কাদা-জলে তলিয়ে যাওয়া রাস্তায় হতাহত ও জীবিত ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারীরা এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করছেন। দেবঘাট, নুয়াকোট, নেপাল, ২৬ আগস্ট
কাদা-জলে তলিয়ে যাওয়া রাস্তায় হতাহত ও জীবিত ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারীরা এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করছেন। দেবঘাট, নুয়াকোট, নেপাল, ২৬ আগস্ট

মতামত

নেপালের ভূমিকম্প ও ভূমিধস: বাংলাদেশকে এখনই যা করতে হবে

২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্প এবং ২০২৬ সালের নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী ভয়াবহ ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষপ্রবাহ ও আকস্মিক বন্যা—দুটি ভিন্ন প্রকৃতির দুর্যোগ হলেও এগুলোর মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। তা হলো—অন্যের সহায়তা গ্রহণের আগে একটি রাষ্ট্রকে নিজের সক্ষমতা, প্রয়োজন এবং সীমাবদ্ধতা জানতে হয়।

২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের প্রবল কম্পনে শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা, বসতবাড়ি, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও সরকারি অবকাঠামো ধসে পড়ে। প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।

সেদিন নেপাল শুধু ভূমিকম্পের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেনি; তাকে একই সঙ্গে উদ্ধার, চিকিৎসা, ত্রাণ, তথ্য, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও দুর্যোগ-কূটনীতির একটি জটিল যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছিল।

ভূমিকম্পের পর বিশ্বজুড়ে বিরাট মানবিক সাড়া সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের সমন্বয় ব্যবস্থায় ৩১টি দেশের ৭৬টি আন্তর্জাতিক আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (উসার) দল নেপালে নিবন্ধিত হয়। এসব দলে ছিলেন প্রায় ১ হাজার ৮৭২ জন উদ্ধারকর্মী এবং ১১৮টি অনুসন্ধানী কুকুর। অনুসন্ধান, উদ্ধার, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তাকারী দল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি শতাধিক দলে পৌঁছে যায়।

মানবিক সংহতির দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে অনন্য। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা আবেগের চেয়ে অনেক কঠিন। বিপুলসংখ্যক দল কোনো দেশে পৌঁছানো মানেই যে বিপুলসংখ্যক জীবন রক্ষা পাবে, এমন সরল সমীকরণ বাস্তবে কাজ করে না। একটি উদ্ধারকারী দল কতজন সদস্য নিয়ে এসেছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দলটি কী করতে পারে, কত দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে, কী ধরনের সরঞ্জাম এনেছে এবং কতক্ষণ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে মাঠে থাকতে পারে।

নেপালে আসা দলগুলোর সক্ষমতাও সমান ছিল না। কোনো দল কে-৯ বা অনুসন্ধানী কুকুর ব্যবহার করে জীবিত মানুষের সন্ধানে দক্ষ ছিল; কোনো দল জরুরি চিকিৎসা, রোপ রেসকিউ কিংবা হালকা উদ্ধারকাজে বিশেষজ্ঞ ছিল। কিছু দল নিজ দেশের নিখোঁজ নাগরিক, পর্যটক ও পর্বতারোহীদের সন্ধানে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল। কিন্তু ভারী রিইনফোর্সড কংক্রিট ভেঙে গভীর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধারের জন্য যে হেভি উসার এবং ডিপ-কলাপস রেসকিউ সক্ষমতা প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

একটি বহুতল কংক্রিট ভবন ধসে পড়লে শুধু হাতুড়ি, শাবল কিংবা জনবল দিয়ে কার্যকর উদ্ধার পরিচালনা করা যায় না। প্রয়োজন হয় কংক্রিট কাটা, দেয়াল ও মেঝে ছিদ্র করা, ভারী ধ্বংসাবশেষ উত্তোলন, অস্থিতিশীল কাঠামোকে শোরিংয়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে নিরাপদ রাখা, টানেল তৈরি, সংকীর্ণ স্থানে প্রবেশ এবং শব্দ, ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করার দক্ষতা। পাশাপাশি প্রয়োজন হয় কাঠামোগত প্রকৌশলী, উদ্ধারস্থলে চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রশিক্ষিত জনবল এবং একটি নির্ভরযোগ্য কমান্ড ব্যবস্থা।

নেপালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেল, কখনো একই কর্মস্থলে একাধিক দল উপস্থিত হয়েছে, আবার কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় দল পৌঁছাতে পারেনি। অসম্পূর্ণ তথ্য, ভাষাগত সমস্যা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত চাপ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়গত সীমাবদ্ধতা বহু দলের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। কোনো কোনো দলকে কাজ দেওয়ার আগেই তাদের অবস্থান, সক্ষমতা ও প্রয়োজন বোঝার জন্য মূল্যবান সময় ব্যয় করতে হয়েছে।

এখানেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি কঠিন সত্য সামনে আসে: দুর্যোগস্থলে দলের সংখ্যা জীবন বাঁচায় না; সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে, সঠিক দক্ষতা ও সরঞ্জামসম্পন্ন দলকে নিয়োগ করাই জীবন বাঁচায়।

উদ্ধার করা এক বাসিন্দাকে সেনাশিবিরে নিয়ে যাচ্ছেন সেনাসদস্যরা। বাত্তার বাজার, নুয়াকোট, নেপাল

ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সাধারণত জীবিত মানুষ উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলা হয়। তবে এটিকে জীবনের জন্য কোনো কঠোর শেষসীমা ভাবা ঠিক নয়। ধ্বংসস্তূপে বাতাসের প্রবাহ, পানির প্রাপ্যতা, আবহাওয়া, আঘাতের ধরন এবং আটকে পড়া ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ সময় পরও জীবিত উদ্ধারের নজির রয়েছে। তবু সময় যত অতিক্রান্ত হয়, সম্ভাবনা তত কমে এবং উদ্ধার তত কঠিন হয়।

বিদেশি দলকে নিজ দেশ থেকে প্রস্তুত হয়ে বিমানযোগে আসতে হয়। এরপর অবতরণ, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, সরঞ্জাম ছাড়, নিবন্ধন, ব্রিফিং, দায়িত্ব বণ্টন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া রয়েছে। বিমানবন্দর, সড়ক কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই বিলম্ব আরও বাড়ে। ফলে সবচেয়ে মূল্যবান প্রাথমিক সময়টিতে উদ্ধার করেন স্থানীয় মানুষ—প্রতিবেশী, স্বেচ্ছাসেবক, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসাকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসন।

অর্থাৎ বড় দুর্যোগে প্রথম উদ্ধারকারী কোনো বিদেশি বিশেষজ্ঞ নন; প্রথম উদ্ধারকারী প্রায় সব সময়ই একজন প্রতিবেশী।

জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে গেলে দুর্যোগের মানবিক দায়িত্বও শেষ হয় না। বরং তখন শুরু হয় আরও কঠিন, বেদনাদায়ক এবং মানসিকভাবে চাপপূর্ণ একটি পর্যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মরদেহ সময়ের সঙ্গে পচে, বিকৃত বা খণ্ডিত হতে পারে। সেগুলো নিরাপদে উদ্ধার, পরিচয় নির্ধারণ, সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে সম্মানজনকভাবে হস্তান্তর করা অত্যন্ত জটিল কাজ।

জীবিত উদ্ধারকেন্দ্রিক অনেক আন্তর্জাতিক দল ডিজাস্টার ভিকটিম আইডেন্টিফিকেশন (ডিভিআই) বা দীর্ঘমেয়াদি মরদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুত থাকে না। তাদের দায়িত্ব ও সরঞ্জাম মূলত জীবিত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং উদ্ধার করার জন্য নির্মিত। ফলে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা শেষ হলে তাদের অপারেশনও শেষ হওয়ার দিকে যায়।

কিন্তু মৃতের প্রতি দায়িত্ব কোনোভাবেই জীবিতের চেয়ে কম মানবিক নয়। মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্তকরণ মানবিক মর্যাদা, ধর্মীয় অধিকার, আইনগত প্রমাণ, বিমা, উত্তরাধিকার এবং স্বজনদের মানসিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত। পরিচয়হীনভাবে মরদেহ দাফন কিংবা তাড়াহুড়া করে গণকবর দেওয়া ভবিষ্যতে গভীর আইনগত ও পারিবারিক সংকট তৈরি করতে পারে।

তাই বড় দুর্যোগে প্রথম দিন থেকেই পৃথক মরদেহ ব্যবস্থাপনা দল, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, নম্বরযুক্ত বডি ব্যাগ, আলোকচিত্র ও অবস্থান নথিবদ্ধকরণ, অস্থায়ী মর্গ, রেফ্রিজারেটেড সংরক্ষণ এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার প্রস্তুত রাখা জরুরি। দুর্যোগে মৃত মানুষের নাম হারিয়ে যেতে দেওয়া রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার আরেক রূপ।

২০১৫ সালে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক উদ্ধারসম্পদ নেপালে উপস্থিত হওয়ার পর দেশটির সরকার ২৭ এপ্রিল নতুন বিদেশি উসার দলগুলোকে আর যাত্রা না করার অনুরোধ জানায়। ৩ মে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারপর্ব সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর দলগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা হয়, যাতে রাষ্ট্রের মনোযোগ জীবিত অনুসন্ধান থেকে ত্রাণ, আশ্রয়, চিকিৎসা, পানি, স্যানিটেশন, পুনর্বাসন ও প্রাথমিক পুনরুদ্ধারে স্থানান্তর করা যায়।

আকস্মিক বন্যার পর নদীর তীরে কাদাপানিতে আংশিক তলিয়ে রয়েছে ঘরবাড়ি। সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলী বাজার, নুয়াকোট, নেপাল। ২৬ আগস্ট ২০২৬

এ সিদ্ধান্তকে বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দুর্যোগের প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন বদলে যায়। প্রথম দিকে প্রয়োজন উদ্ধার দল ও চিকিৎসা; পরে প্রয়োজন আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জনস্বাস্থ্য, ধ্বংসাবশেষ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো পুনঃস্থাপন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধার। প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও উদ্ধার দল ধরে রাখা বিমানবন্দর, আবাসন, পরিবহন, জ্বালানি ও প্রশাসনের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে।

তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানের কারণে নেপালে বিদেশি উপস্থিতি সব সময়ই সংবেদনশীল। বড় শক্তিগুলোর মানবিক সহায়তার সঙ্গে কখনো দৃশ্যমানতা, কূটনৈতিক প্রভাব, সরঞ্জাম সরবরাহ কিংবা ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন প্রকল্পে অংশগ্রহণের আগ্রহ যুক্ত হতে পারে। কিন্তু শুধু এই প্রতিযোগিতার কারণেই ২০১৫ সালে বিদেশি দলকে ফিরে যেতে বলা হয়েছিল—এমন দাবি নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠিত নয়। মূল সমস্যা ছিল বিপুল বিদেশি উপস্থিতিকে গ্রহণ, নিবন্ধন, যাচাই, দায়িত্ব প্রদান, নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো প্রত্যাহার করানোর সক্ষমতা।

২০২৬ সালের নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী বিপর্যয়ে ২০১৫ সালের সেই তিক্ত শিক্ষার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট। এটি শুধু একটি সাধারণ ভূমিধস ছিল না; প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ-পাথরধস, হিমবাহজাত ধ্বংসাবশেষপ্রবাহ এবং আকস্মিক বন্যার সম্মিলিত ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির প্রবাহ জনপদ, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সীমান্ত অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়।

ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ অনুসন্ধান ও উদ্ধার সহায়তার প্রস্তাব দিলেও নেপাল তাৎক্ষণিকভাবে বিদেশি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি। নেপাল সরকারের বক্তব্য ছিল, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পরিচালনায় সক্ষম এবং তখন বিদেশি উদ্ধার দলের প্রয়োজন নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন নাগরিক নিখোঁজ থাকায় দেশটি উদ্ধার দল পাঠাতে আগ্রহী হলেও নেপাল তার জাতীয় সংস্থাগুলোর ওপর আস্থার অবস্থান বজায় রাখে।

এটি কি আত্মনির্ভরতা, নাকি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস? উত্তর নির্ভর করবে বাস্তব সক্ষমতা এবং উদ্ধার ফলাফলের ওপর। নিজস্ব বাহিনীর সক্ষমতা থাকলে বিদেশি দল না নেওয়া একটি বৈধ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুধু জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা-সন্দেহ কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সহায়তা প্রত্যাখ্যান করলে সেটি আত্মনির্ভরতা নয়—ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা।

সহায়তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আবেগ, অহংকার কিংবা কূটনৈতিক চাপের ভিত্তিতে নয়; পেশাগত মাল্টিসেক্টর র‍্যাপিড নিডস অ্যাসেসমেন্ট-এর ভিত্তিতে নিতে হবে। কোন এলাকায় কী ধরনের সক্ষমতার ঘাটতি আছে, কত মানুষ নিখোঁজ, স্থানীয় দল কতক্ষণ কাজ করতে পারবে, কী সরঞ্জাম প্রয়োজন এবং বিদেশি দলের উপস্থিতি বাস্তবে কতটা মূল্য যোগ করবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে।

দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ নির্মম আয়নার মতো। সেখানে রাষ্ট্রের বক্তৃতা নয়, প্রস্তুতির প্রকৃত চেহারা প্রতিফলিত হয়। মহাভূমিকম্পের পর প্রথম আর্তনাদ শোনা গেলে দূরদেশের বিমানের জন্য অপেক্ষা করার সময় থাকবে না। প্রথমে এগিয়ে আসবেন পাশের বাড়ির মানুষ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী ও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের সদস্যরা। বিদেশি বিশেষজ্ঞ আসবেন পরে—বিশেষ ঘাটতি পূরণ করতে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা।

ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটে বড় ভূমিকম্প হলে একই সঙ্গে হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরু ও বাধাগ্রস্ত সড়ক, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন, খোলা জায়গার অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড, হাসপাতালের ক্ষতি এবং যোগাযোগ–বিচ্ছিন্নতা উদ্ধার অভিযানকে ভয়াবহভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। বিমানবন্দর, বন্দর, সেতু কিংবা প্রধান মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি দল ও ভারী সরঞ্জাম আসার আগেই জীবিত উদ্ধারের সবচেয়ে মূল্যবান সময় পেরিয়ে যেতে পারে।

অতএব, বিদেশি উদ্ধারকারী দলের ওপর নির্ভরতাকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি বানানোর সুযোগ নেই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের হেভি উসার দল গঠন করতে হবে। তাদের কাটিং, ব্রেকিং, ব্রিচিং, শোরিং, লিফটিং, টানেলিং এবং কনফাইন্ড স্পেস রেসকিউ সক্ষমতা থাকতে হবে। প্রতিটি দলকে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও আবাসনসহ অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করার উপযোগী করতে হবে।

কে-৯ অনুসন্ধান, প্রযুক্তিনির্ভর জীবিত শনাক্তকরণ, রোপ রেসকিউ, জরুরি চিকিৎসা এবং কাঠামোগত প্রকৌশল মূল্যায়নকে একক কমান্ডে আনতে হবে। একটি স্থায়ী ন্যাশনাল উসার কো-অর্ডিনেশন সেল, জাতীয় ডিভিআই ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় অপারেশনাল তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। বিমানবন্দরে বিদেশি দলের জন্য রিসেপশন অ্যান্ড ডিপারচার সেন্টার, দ্রুত ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস ছাড় এবং বিকল্প বিমানবন্দর, স্থলপথ ও সমুদ্রপথ ব্যবহারের পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত রাখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি লাইট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল গঠন করা। কারণ, একটি মহাভূমিকম্পে জাতীয় বাহিনী প্রতিটি ধসে পড়া ভবনে প্রথম ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারবে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ অনুসন্ধান, প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা, হালকা উদ্ধার এবং তথ্য পাঠানোর প্রশিক্ষণ না দিলে আতঙ্কিত মানুষ নিজেরাই দ্বিতীয় দুর্যোগের শিকার হতে পারেন।

নেপালের শিক্ষা বিদেশি সহায়তার দরজা বন্ধ করা নয়। শিক্ষা হলো—দরজা কখন খুলতে হবে, কাকে প্রবেশ করতে দিতে হবে, তাকে কোথায় কাজে লাগাতে হবে এবং কাজ শেষ হলে কখন সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানাতে হবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা।

দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ নির্মম আয়নার মতো। সেখানে রাষ্ট্রের বক্তৃতা নয়, প্রস্তুতির প্রকৃত চেহারা প্রতিফলিত হয়। মহাভূমিকম্পের পর প্রথম আর্তনাদ শোনা গেলে দূরদেশের বিমানের জন্য অপেক্ষা করার সময় থাকবে না। প্রথমে এগিয়ে আসবেন পাশের বাড়ির মানুষ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী ও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের সদস্যরা। বিদেশি বিশেষজ্ঞ আসবেন পরে—বিশেষ ঘাটতি পূরণ করতে।

বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগ-প্রস্তুতির মূলনীতি তাই এখনই নির্ধারিত হওয়া উচিত—নিজস্ব সক্ষমতাই হবে প্রথম প্রতিরক্ষা; বিদেশি সহায়তা হবে প্রয়োজনভিত্তিক।

  • মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ অগ্নি, দুর্যোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।