মিয়ানমার ও চীনের পতাকা
মিয়ানমার ও চীনের পতাকা

আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণ

মিয়ানমারের নির্বাচনে যখন চীন জিতে যায়

১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তি হলো। মিয়ানমারের নির্বাচন–পরবর্তী সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব

গত লেখায় আমরা দেখিয়েছি, জাতীয় নির্বাচন শেষ করতে পারায় মিয়ানমারে সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে দ্বিস্তরবিশিষ্ট একটা ক্ষমতাকাঠামো গড়ে তুলতে যাচ্ছে। এর প্রকাশ্য অংশ হবে তাদের নিয়ন্ত্রিত সাবেক জেনারেল ও ব্যবসায়ীদের বেসামরিক সরকার এবং অপরটা হবে তারা নিজেরাই। এ রকম কৌশলী শাসনকাঠামো চীন ও রাশিয়াকে বহির্বিশ্বে ‘তাতমাদো’র পক্ষে থাকতে স্বস্তিকর পথ করে দেবে।

 সামরিক জান্তা বিশেষভাবে আসিয়ান জোটকে তাদের ব্যাপারে নমনীয় করতে আগ্রহী। ১১–দেশীয় এই জোট নির্বাচনে মিয়ানমারে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি এবং বলেছে নির্বাচনের ফলাফলকে নয়, নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চায় তারা। তবে নির্বাচন যেভাবে মোটামুটি কম সহিংসতার ভেতর হলো, তাতে আসিয়ানে মিয়ানমার সরকারের কথা বলার জোর বাড়বে।

মিয়ানমারের ভেতরে অনেকের ধারণা, নতুন সরকারে প্রেসিডেন্ট পদে মিন অং হ্লাই–ই বসবেন। ৭০ বছর বয়সী জেনারেল এখন এই পদে ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে আছেন। আগামী দিনে তিনি উর্দির ভারমুক্ত হয়ে সেখানে বসতে আগ্রহী। সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে থাকার সূত্রে ২০১১ সাল থেকেই কার্যত দেশটির প্রভু তিনি। ‘সরাসরি’ প্রেসিডেন্ট হয়ে তাঁকে কেবল অনুগত আরেকজন সেনাপ্রধান খুঁজে পেতে হবে।

রাখাইনদের উদ্বেগ

নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে আছে আরাকানের রাখাইনরা। জান্তার অবরোধ এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত আক্রমণে প্রায় ৩৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের প্রদেশটিতে অবকাঠামো, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষাব্যবস্থাসহ অনেক কিছু বিপর্যস্ত। নতুন করে সামরিক অভিযানে প্রদেশজুড়ে মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়বে।

আরাকানে সামরিক বাহিনীর নির্বাচনী আয়োজন অনেকখানি ব্যর্থ হয়েছে। ১৭টি প্রদেশের মধ্যে মাত্র তিনটি টাউনশিপে নির্বাচন হয়। স্থানীয় দুটি দল (আরাকান ফ্রন্ট পার্টি ও রাখাইন ন্যাশনালিটিজ পার্টি) নির্বাচনে অংশ নেয়। তিনটি আসনের মধ্যে কেবল আরএনপি মনাং টাউনশিপের আসনটি পায়। বাকি দুই আসন জান্তা সমর্থক ইউএসডিপি পেয়েছে বলে প্রচার করা হয়।

প্রদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আরাকান ন্যাশনাল পার্টি কিংবা আরাকান লিগ ফর ডেমোক্রেসি কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচন হওয়া তিনটি টাউনশিপেও ভোট খুব কম পড়েছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে নেপিডোর শাসকদের রাজনৈতিক সমর্থন নগণ্য। নির্বাচিত তিন সংসদ সদস্যকে অনেক রাখাইন ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলছে। এ রকম অবস্থায় ‘তাতমাদো’ এবং তাদের বেসামরিক সরকার আগামী দিনে আরাকানের প্রতিপক্ষকে রাজনীতির বদলে সামরিকভাবেই মোকাবিলা করতে চাইবে। এটা করতে গিয়ে ‘তাতমাদো’ রোহিঙ্গাদেরও আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নিজের পাশে দেখতে চায়; যদিও এই রোহিঙ্গারা তাদের দ্বারাই ২০১৭ সালে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

