মতামত

সংসদে আইন পাস, জবাবদিহির প্রশ্ন ও এমপিদের ‘আনাড়িপনা’

যে সরকারের বয়স দুই মাসও হয়নি, তাকে শিশু সরকার বলেই অভিহিত করা যায়। আর শিশু সরকারের কাছ থেকে বয়স্কদের মতো পরিপক্ব আচরণ আশা করা যায় না, সেটাও আমরা মনে রাখছি।

তবে ভোরের আবহাওয়া দেখে যেমন বলা যায় দিনটি কেমন যাবে, সরকারের সূচনাপ্রহর দেখে অনুমান করা যায় তারা কী করবে। অন্তত সংস্কার নিয়ে বিএনপির মনোভাব মোটেই ইতিবাচক নয়।

অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ১৮ মাসের শাসনকালে যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু সরকার সেগুলোই পাস করছে, যেগুলো করলে রাজনৈতিকভাবে তারা লাভবান হবে। আর যেগুলোতে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে, সেগুলো হয় স্থগিত করেছে, না হয় রহিত করে দিচ্ছে ভবিষ্যতে ‘ভালো আইন’ করবে এই ‘দোহাই’ দিয়ে।

বাংলাদেশে ভালো আইনের অভাব নেই। কিন্তু ভালো শাসন পাওয়া দুর্লভ। আমাদের রাজনীতিকেরা বিরোধী দলে থাকতে সাচ্চা গণতান্ত্রিক, গণতন্ত্রের জন্য জান দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকে ভুলে যান।

বিএনপি ইতিহাসে সেরা ফল করেছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। এর আগেও তারা দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল; কিন্তু সে সময় বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। এখন জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই অনেকটা ফাঁকা মাঠ পেয়েছিল।

নানা হিসাব–নিকাশের কারণে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনে যে ফল করেছে, তার ধারাবাহিকতা স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনে থাকার সম্ভাবনা কম। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বগুড়া ও শেরপুরের দুটি আসনে উপনির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপিদলীয় প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।

বেসরকারি ফল অনুযায়ী বগুড়া-৬ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থীকে ৭৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জিতেছেন। অন্যদিকে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থীকে হারিয়েছেন লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু আসনে ব্যতিক্রম ছাড়া দুই দলের ভোটের ব্যবধান ছিল ২ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। এ থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, উপনির্বাচনে ক্ষমতার প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেটি পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

এই সংসদের বেশির ভাগ সংসদ সদস্য প্রথমবারের মতো এসেছেন। ফলে তাঁদের বিষয়টি জনগণ হয়তো কিছুটা সহানুভূতির সঙ্গে দেখবে। কিন্তু সেটা বেশি দিন নয়। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কে মনে রাখতে হবে, দু-চারজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান থাকলেই সংসদ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। সবাইকে কমবেশি ভূমিকা রাখতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) বিলটি পাস হয়। বিরোধী দল বিলটির বিরোধিতা করে। বিশেষ করে আইন করার আগেই সরকার যেভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থা তথা সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক বসিয়েছে, সেটা বিরোধী দলের মাথাব্যথার বড় কারণ।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বিরোধী দলের যুক্তি খণ্ডন করে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। তিনি বলেছেন, ‘আজকে তারা বিরোধিতার খাতিরে যদি বিরোধিতা করে, সেটি অন্য কথা। এই বিলের মধ্যে এই আইনটি যদি পাস না হয়, তাহলে পুরাতন জুলুমবাজরা আবার ওই চেয়ারে ফিরে আসবে।

দ্বিতীয়ত, এই আইনে বলা আছে দলীয় প্রতীকে ধানের শীষসহ জাতীয় প্রতীক যেগুলো রয়েছে, এই প্রতীকে আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে না। তাহলে এই আইনটি যদি পাস না হয়, তাহলে আমাদের আবার দলীয় প্রতীকে ফিরে যেতে হবে। আমাদের আবার ওই যে বিনা ভোটে যারা আওয়ামী লীগের মেয়র–কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিল, তাদেরকে সাত দিনের মধ্যে ওই চেয়ারে বসার সুযোগ করে দিতে হবে।’

প্রথমে সরকারকে একটি কারণে ধন্যবাদ দিই। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দলীয় প্রতীক বাদ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে এই বিধান জারি করে। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো যে পুরোপুরি ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, তার কারণও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন। এর ফলে স্থানীয় সরকার সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের (ক্ষমতাসীন) যে ন্যূনতম ফারাক ছিল, সেটাও ঘুচে যায়।

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন চালু হওয়ার পর তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে এবং আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো ‘প্রীতি ম্যাচ’ খেলে, যা ২০২৪–এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বহাল ছিল।

এই কঠিন ও করুণ বাস্তবতায় সংসদের সব দলই দলীয় প্রতীক না রাখার বিষয়ে একমত হয়। কিন্তু দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ এবং নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার বিধান যৌক্তিক কারণেই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।

বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন, সেটাও যথেষ্ট জোরদার মনে হয় না। আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে দক্ষিণের মেয়র পদে বসতে দেওয়া হয়নি; সেটা নিশ্চয়ই অন্যায় ছিল। কিন্তু সেই অন্যায়ের উদাহরণ দিয়ে সরকার সব সিটি করপোরেশনে দলীয় লোক বসাতে পারে না। যদি সংসদীয় আসনের ভিত্তিতে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়, তাতে বিরোধী দল এক–চতুর্থাংশ সংস্থায় প্রতিনিধিত্ব করার দাবি রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনেরা গণতন্ত্র বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনকেই বোঝেন। এখানে বলে রাখি, ঢাকা উত্তরে জাতীয় নাগরিক পার্টির একজন নেতাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় তারাও কম সমালোচিত হয়নি।

স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোতে দলীয় লোক বসানোয় যেমন বিএনপির ক্ষমতা বেড়েছে, তেমনি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন হলে সংসদেও তাদের শক্তিসংখ্যা আরও বাড়বে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা অন্তত ৩৫টি আসন পাবে। বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র মিলে পাবে ১৫টির মতো। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছেন এবং যাঁরা সংসদীয় কার্যক্রমে দক্ষতা দেখানোর মতো যোগ্যতা রাখেন, তাঁদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে।

বর্তমানেও সংসদে এমন অনেক প্রতিনিধি আছেন, যাঁরা প্রশ্ন ও প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন না, স্পিকারকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও আমরা দেখেছি, একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বিল উত্থাপন করতে গিয়ে কী ধরনের আনাড়িপনা দেখিয়েছেন। এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। সংবাদমাধ্যমে দেখেছিলাম, সংসদ নেতা দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। আসলে আমাদের নেতারা রাজপথে যতটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন, দলীয় সভায় উচ্চনিনাদে জনসভা কাঁপাতে পারেন, সরকার ও সংসদ পরিচালনায় ততটাই অদক্ষতার পরিচয় দেন। সবাই নন; ব্যতিক্রমও আছে।

এই সংসদের বেশির ভাগ সংসদ সদস্য প্রথমবারের মতো এসেছেন। ফলে তাঁদের বিষয়টি জনগণ হয়তো কিছুটা সহানুভূতির সঙ্গে দেখবে। কিন্তু সেটা বেশি দিন নয়। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কে মনে রাখতে হবে, দু-চারজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান থাকলেই সংসদ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। সবাইকে কমবেশি ভূমিকা রাখতে হয়।

  • সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি

    মতামত লেখকের নিজস্ব