যুক্তরাষ্ট্রে একটি অভিবাসী কেন্দ্রের বাইরে আশ্রয়প্রার্থীরা
যুক্তরাষ্ট্রে একটি অভিবাসী কেন্দ্রের বাইরে আশ্রয়প্রার্থীরা

মতামত

ডেমোক্র্যাটদের কেন অভিবাসন নিয়ে সোচ্চার হতে হবে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর দুই মাসের কম সময় বাকি। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নজিরবিহীনভাবে কমে গেছে। তাঁর অনুমোদনের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ শতাংশে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নীতির ওপর তাঁর আক্রমণ, অর্থনীতির দুরবস্থা, নিজের ও পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে। জরিপে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ‘খুব শক্তিশালী’ বলে মনে করেছেন। আর ইরান যুদ্ধে ৬৮ শতাংশ মানুষ বিরোধিতা করেছেন।

এসব কারণে এবং মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলকে শাস্তি দেওয়ার মার্কিন ভোটারদের প্রবণতার কারণে মনে হতে পারে, নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পেতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে তাঁদের অবস্থান শক্তিশালী। কিন্তু ব্যাপক জয় এখনো নিশ্চিত নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁদের পথে বাধা কোথায়?

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে অভিবাসন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল অবস্থান। পশ্চিমা দেশগুলোয় উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান নিয়ে গবেষণায় আগে সাধারণত বলা হতো অভিবাসন বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়।

অভিবাসনের সংখ্যা বাড়ার চেয়ে এর কারণে তৈরি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগই উগ্র ডানপন্থীদের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়াতে বেশি ভূমিকা রাখে। ডানপন্থী নেতারা যখন অভিবাসনকে ভোটারদের চাকরি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরতে সফল হন, তখনই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান সহকর্মীরা অভিবাসনকে আমেরিকান জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। নিজেদের তাঁরা দেখিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকদের রক্ষাকর্তা হিসেবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূলধারার মধ্য-বাম ও মধ্য-ডান দলগুলোর সামনে তিনটি পথ থাকে। তারা বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারে। ডানপন্থীদের বক্তব্য অনুকরণ করতে পারে। অথবা তাদের বক্তব্যের বিপরীতে নিজেদের পাল্টা যুক্তি তৈরি করতে পারে।

অভিবাসন আমেরিকার ঐতিহ্যের অংশ, এ কথা তুলে ধরলেও ইউরোপীয় ঐতিহ্য হারানোর ও চাকরি হারানোর ভয় কিছুটা কমেছে। আবার অধিকাংশ অভিবাসী আইন মেনে চলেন এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে কাজ করে দেশের নিরাপত্তায় অবদান রাখেন, এ কথা বললেও ইউরোপীয় পরিচয় দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা কমেছে।

অভিজ্ঞতা বলছে, মূলধারার দলগুলো সাধারণত প্রথম দুটি পথই বেছে নেয়। কিন্তু তাতে উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন কমে না। অভিবাসন নিয়ে মানুষের উদ্বেগ উপেক্ষা করলে বরং ডানপন্থীরা আরও সমর্থন পায়। আর তাদের বক্তব্য অনুকরণ করলে সেই বক্তব্যই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ফলে ভোটারদের কাছে অভিবাসন আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।

তাই তৃতীয় পথটি গুরুত্বপূর্ণ। ডানপন্থীদের অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের সরাসরি পাল্টা বয়ান কাজ করে কি না, তা জানতে আমরা সম্প্রতি রিপাবলিকান ভোটার ও রিপাবলিকানপন্থী স্বতন্ত্র ভোটারদের নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক জরিপ চালাই। একটি পাল্টা বয়ানে তুলে ধরা হয়, অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘ ইতিহাস এবং অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় তাঁদের অবদান। আরেকটিতে বলা হয়, অভিবাসন আমেরিকার নিজেদের সম্পর্কে বলা জাতীয় কাহিনিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফলাফল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানের ওপর জোর দেওয়া বক্তব্য অভিবাসন নিয়ে তিন ধরনের ভয়ই কমাতে সক্ষম হয়েছে। এগুলো হলো: অভিবাসীরা আমেরিকানদের চাকরি ও সরকারি সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে, তারা খ্রিষ্টান ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পরিচয়কে দুর্বল করছে এবং তারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

অভিবাসন আমেরিকার ঐতিহ্যের অংশ, এ কথা তুলে ধরলেও ইউরোপীয় ঐতিহ্য হারানোর ও চাকরি হারানোর ভয় কিছুটা কমেছে। আবার অধিকাংশ অভিবাসী আইন মেনে চলেন এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে কাজ করে দেশের নিরাপত্তায় অবদান রাখেন, এ কথা বললেও ইউরোপীয় পরিচয় দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা কমেছে।

মজার বিষয় হলো, এসব পাল্টা বক্তব্য মাগা ও নন-মাগা, দুই ধরনের রিপাবলিকান ভোটারের মধ্যেই অভিবাসনবিরোধী মনোভাব কমাতে পেরেছে। তবে পার্থক্যও আছে। মাগা ভোটারদের মধ্যে কেবল অর্থনৈতিক উদ্বেগ থাকা ব্যক্তিদের প্রভাবিত করা গেছে। তবে এই গোষ্ঠীই মাগা ভোটারদের সবচেয়ে বড় অংশ। অন্যদিকে নন-মাগা রিপাবলিকানদের মধ্যে ইউরোপীয় পরিচয় দুর্বল হওয়ার ভয় থাকা ভোটারদের ওপর এসব বক্তব্য বেশি কার্যকর হয়েছে। রিপাবলিকানপন্থী স্বতন্ত্র ভোটারদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও পরিচয়—দুই ধরনের ভয়ই কমেছে।

অ্যারিজোনা, জর্জিয়া, মিশিগান, নেভাদা, নর্থ ক্যারোলাইনা, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিন; গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোয়ও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। অভিবাসন অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি—রিপাবলিকানদের এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দেওয়া সম্ভব। অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানের কথা তুলে ধরা এবং আমেরিকার অভিবাসন ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া এতে কার্যকর হতে পারে। এমনকি কিছু মাগা ভোটারও অভিবাসনের অর্থনৈতিক সুফল স্বীকার করেন।

এখন পর্যন্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার কারণে এটি বোধগম্য। কিন্তু এই কৌশল সফল হলেও অভিবাসন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। রিপাবলিকান প্রার্থীদের অনেক সময় চরম ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যেরও জবাব দিতে হবে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চাইলে ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসন নিয়ে কথা বলতেই হবে। আর তা এমনভাবেও করা সম্ভব, যা রক্ষণশীল ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

  • ফিলিপ মিলাচিচ ফ্রিডরিখ এবার্ট ফাউন্ডেশনের ‘ডেমোক্রেসি অব দ্য ফিউচার’ কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক; এলি রাউ টেকনোলজিকো দে মনতেরের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক এবং সুসান স্টোকস শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও শিকাগো সেন্টার অন ডেমোক্রেসির ফ্যাকাল্টি পরিচালক

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