তালেবান সরকারের কঠোর নিয়মের মধ্যে নিজেদের জীবনকে মানিয়ে নিতে গিয়ে ধীরে হলেও ফুঁসে উঠছেন নারীরা।
তালেবান সরকারের কঠোর নিয়মের মধ্যে নিজেদের জীবনকে মানিয়ে নিতে গিয়ে ধীরে হলেও ফুঁসে উঠছেন নারীরা।

মতামত

তালেবানের ‘দাসপ্রথার’ আইনে আসলে যা আছে

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রণীত তালেবানের ফৌজদারি কার্যবিধি নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তানের সামগ্রিক আইনব্যবস্থা ও মানবাধিকার বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এ উদ্বেগ অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে এসব প্রতিবেদনে যে দাবি ঘুরেফিরে আসছে, সেগুলোর সব কটি আইনটির প্রকৃত ভাষা, কাঠামো কিংবা আইনি কার্যকারিতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মূল পশতু পাঠটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যায়, আইনটি আসলে কী বলছে আর সেটির ব্যাখ্যায় কোথায় গিয়ে অতিরঞ্জন ঘটছে। এ দুইয়ের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য করা জরুরি।

আমি একজন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা পেশাজীবী হিসেবে বর্তমানে আফগানিস্তানে কাজ করছি। আমি পশতু ভাষায় দক্ষ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির মূল পশতু পাঠটি পর্যালোচনা করেছি। আইনটি বহুদিক থেকেই গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে বিচারকের ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার সুরক্ষা দুর্বল করে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সমস্যাজনক।

তবে একই সঙ্গে বলতে হয়, আইনটি নিয়ে যে সব চাঞ্চল্যকর দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর কিছু আইনটির লিখিত ভাষা যা বলে, তার চেয়ে বেশি আরোপ করে দেখানো হচ্ছে।

প্রথমত, কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ আইন ‘দাসপ্রথাকে বৈধতা’ দিয়েছে। এর ভিত্তি হিসেবে যে ‘ঘুলাম’ শব্দটির কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে ইংরেজিতে ‘স্লেভ’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। বাস্তবে পশতুতে ‘ঘুলাম’ শব্দের অর্থ ‘নির্ভরশীল’, ‘সেবক’ বা ‘পরিচারক’। মূল পাঠে ঘুলাম শব্দটি আজাদ অর্থাৎ স্বাধীন শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটি সাধারণ ধারায় এসেছে, যেখানে তাজির অর্থাৎ বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির আওতায় কোন কোন ব্যক্তি পড়বেন, তা বোঝানো হয়েছে।

আইনে অপরাধীর আর্থিক অবস্থা বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে তাজির শাস্তির ভিন্নতা অনুমোদন করা হয়েছে। অনেক প্রতিবেদনে এটিকে জাতভিত্তিক বা শ্রেণিভিত্তিক শাস্তিব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাস্তবে এ ধরনের পার্থক্য বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত হানাফি ফিকহি মতবাদের অংশ, যা তালেবানের অনেক আগের।

এ ভাষা মূলত শতাব্দীপ্রাচীন হানাফি ফিকহি শ্রেণিবিন্যাসের প্রতিফলন। এখানে দাসত্ব প্রতিষ্ঠা, দাস কেনাবেচা, মালিকানা, হস্তান্তর বা দাসের আইনি অবস্থান নির্ধারণের কোনো বিধান নেই। ফলে আইনটি দাসপ্রথা পুনঃপ্রবর্তন করেছে বা দাসত্বকে একটি ইতিবাচক আইনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কায়েম করেছে—এমন দাবি আইনটির পাঠের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, এটি একটি ফৌজদারি কার্যবিধি, পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য বিচারিক ক্ষমতা, আইনের উৎস এবং তাজির শাস্তির প্রয়োগসংক্রান্ত কাঠামো নির্ধারণ করা। এতে অপরাধের সম্পূর্ণ তালিকা নেই এবং কোরআনে নির্ধারিত শাস্তি বা হুদুদকে আইনি বিধান হিসেবে বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।

মুহারাবা–জাতীয় কিছু ধ্রুপদি অপরাধশ্রেণির উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির তালিকা নেই। তাই এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন দণ্ডব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করলে আইনটির প্রকৃত পরিসর ভুলভাবে তুলে ধরা হয়।