তবে মিয়ানমার এমন এক গেরিলা জনপদ, সেখানে শত্রুমিত্রের সমীকরণ মৌসুমি আবহাওয়ার মতো হামেশা পাল্টে যায়। যেমন সম্প্রতি আরাকানের চিন প্রদেশ সংলগ্ন পালেতোয়া অংশে খুমিদের নতুন একটি সংগঠনের সশস্ত্র রূপান্তর ঘটছে, যারা এই অঞ্চল থেকে আরাকান আর্মিকে সরাতে চায়। এটা ভবিষ্যতে রাখাইন গেরিলাদের জন্য নতুন সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এই খুমিদের সঙ্গে জাতিগত সূত্রে বান্দরবানের নাড়ির যোগ আছে।

এ রকম সব মিলে, নির্বাচন–পরবর্তী পরিবেশে আরাকানে যদি আরাকান আর্মি ও তাতমাদোর সংঘাত বাড়ে এবং একই সময় যদি সশস্ত্র রোহিঙ্গা ও খুমিরা উত্তর আরাকান ও পালেতোয়ায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে চতুর্মুখী সহিংসতায় বাংলাদেশের দিকে আরেক দফা শরণার্থী ঢেউ আসতে আরে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশে ১৮ মাস বয়সী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদও শেষ হতে চলেছে। এ সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর অনেক ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। আগামী রমজানের ঈদ রোহিঙ্গারা আরাকানে করবে বলে আশাবাদ ছড়ানো হলেও কার্যত সেই লক্ষ্যে অগ্রগতি কিছু হয়নি; বরং এর মাঝে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির সম্পর্কে আরও অবনতি ঘটেছে। একাধিক সংঘর্ষে পারস্পরিক আস্থাহীনতা আরও বেড়েছে তাদের।

কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোর পরিবর্তিত পরিস্থিতিও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকারের বিশেষ মনোযোগ দাবি করছে। শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারা নিজ সমাজের অন্তত চারটি আধা সামরিক বাহিনীর ছায়ায় জীবন যাপন করে। এসব সংগঠনের আদর্শ, লক্ষ্য এবং কর্মকাণ্ডের ধরনে রয়েছে নানামুখিতা।

কেউ কেউ উত্তর আরাকানে একটা ধর্মভিত্তিক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বাংলাদেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে আরও এক ধাপ বেশি উৎসাহী। অন্তত একটি জাতীয় দল গত এপ্রিলে চীনের সফররত প্রতিনিধিদের কাছে আরাকানে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। এ রকম প্রকল্প যে বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক অনেক ‘নন-স্টেট-অ্যাক্টর’কে এখানে টেনে আনবে, সে বিষয় ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকদের জন্য নিশ্চিতভাবে একটা স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ হবে।

তবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মরিয়া চেষ্টা যদি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকারে না আসে, তাহলে দক্ষিণ সীমান্ত মাদক ব্যবসায়ীদের আরও স্বর্গরাজ্য হয়ে পড়বে। প্রথম আলোতে গত ২৫ জানুয়ারি এক গবেষণা উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, ৮২ লাখ মানুষ নানা ধরনের মাদকে আসক্ত বাংলাদেশে। এর মাঝে ইয়াবা গ্রহণকারী আছেন ২৩ লাখ। দক্ষিণ সীমান্তের খোলামেলা ধরনের পার্শ্বফল হিসেবে বাংলাদেশ এরই মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক মাদক আগ্রাসনের শিকার। মিয়ানমারের গেরিলা সংগঠনগুলোর আয়ের বড় উৎস মাদক উৎপাদন ও বিক্রি। সেখানে গৃহযুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়া মানেই বাংলাদেশকে মাদকসুনামি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জে থাকতে হবে।

এর মাঝে আন্তর্জাতিক কিছু সংগঠন ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে আবার কক্সবাজারে আনার জন্য চাপ দিচ্ছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটসকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ রকম দাবি তুলতে দেখা যায়। তারা রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতার দাবি তুলেছে। এ রকম দাবির শঙ্কার দিক হলো, রোহিঙ্গাদের সাগরপথে অবৈধ দেশান্তর তাতে বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের স্থায়ী হওয়ার ধারাও বাড়তি গতি পাবে।

