কোথায় যেন পড়েছিলাম, সুযোগ অনেকটা চশমার পাওয়ারের মতো। কারও কম প্রয়োজন, কারও বেশি প্রয়োজন, কারও হয়তো প্রয়োজনই হয় না। যার চোখ খারাপ আর যার চোখে কোনো সমস্যাই নেই, তাদের দুজনকেই যদি একই পাওয়ারের চশমা দেওয়া হয়, তাহলে বিষয়টিকে হয়তো আমরা ‘সমতা’ বলতে পারি, কিন্তু কোনোমতেই একে ‘ন্যায্যতা’ বলা যায় না। ‘সমতা’ ও ‘ন্যায্যতা’র এই আপাতদ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে নারী কোটা।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই সরকারি চাকরিতে কোনো না কোনোভাবে নারী কোটা ছিল। ১৯৭২-৭৬ সালে সরকারি চাকরিতে মাত্র ২০ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হতো; ৮০ শতাংশ নিয়োগই ছিল কোটার অধীন। ১৯৭৬ সালে সেই কোটা ৬০ শতাংশে নেমে আসে। পরে ১৯৮৫ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা ৫৫ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা যোগ করে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ পদে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হতো।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র রূপ নিলে, প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা ঢালাওভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাদ পড়ে যায় নারীদের জন্য নির্ধারিত ১০ শতাংশ কোটা। আর এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রভাবে সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী নারীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের কোলাটেরাল ড্যামেজ বা অনিচ্ছাকৃত ক্ষতিতে পরিণত হলেন।
চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক দোলাচলে ‘কোটা’ একটি অনুচ্চারিত শব্দে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকার কোটাপদ্ধতি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিলেও নারী কোটা পুনর্বহালের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অথচ সর্বস্তরের নারীদের সক্রিয় সমর্থন ও সাহসী অংশগ্রহণ ছাড়া চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে সফল হতো না, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক এগিয়েছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের বিদ্যমান সমাজবাস্তবতা না বদলে কেবল ‘সমান অধিকারের’ কাগুজে প্রতিশ্রুতি দেওয়া একধরনের প্রতারণা। কোটা বিলোপকে যাঁরা সাম্যের প্রতীক মনে করেন, তাঁদের বলব, আগে ঐতিহাসিক ও সামাজিক বঞ্চনার গভীর গহ্বর থেকে বাংলাদেশের মেয়েদের মূল সমতলে তুলে আনুন।
২০১৮ সালের সেই কোটা সংস্কার আন্দোলনই চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। দুঃখজনক বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনও সরকারি চাকরিতে নারী কোটার বিষয়ে দৃশ্যত নীরব ছিল। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারির নেতারা, যাঁরা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন বা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখতেন, তাঁরাও গত দুই বছরে নারী কোটা পুনর্বহাল নিয়ে জোরালো কোনো ভূমিকা রাখেননি। ফলে ২০২৫ সালে সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সন্তান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য মোট ৭ শতাংশ কোটা বহাল রাখলেও জেলা কোটার পাশাপাশি নারী কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘোষণা করে।
২০১৮ সালে নারী কোটা বাতিলের পর থেকে গত আট বছরে সরকারি চাকরিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তিতে একধরনের ধস নেমেছে। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এমনকি পররাষ্ট্র ক্যাডারে (ফরেন সার্ভিস) ৪৩তম ও ৪৪তম বিসিএসে একজন নারীও সুযোগ পাননি।
নারী কোটার বিলুপ্তি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল কি না, এখন সে প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূলমন্ত্রই ছিল বৈষম্যহীনতা। অথচ নারী-পুরুষের বৈষম্য বিলোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উপায় ‘নারী কোটা’ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন মনে করলেন না নীতিনির্ধারকেরা। একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার উদ্ধৃতি দিয়ে সুশীল সমাজ সভা-সেমিনার মুখর করছেন; অথচ সরকারি চাকরিতে নারীর অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে বড় পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা যেমন বলা হয়েছে, আবার একই সঙ্গে এই অনুচ্ছেদে দেশের নারী এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন, অর্থাৎ কোটা প্রবর্তনের অধিকারও সরকারের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদের মর্ম অনুসারে, সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার কথা বলা হলেও সুযোগের ‘ন্যায্যতা’ নিশ্চিত করার জন্য নারীর জন্য বিশেষ বিধান বা কোটা নির্ধারণের অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে।
সংবিধানের অন্তর্নিহিত মর্ম অনুসারে কোটাব্যবস্থা রাষ্ট্রের ওপরে কোনো বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না, তবে অনগ্রসর নারী সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই কোটা সৃষ্টি করার পূর্ণ অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। সুতরাং বর্তমান সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা না করে নারী কোটা পুরোপুরি বাতিল করা সংবিধানের সেই মর্মের পরিপন্থী।
অবশ্য তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশের নারীরা সংবিধানে বর্ণিত অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোটাপদ্ধতির সুবিধা ভোগ করবেন। রাষ্ট্র চাইলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নারী কোটার সামগ্রিক প্রভাব, পরিসর ও বাস্তব প্রয়োজনীয়তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়ন করে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত পরিমার্জন করতে পারে।
গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক এগিয়েছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের বিদ্যমান সমাজবাস্তবতা না বদলে কেবল ‘সমান অধিকারের’ কাগুজে প্রতিশ্রুতি দেওয়া একধরনের প্রতারণা। কোটা বিলোপকে যাঁরা সাম্যের প্রতীক মনে করেন, তাঁদের বলব, আগে ঐতিহাসিক ও সামাজিক বঞ্চনার গভীর গহ্বর থেকে বাংলাদেশের মেয়েদের মূল সমতলে তুলে আনুন। তারপর সমতলে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষের সঙ্গে এক সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করুন।
বাংলাদেশের নারীর জন্য এখন কেবল সুযোগের ‘সমতা’ নয়, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুযোগের ‘ন্যায্যতা’। সরকারি চাকরিতে নারী কোটার বিলুপ্তি এই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় বাধা। একটি প্রকৃত বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার স্বার্থে সরকারি চাকরিতে যৌক্তিক মাত্রায় নারী কোটা পুনঃপ্রবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।
● সারওয়াত সিরাজ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা
shuklasiraj@gmail.com