তৃতীয়ত, এ আইনে অপরাধীর আর্থিক অবস্থা বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে তাজির শাস্তির ভিন্নতা অনুমোদন করা হয়েছে। অনেক প্রতিবেদনে এটিকে জাতভিত্তিক বা শ্রেণিভিত্তিক শাস্তিব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাস্তবে এ ধরনের পার্থক্য বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত হানাফি ফিকহি মতবাদের অংশ, যা তালেবানের অনেক আগের। এখানে অপরাধীর অবস্থান শাস্তি নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড নয়, বরং অন্যান্য বিবেচনার সঙ্গে এটি একটি উপাদান মাত্র।

আধুনিক আইনি ব্যবস্থায় এ ধরনের পার্থক্য অবশ্যই সমস্যাজনক, কিন্তু এটিকে নতুন কোনো উদ্ভাবন হিসেবে দেখানো সঠিক নয়। এ ধারাবাহিকতা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাতে আইনটির আদর্শিক উৎস এবং পরিবর্তনের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়।

চতুর্থত, কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আইনটি অমুসলিমদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে বা তাদের অবিশ্বাসী হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়। পশতু পাঠে কাফির বা কুফফার শব্দ ব্যবহার করে অমুসলিম বা অহানাফিদের বিরুদ্ধে হামলার বৈধতা দেওয়া হয়নি।

ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো সামগ্রিক আইনি শ্রেণিও নির্ধারণ করা হয়নি। যেখানে বিশ্বাসসংক্রান্ত আচরণের কথা এসেছে, সেখানে তা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং ধর্মত্যাগের মতো নির্দিষ্ট কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াগতভাবে বিবেচিত হয়েছে। এতে পরিণতির কঠোরতা কমে না, তবে আইনটির কাঠামো বোঝার জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, নারীদের বিষয়ে যে ধারাগুলো রয়েছে, সেগুলো অনেক সময় প্রতিবেদনে সরাসরি অপরাধীকরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাস্তবে নারীদের চলাচল, পারিবারিক বিরোধ বা পারস্পরিক আচরণসংক্রান্ত বিষয়গুলো মূলত বিচারিক প্রক্রিয়া ও তাজির কাঠামোর ভেতরে রাখা হয়েছে, নতুন করে অপরাধ সংজ্ঞায়িত করে নয়।

বাস্তব প্রয়োগে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে, বিশেষ করে আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতায়। তবু এটাও বোঝা জরুরি যে এই আইন অপরাধের বিস্তৃত তালিকা তৈরির চেয়ে বিচারকের বিবেচনাধিকার বাড়ানোর মাধ্যমেই কাজ করে।

এসব কথা বলার উদ্দেশ্য আইনটির বিপদ কমিয়ে দেখানো নয়; বরং এর সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাগুলো রয়েছে সেখানে, যেখানে কিছুই স্পষ্ট করে বলা হয়নি। বিচারকের সীমাহীন ক্ষমতা, ন্যায়বিচারের ন্যূনতম নিশ্চয়তার অভাব, লিখিত আইনের বাইরে ফিকহি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরতা এবং ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকা এ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে।

স্বাধীন আদালত ও কার্যকর আইনজীবী ব্যবস্থা না থাকলে এই ফাঁকফোকরগুলো অবাধ অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

কিন্তু আইনের পাঠের বাইরে গিয়ে ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিলে এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো আড়াল হয়ে যায়। তাতে সমালোচনাও দুর্বল হয়। কারণ, আইনটি যা স্পষ্টভাবে বলেনি, তার দায় এর ওপর চাপানো হয়।

আফগানিস্তানের মতো প্রেক্ষাপটে, যেখানে অনুবাদের ঘাটতি, আদর্শগত অনুমান ও দ্রুত সংবাদচক্র সহজেই বিভ্রান্তিকর ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত করতে পারে, সেখানে সূক্ষ্ম ও নির্ভুল আইনি বিশ্লেষণ বিশেষভাবে জরুরি।

তালেবানের এই ফৌজদারি কার্যবিধি তাদের বিচারব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। শুধু এ কারণেই এটি গভীর নজরদারির দাবি রাখে। কিন্তু সেই নজরদারি শুরু হওয়া উচিত স্পষ্টতা দিয়ে যে আইনটি ঠিক কী বলছে, আইনি দৃষ্টিতে কীভাবে কাজ করছে এবং কোন জায়গা থেকে ব্যাখ্যা পাঠের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ পার্থক্য না করলে বিশ্লেষণ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

  • পল ব্রাউন আফগানিস্তানে কর্মরত আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাকর্মী।

    দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত