টাকা শুধু ব্যাংকে পড়ে থাকলে সেটা বাড়ে না, বরং সময়ের সঙ্গে তার ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে
টাকা শুধু ব্যাংকে পড়ে থাকলে সেটা বাড়ে না, বরং সময়ের সঙ্গে তার ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে

মতামত

শুধু টাকা জমিয়ে কি নিরাপদ ভবিষ্যৎ সম্ভব?

‘টাকা জমাও, ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে’—শৈশব থেকে আমরা এ শিক্ষাই পেয়ে এসেছি। কিন্তু বর্তমান অর্থনীতি আমাদের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, শুধু টাকা জমালেই কি ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকে? নাকি সময়ের সঙ্গে সেই টাকাই ধীরে ধীরে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে?

একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার কথা ধরুন। সারা জীবন চাকরি করে একটু একটু করে সঞ্চয় করেছিলেন। পাঁচ বছর আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল, অবসরের টাকায় শহরের পাশে একটি ছোট ফ্ল্যাট কিনবেন। তখন যে ফ্ল্যাটটির দাম ছিল প্রায় ৪০ লাখ টাকা, আজ সেটির দাম ৬০ লাখের কাছাকাছি। তাঁর ব্যাংক হিসাবের টাকা কমেনি, বরং মুনাফা যোগ হয়ে কিছুটা বেড়েছে।

কিন্তু সেই টাকায় আর স্বপ্নের ফ্ল্যাটটি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। না, তিনি কোনো অর্থ হারাননি। হারিয়েছেন তাঁর টাকার ক্রয়ক্ষমতা। এটাই মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে নীরব এবং সবচেয়ে নির্মম রূপ। মুদ্রাস্ফীতি এভাবেই কাজ করে নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে এবং প্রতিদিন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই চিত্র আজ নতুন নয়। বাজারে গেলে অনেকেই বলেন, ‘আগের মতো আর কিছুই কেনা যায় না।’ কয়েক বছর আগেও যে পরিবার মাসে ২৫ হাজার টাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালিয়েছে, আজ সেই একই পরিবারকে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। আয়ও বেড়েছে নিঃসন্দেহে। এরপরেও জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশারের ‘দ্য থিওরি অব ইন্টারেস্ট’–এ (১৯৩০) উপস্থাপিত ফিশার ইফেক্ট তত্ত্বে দেখিয়েছেন, অর্থের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে হলে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, মূল্যস্ফীতিকেও বিবেচনায় নিতে হয়।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান মূল্যস্ফীতিকে একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা মানুষের সঞ্চয় ও ভোগ উভয়কেই দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাবিত করে। তাই অর্থনীতির পাঠ আমাদের একটি মৌলিক বিষয় শেখায়। টাকার অঙ্ক নয়, তার ক্রয়ক্ষমতাই প্রকৃত সম্পদের পরিচয়।

সময় এসেছে একটি পুরোনো বাক্যকে নতুনভাবে বলার। শুধু টাকা জমাবেন না; টাকারও একটি কর্মজীবন গড়ে দিন। কারণ, মুদ্রাস্ফীতি কখনো এক দিনে মানুষকে দরিদ্র করে না। সে প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের স্বপ্ন, আমাদের সঞ্চয় এবং আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা থেকে কিছু অংশ কেড়ে নেয়।

এ বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু টাকা জমিয়ে রাখাই কি যথেষ্ট? আমাদের পরিবারে ছোটবেলা থেকেই একটি শিক্ষা দেওয়া হয়—‘সঞ্চয় করো, ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে’। এই শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সঞ্চয় ছাড়া কোনো পরিবার আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে না। জরুরি তহবিল, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা অনিশ্চিত সময়ে সঞ্চয়ই প্রথম আশ্রয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা সঞ্চয়কেই সম্পদ বৃদ্ধির একমাত্র উপায় বলে ধরে নিই। সঞ্চয় টাকা রক্ষা করে। বিনিয়োগ টাকা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ দুইয়ের উদ্দেশ্য এক নয়।

একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। দুই বন্ধু একই বছরে চাকরি শুরু করলেন। দুজনেরই মাসিক আয় ছিল প্রায় সমান। প্রথম ব্যক্তি প্রতি মাসে টাকা জমিয়েছেন। পাঁচ বছর পরে তাঁর ব্যাংক–ব্যালান্স বেড়েছে। দ্বিতীয় ব্যক্তি জরুরি সঞ্চয় রেখেছেন, পাশাপাশি কিছু অর্থ ব্যবহার করেছেন একটি ছোট অনলাইন ব্যবসা গড়ে তুলতে, পেশাগত প্রশিক্ষণ নিতে এবং নতুন দক্ষতা অর্জনে। কয়েক বছর পরে তাঁর আয়ের উৎস একটি থেকে তিনটি হয়েছে। দুজনই পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু একজনের টাকা শুধু সংরক্ষিত হয়েছে, অন্যজনের টাকা সম্পদে রূপ নিতে শুরু করেছে।

এই পার্থক্যই আজকের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এখানে একটি ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি। বিনিয়োগ মানেই শেয়ারবাজারে ঝুঁকি নেওয়া নয়। বিনিয়োগ মানে এমন কোনো সম্পদ, উদ্যোগ বা দক্ষতা উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা, যা ভবিষ্যতে আয় সৃষ্টি করতে পারে। একটি ছোট ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, সরকারি বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড কিংবা উচ্চতর শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা—সবই বিনিয়োগের ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়েলথ অব ন্যাশনস’ গ্রন্থে সম্পদ সৃষ্টির মূল উৎস হিসেবে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আধুনিক অর্থনীতিতেও সেই ধারণা সমান প্রাসঙ্গিক। যে অর্থ উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হয়, সেটি শুধু সম্পদই বাড়ায় না, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখে।

একইভাবে জন মেনার্ড কেইনসমেনার্ড কেইনস তাঁর ‘দ্য জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি’ (১৯৩৬) গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, অর্থ যদি উৎপাদন ও বিনিয়োগের প্রবাহে অংশগ্রহণ না করে, তবে অর্থনীতির গতিশীলতাও কমে যায়।

ব্যক্তি পর্যায়েও এই সত্য প্রযোজ্য। অলস অর্থ সময়ের সঙ্গে মূল্য হারায়। উৎপাদনশীল অর্থ সময়ের সঙ্গে নতুন মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্যই বিনিয়োগের আগে জ্ঞান, পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা অপরিহার্য। সব বিনিয়োগ লাভজনক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই আর্থিক শিক্ষার বিকল্প নেই।

বিনিয়োগ কখনো আবেগের বিষয় নয়, এটি তথ্য, বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি নয় ‘আপনার ব্যাংকে কত টাকা আছে?’ প্রশ্ন হলো, আপনার টাকা কি সময়ের সঙ্গে নিজের মূল্য ধরে রাখতে পারছে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে হয়তো আমাদের অর্থ নিয়ে ভাবার পদ্ধতিই বদলাতে হবে।

সময় এসেছে একটি পুরোনো বাক্যকে নতুনভাবে বলার। শুধু টাকা জমাবেন না; টাকারও একটি কর্মজীবন গড়ে দিন। কারণ, মুদ্রাস্ফীতি কখনো এক দিনে মানুষকে দরিদ্র করে না। সে প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের স্বপ্ন, আমাদের সঞ্চয় এবং আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা থেকে কিছু অংশ কেড়ে নেয়।

  • নাসরিন জাহান সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি

    মতামত লেখকের নিজস্ব