সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গুলিতে নিহত নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ
সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গুলিতে নিহত নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

সান ডিয়েগোর মসজিদে হামলা: ‘আমাদের কাছে তাঁরা শহীদ ও বীর’

সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারের কর্তৃপক্ষ গত সোমবার মসজিদের ভেতরে সংঘটিত গোলাগুলির ঘটনায় নিহত দুই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছে। আমিন আবদুল্লাহের পরিচয় শনাক্তের এক দিন পর এই তথ্য পাওয়া গেল। নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহ সন্দেহভাজন হামলাকারীদের মসজিদে প্রবেশে বাধা দিতে গিয়ে নিহত হন। মসজিদ কর্তৃপক্ষ আল–জাজিরাকে জানিয়েছে, বাকি দুজনও বন্দুকধারীদের প্রতিহত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

মসজিদের ইমাম তাহা হাসান বলেন, ‘আমরা তাঁদেরকে আমাদের ভাই বলি। আমাদের কাছে তাঁরা শহীদ ও বীর।’

এই শহীদ, এই বীর কারা?

৭৮ বছর বয়সী মনসুর কাজিহা ‘আবু ইজ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি এই মসজিদের দীর্ঘদিনের কর্মী ছিলেন। নিহত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পুলিশকে ফোন করেছিলেন। মসজিদের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আহমেদ শাবাইক জানান, সিরিয়ার বাসিন্দা কাজিহা বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর পাঁচ সন্তান রয়েছে। তাঁর ভাষায়, তিনি ছিলেন এই মসজিদের মূল ভিত্তি, একটি স্তম্ভ। আশির দশকে মসজিদের নির্মাণের সময় থেকেই কাজিহা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।  

শাবাইক আরও বলেন, তিনি প্রতিদিন মসজিদের যাবতীয় কাজ করতেন। মসজিদের ভেতরের একটি উপহারসামগ্রীর দোকানও চালাতেন। এ ছাড়া রমজান মাসে ইফতার ও সাহরির সব রান্নার দায়িত্বেও তিনি ছিলেন।

মনসুর কাজিহার ছেলে ইয়াসের কাজিহা তাঁর বাবাকে কেবল এই কমিউনিটিরই নয়, বরং ‘আমাদের পরিবারেরও স্তম্ভ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। গত মঙ্গলবার আয়োজিত এক শোকসভায় ইয়াসের বলেন, ‘তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, কীভাবে কঠিন পরিস্থিতি সামলে জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ করতে হয়।’  

৫৭ বছর বয়সী নাদের আওয়াদ ইসলামিক সেন্টারের ঠিক উল্টো দিকে বসবাস করতেন। প্রতিদিন নামাজ আদায়ে অংশ নিতেন। তিনি যখন গুলির শব্দ শোনেন, তখন তিনি ভবনের দিকে ছুটে যান। সেখানে তাঁর স্ত্রী স্কুলের শিক্ষকতা করেন। ইমাম হাসান জানান, তিনি সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছিলেন।

শাবাইক বলেন, গুলির শব্দ শুনেই তিনি সাহায্য করার জন্য মসজিদের ভেতর ছুটে যান। মসজিদের দিকে আসতে থাকা কিছু মানুষকে তিনি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেন।
আওয়াদের স্ত্রী ইসলামিক স্কুলের একজন শিক্ষক। ইমাম হাসান বলেন, আওয়াদ প্রতিদিন ইসলামিক সেন্টারে আসতেন, প্রতিদিন নামাজ আদায়ে যোগ দিতেন।  
৫১ বছর বয়সী আমিন আবদুল্লাহের পরিচয় পাওয়ার পর অনলাইনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার ঢল নামে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত একটি ফেসবুক প্রোফাইলের ১ হাজার ৮০০ অনুসারী দেখা যায়। আবদুল্লাহকে বিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, তিনি আট সন্তানের জনক ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই হামলা যেন ‘ভয়াবহ রূপ’ না নেয়, সেটা প্রতিরোধে তিনি ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন’। সান ডিয়েগোর পুলিশপ্রধান বলেন, তাঁর কর্মকাণ্ড ছিল বীরত্বপূর্ণ। আজ তিনি বহু জীবন বাঁচিয়েছেন।  

মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে তাঁর মেয়ে হাওয়া আবদুল্লাহ বলেন, তাঁর বাবা ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, তাঁকে সমর্থন জোগাতেন, তাঁর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ এবং অনুপ্রেরণাদায়ী আদর্শ। তিনি তাঁর দায়িত্বকে এতটাই গুরুত্বসহকারে নিয়েছিলেন যে মাঝেমধ্যে ডিউটির সময় খাবার পর্যন্ত খেতেন না।  

দীর্ঘদিনের পরিচিত মাহমুদ আহমদি জানান, আবদুল্লাহ সব দর্শনার্থীর হাসিমুখে সালাম নিয়ে স্বাগত জানাতেন। আরেক বন্ধু শেখ উসমান ইবনে ফারুক বলেন, আবদুল্লাহ প্রায় প্রতিদিনই সেখানে থাকতেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও আট সন্তানের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।

আবদুল্লাহ খ্রিষ্টান পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন। ২০১৯ সালের একটি ইউটিউব ভিডিওতে তিনি হাইস্কুলের পর ইসলাম ধর্ম আবিষ্কারের যাত্রার কথা বর্ণনা করেছিলেন। ফারুক জানান, নব্বই দশকে আবদুল্লাহর মুসলমান হওয়ার পরপরই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সম্প্রতি তাঁরা একসঙ্গে মক্কায় হজও করে এসেছিলেন।

আবদুল্লাহর সাবেক সহকর্মী ও বায়োটেক পেশায় নিযুক্ত কাশিফ উল হুদা আল–জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তাঁকে স্মরণ করে লিখেছেন, তিনি যেমন একজন খাঁটি আমেরিকান ছিলেন, তেমনি ছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম। দুই আমেরিকান তরুণের চালানো গুলিতেই আজ তাঁকে প্রাণ দিতে হলো।