২০২১–এর সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘ ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের দেখাশোনার কাজে যুক্ত রয়েছে। সে সময় এ কাজে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের এক দফা সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও সেখানকার কার্যক্রমে যুক্ত। তারপরও কেন এখন এই শিবির বন্ধ করতে বলা হচ্ছে, সেটা বেশ অস্পষ্ট। বিগত মাসগুলোতে অবশ্য ভাসানচর থেকে নিয়মিত রোহিঙ্গাদের পলায়নের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় নানা স্থানে ভাসানচর থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দেখা মিলছে। মে ও জুন মাসে এ রকম দুটি দলকে ওই দুই জায়গায় শনাক্ত করা হয়।

জান্তার পাশে চীন-রাশিয়া ছাড়াও ইরান-পাকিস্তান

প্রায় ৯ বছর ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা এবং দক্ষিণ সীমান্ত নিয়ে মিয়ানমার সরকারের নানা পদক্ষেপে বাংলাদেশ ভোগান্তির মুখে থাকলেও বিদেশি অনেক শক্তি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বন্ধুর ভূমিকায় আছে। এ ক্ষেত্রে চীনের পাশাপাশি এত দিন ছিল রাশিয়া, নতুন করে তাতে শামিল হচ্ছে ইরান ও পাকিস্তানও।

সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনের মাঝেই দেশটির সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারের সঙ্গে পাকিস্তান কিছু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। সু চি ও তাঁর দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পরের বছর ডিসেম্বরে কর্নেল ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের একটা সামরিক প্রতিনিধিদল নেপিডো সফর করে। এরপর মিয়ানমারের ১০ সদস্যের একটি বিমানসেনা দল চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণে পাকিস্তানে যায়। পরের বছর থেকেই মিয়ানমারের গেরিলা অঞ্চলগুলোর ওপর সরকারের আক্রমণের প্রধান ধরন হয়ে ওঠে বিমান হামলা। গেরিলারা প্রায়ই এই দুই ঘটনার আন্তসম্পর্কের কথা বলে।

এরও আগে মিয়ানমার পাকিস্তান থেকে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে। মিয়ানমার হলো পাকিস্তান থেকে এ রকম বিমান ক্রয়কারী প্রথম দেশ। এই বিমানগুলো পাকিস্তানে উৎপাদিত হচ্ছে গণচীনের যৌথ অংশীদারত্বে। উল্লেখ্য, আরাকান থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের অন্তত দেড় লাখ পাকিস্তানেও রয়েছেন।

চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের পাশাপাশি সম্প্রতি ইরানও মিয়ানমারের জান্তার অন্যতম আন্তর্জাতিক সহযোগী রাষ্ট্র হয়ে উঠছে। বিমান হামলা অব্যাহত রাখতে জেট ফুয়েল পাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিমানবাহিনীকে যে ইরান সহায়তা করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে রয়টার্স গত ২৬ জানুয়ারি। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪–এর অক্টোবর থেকে ২০২৫–এর ডিসেম্বরের মাঝে ইরান মিয়ানমারের জান্তাকে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহ করেছে।

পাকিস্তান ও ইরানের পাশাপাশি জান্তার পুরোনো মিত্র চীন ও রাশিয়া আগের চেয়েও জোরদারভাবে পুরোনো ভূমিকায় আছে। তারা সব সময় বিশ্বকে এটা দেখাতে চায়—সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা ছাড়া মিয়ানমার টিকে থাকতে অক্ষম। মিয়ানমারের সর্বশেষ নির্বাচনও মূলত চীনেরই কাজে লাগবে বেশি। সে জন্য অনেক ভাষ্যকার এ–ও বলছেন, এই নির্বাচনে চীনই জিতেছে! এই নির্বাচন দেশটিতে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ যত দৃঢ় করবে, তত এখানকার খনিজ নিয়ে চীনের একচেটিয়া বাণিজ্য ঝামেলামুক্ত থাকবে।

২০২৩-এ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার মুখে চীন কিছুদিন গেরিলা অগ্রযাত্রা নীরবে দেখছিল। কিন্তু বাংলাদেশে পশ্চিমা পছন্দের সরকার আসামাত্র তারা মিয়ানমারে জান্তাকে সহায়তা বাড়িয়ে দেয় এবং গেরিলাদের সরবরাহ লাইনে বাধা দিতে থাকে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে ঢাকার অতি আগ্রহও মিয়ানমারে চীনকে বাড়তি সতর্ক হতে প্ররোচিত করে।

এর পাশাপাশি বেইজিং মিয়ানমারের সঙ্গে তার সীমান্ত এলাকাগুলো থেকে গেরিলা গোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধ সরিয়ে জান্তার নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও। শান প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ লাসিও শহর থেকে গেরিলাদের সরে যেতে বাধ্য করেছে তারা কিছুদিন আগে। সীমান্তবর্তী খনিজ উত্তোলক স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোও বেইজিংয়ের চলতি খবরদারি মেনে নিচ্ছে এ কারণে যে তাদের পণ্যের বাজার মূলত চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর। বিশ্বের অন্য অংশের দেশগুলোর সঙ্গে এখানকার খনিজ পণ্যের বাজার যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি আজও। চীনই সেই ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে দেয়নি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বার্মা অ্যাক্ট করে দেশটির গণতন্ত্রের সংগ্রামে তথাকথিত সহযোগিতার ইঙ্গিত দিলেও কার্যত মাঠপর্যায়ে সে রকম কিছু করেনি। এ রকম অবস্থায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রপন্থীদের মাঝে এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে, নিজ পায়ে দাঁড়িয়েই তাদের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম করতে হবে। নবগঠিত আরএসএ জোট এটাও মনে করছে, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি গণচীনও তাদের সংগ্রামকে বিভক্ত করতে চায়।

গেরিলাদের দিক থেকে ভারতের বিষয়েও গভীর অসন্তুষ্টি আছে। নির্বাচনকালেই নেপিডোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত অভয় ঠাকুর দেশটির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল চাও সার লিনের সঙ্গে বৈঠক করে সম্পর্ক উন্নয়নের আশাবাদ ব্যক্ত করে এসেছেন। একই সময়ে নয়াদিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ‘মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’কে সাধুবাদ জানিয়েছে। বলা যায়, আসন্ন বেসামরিক সরকারকে বেশ আগ বাড়িয়ে স্বাগত জানিয়ে রেখেছে ভারত।

বাস্তবে মিয়ানমারের সরকার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব যে মাত্রায় রয়েছে, তাতে ভারতের জন্য সেখানে দরকারি হয়ে ওঠার সুযোগ কম। ভারত এমনকি গেরিলা দলগুলোকেও সহায়তা করতে পারে না; কারণ তাতে উত্তর–পূর্ব ভারতের ‘স্বাধীনতাকামী’দের সহায়তার মাধ্যমে নেপিডোর জেনারেলরা প্রতিশোধ নিতে পারের। তবে মিজো নেতাদের মাধ্যমে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকেরা আরাকান, চীন ও কাইয়া প্রদেশের গেরিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। আরাকান আর্মিকে মিজোরামে কৃষিপণ্যের বাজারসুবিধা দিতেও আপত্তি নেই তাদের—যা প্রথমোক্তদের জন্য বাংলাদেশের বিকল্প একটা অর্থ আয়ের জায়গা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের মিয়ানমারনীতি কোথায়

বাংলাদেশ এখনো আরাকান আর্মির ব্যাপারে যেমন সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি–অবস্থান নিতে পারেনি, তেমনি রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভবিষ্যতে কী করবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট আভাস মিলছে না। টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের জেলেরা বিগত কয়েক মাসে আরাকান আর্মির হাতে যেভাবে ক্রমাগত আটক বা আক্রান্ত হয়ে চলেছে, তা–ও এক উদ্বেগের বিষয়।

এর মাঝে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের একাধিক দেশের ‘সাংস্কৃতিক সহায়তা’য় আশ্রয়শিবিরগুলোতে স্পষ্টতই র‍্যাডিক্যালাইজেশন বাড়ছে—যা নাফের অপর পারে বৌদ্ধ রাখাইনদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সহাবস্থানের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে। শিবিরগুলোতে কিছু কিছু দেশের আর্থিক, ভাবাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতায় নজরদারিও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে—যদিও রাজনীতিবিদেরা এসব বিষয়ে কতটা সতর্ক, সে সম্পর্কে দাঁড়িপাল্লা বা ধানের শীষের নির্বাচনী প্রচারণায় স্পষ্ট কোনো ধারণা মেলেনি।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

প্রথম পর্ব: মিয়ানমারে নির্বাচন শেষে যে রাজনৈতিক মোড়বদল ঘটছে