে গুমবিরোধী আইনের সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের যে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছিল, তা রহিত করে আদতে দুটো প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াকেই কার্যত ক্ষমতাহীন করে ফেলা হয়েছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমান সংসদে এমন অনেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী রয়েছেন, যাঁরা বিগত শাসনামলে নিজেরাই গুমের শিকার হয়েছিলেন, যাঁদের দলের অসংখ্য সদস্য গুম থেকে আর ফেরত আসেননি। ফলে গুমের নির্মমতা, ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। তা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত বিলে সেই সংবেদনশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। মিরাজ শেখের ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয় যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কে করবে, এই প্রশ্নের সুরাহা না হলে আমরা গুম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মোকাবিলা করতে পারব না।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব