
চীন থেকে প্রায় ১০০ মাইল প্রশস্ত একটি প্রণালি দ্বারা পৃথক হওয়ায়, সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে তাইওয়ান তার নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করে। বড় উভচর জাহাজে তাইওয়ান প্রণালি পার হয়ে আসা চীনা বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করার সক্ষমতা তাইওয়ানের থাকতে হবে।
ঐতিহ্যগতভাবে তাইওয়ান তার বহরের মূল ভিত্তি হিসেবে ডেস্ট্রয়ার ও ফ্রিগেটের মতো বড় জাহাজগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে, যা রাষ্ট্রীয় শক্তির দৃশ্যমান প্রতীক এবং চীনের চাপ মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
তাইওয়ানের বর্তমান জাহাজ নির্মাণ পরিকল্পনার মধ্যেও তাদের পুরোনো সারফেস বহরকে নতুন, বড় ও ব্যয়বহুল জাহাজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবু তাইওয়ান প্রণালির সংকীর্ণ জলসীমায় বড় সারফেস জাহাজগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যে সমস্যাটি প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ, এখন সেগুলোকে শনাক্ত করা, নজরদারিতে রাখা এবং আক্রমণ করা আরও সহজ। চীন অত্যাধুনিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রণালি, ড্রোন ও মিসাইলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
তাইওয়ানের বড় সারফেস জাহাজগুলো এখন তাদের জন্য একপ্রকার বোঝার মতো। তবে তাইওয়ানের একটি সুবিধাজনক দিক রয়েছে—এই একই প্রযুক্তি সংকুচিত জলসীমায় চীনের বড় উভচর জাহাজগুলোকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে এবং সেই জাহাজগুলোকে ছোট ও সহজে লুকিয়ে রাখা যায়, এমন বিকল্প দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
তাইপেই তাদের ডেস্ট্রয়ার ও ফ্রিগেটগুলোকে তুলনামূলক ছোট কিন্তু বিপুলসংখ্যক সারফেস কমব্যাট্যান্ট দিয়ে প্রতিস্থাপন করে এই বৈষম্যের সুযোগ নিতে পারে।
এই ছোট জাহাজগুলোর চীনা আক্রমণের প্রথম ধাক্কা সামলে টিকে থাকার এবং চীনা আক্রমণকারী বহরের ওপর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা অনেক বেশি।
তাইওয়ানের নৌবাহিনী বড় ধরনের সারফেস কমব্যাট্যান্টে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। চীনা হুমকির মুখে তাইওয়ান নৌবাহিনীর যে আমূল রূপান্তর প্রয়োজন, তাতে এই বড় জাহাজগুলো অন্যতম প্রধান বাধা।
তাইওয়ানের জন্য শিক্ষা হলো বড় যুদ্ধজাহাজের যুদ্ধক্ষমতা নিরর্থক যদি তারা লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় টিকে থাকতে না পারে এবং শুরুতে একটি জাহাজের ক্ষতি পুরো নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাইওয়ান প্রণালির যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য স্টেলথ (রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি) সুবিধা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ এই আকারের জাহাজ তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে আর এই সুবিধাগুলো ছাড়া চীনা আক্রমণকারী বাহিনীকে তাইওয়ান প্রণালি ব্যবহারে বাধা দেওয়ার যে মূল যুদ্ধকালীন মিশন, তাতে বড় জাহাজগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
বড় জাহাজে সম্পদ অপচয় না করে তাইপেইয়ের উচিত ৭০০ থেকে ১,০০০ টনের মধ্যে স্টেলথ কর্ভেট তৈরি করা।
মিসাইল ও ড্রোনে সজ্জিত এসব জাহাজ শনাক্ত করা ও লক্ষ্যবস্তু বানানো কঠিন, কিন্তু প্রণালি পার হতে যাওয়া চীনা জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালানোর মতো যথেষ্ট ফায়ারপাওয়ার বা সামরিক সক্ষমতা তাদের থাকবে।
বড় জাহাজগুলো জাতীয় ক্ষমতার শক্তিশালী প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সেগুলো সহজে লক্ষ্যবস্তু বানানো যায় এবং যুদ্ধে হারালে তার রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি দিতে হয়। যখন ভারী নজরদারির মধ্যে সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ যুদ্ধ করে, তখন তাদের এই দৃশ্যমানতা দ্রুত একটি প্রাণঘাতী দায়ে পরিণত হয়।
একটি বড় জাহাজের সলিল সমাধি তাৎক্ষণিক সামরিক ক্ষতির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। একটি অতি-দৃশ্যমান ও ব্যয়বহুল ক্ষতি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সংঘাত চলাকালে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ঝুঁকিতে ফেলার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক করে তুলতে পারে।
গত চার দশকের বেশি সময়ের প্রধান প্রধান নৌ সংঘাত নির্দেশ করে যে কোনো দেশের নৌবাহিনী যদি শত্রুর উপকূলের কাছে যুদ্ধ করার প্রত্যাশা করে, তবে ব্যয়বহুল ও অপূরণীয় যুদ্ধজাহাজকে কেন্দ্র করে বহর গঠন করার বিষয়ে তাদের সতর্ক হওয়া উচিত।
তাইওয়ানের জন্য শিক্ষা হলো বড় যুদ্ধজাহাজের যুদ্ধক্ষমতা নিরর্থক যদি তারা লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় টিকে থাকতে না পারে এবং শুরুতে একটি জাহাজের ক্ষতি পুরো নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি ছোট জাহাজ হারানো রাজনৈতিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই একটি বড় যুদ্ধজাহাজ হারানোর চেয়ে কম ক্ষতিকর।
তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগর অভিযান দেখিয়েছিল যে একটি দুর্বল শক্তি সমুদ্রের কর্তৃত্ব বা সমকক্ষ বহর না থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত জলসীমায় শক্তিশালী পক্ষকে কোণঠাসা করতে পারে।
এই অভিযানে ভূমিভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল, চালকহীন সারফেস ভেসেল (ইউএসভি)-এর ঝাঁক, আকাশপথের ড্রোন এবং বহিরাগত গোয়েন্দা তথ্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবাহিনীর কর্মকাণ্ডে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করা হয়।
এই আক্রমণগুলো রাশিয়ার বেশির ভাগ বহরকে ইউক্রেনের উপকূল থেকে দূরে ঠেলে দিতে সাহায্য করেছিল।
ইরানের ওপর চলমান সংঘাতও এই ধরনকে পুনর্ব্যক্ত করে: সংঘাতের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সারফেস নৌবাহিনীর মারাত্মক ক্ষতি করলেও তাদের ছড়িয়ে থাকা মিসাইল, ড্রোন, টহল নৌকা এবং মাইন ফেলার নৌকাগুলো পুরোপুরি নির্মূল করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
এই উদাহরণগুলো যেমন দেখায়, একটি কম শক্তিশালী নৌবাহিনীর তার উপকূলীয় জলসীমা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন নেই, বরং শক্তিশালী প্রতিপক্ষ যাতে এটি অবাধে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট। তাইওয়ান প্রণালিতে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমুদ্র ব্যবহারে বাধা প্রদান করা, অর্থাৎ চীন যাতে স্বাধীনভাবে জলপথ ব্যবহার করে আক্রমণ চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
সমুদ্র ব্যবহারে বাধা প্রদানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাইওয়ানকে সারফেস নৌবাহিনী পরিত্যাগ করতে হবে না। তবে তাকে ভিন্ন ধরনের একটি বহর গড়ে তুলতে হবে, এমন একটি বহর যা অনেক ছোট জাহাজের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হবে, যেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি তথ্য আদান-প্রদান এবং তাদের আক্রমণ সমন্বিত করতে পারবে।
সেকেলে জাহাজগুলোকে আধুনিকীকরণ করার পরিবর্তে তাইওয়ানের উচিত সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে বাতিল করা এবং স্বল্প সম্পদকে তাদের প্রয়োজনীয় হালকা সারফেস জাহাজের দিকে চালিত করা।
ফিনল্যান্ড ও সুইডেন এ ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট মডেল হতে পারে। দুটি দেশকেই আরও বড় ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ—রাশিয়াকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে হয়, তারা উভয়ই তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে এবং নিজেদের উপকূলে সম্ভাব্য উভচর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
তারা তাদের জলসীমায় প্রবেশ করা রুশ জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে এবং মস্কোর কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। উভয় দেশেরই ব্যাপক, পরিশীলিত এবং ক্রমাগত উন্নতি লাভ করা নজরদারি, যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা রয়েছে।
তাইওয়ানের সারফেস বহর পুনর্গঠন করার লক্ষ্যটি নাগালের মধ্যেই রয়েছে। গত জুলাইয়ে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে নৌবাহিনীর অষ্টম ও নতুন মিসাইল প্যাট্রোল জাহাজের কমিশনিং অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
এটি তাইওয়ানে তৈরি একটি হালকা কিন্তু ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কর্ভেট, যার উদ্ভাবনী ‘ক্যাটামারান হাল’ বা দ্বিখণ্ডী কাঠামোর কারণে এটি দ্রুতগামী ও অধিক স্থিতিশীল। এমন আরও চারটি জাহাজ বছরের শেষ নাগাদ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তাইওয়ানের জাহাজ নির্মাণশিল্প দ্রুত এই জাহাজগুলো তৈরি করতে পারে এবং তারা যত বেশি তৈরি করবে, তত বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। ধারাবাহিক উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে এবং প্রতিটি নতুন ব্যাচের জাহাজে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত হওয়া নতুন অস্ত্র, সেন্সর এবং চালকহীন ব্যবস্থা যুক্ত করা যাবে।
এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনীর সেন্সর, যোগাযোগমাধ্যম, ড্রোন ও মিসাইল নেটওয়ার্কের একটি ব্যাপক আধুনিকীকরণ ঘটানো উচিত। তাইওয়ান ইতিমধ্যেই এই খাতগুলোতে কিছুটা বিনিয়োগ করছে।
তাদের সাম্প্রতিক বিশেষ বাজেট এবং নৌ পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ সামুদ্রিক নজরদারি ড্রোন, সামরিক বাহিনীকে পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য উন্নত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক যুদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘কিল চেইন’কে আরও শক্তিশালী করছে। এগুলো চীনকে তাইওয়ান প্রণালিতে অবাধে চলাচলে বাধা দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
তাইওয়ানের পুনর্গঠিত সারফেস বহর তাদের আটটি নতুন সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনাকেও ত্বরান্বিত করবে, যার প্রথমটির সমুদ্র পরীক্ষা ইতিমধ্যেই চলছে।
তাইওয়ানের নৌবাহিনীর এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাধাগুলো প্রযুক্তিগত চেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক। আকারে বড় হওয়ার কারণে এই বড় জাহাজগুলো রাজনীতিবিদদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এগুলো শিপইয়ার্ডের জন্য বড় চুক্তি, ফিতা কাটার অনুষ্ঠান, জাতীয় অর্জনের অনুভূতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের দৃশ্যমান প্রমাণ নিয়ে আসে।
এর বিপরীতে সাধারণ জনগণ ড্রোনে ভরা কোনো গুদাম বা পাহাড়ে লুকিয়ে রাখা মোবাইল মিসাইল লঞ্চার দেখতে পায় না। নৌবাহিনীর নেতৃত্বের জন্যও বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়ার চেয়ে বর্তমান স্থিতি বজায় রাখা অনেক সহজ।
কিন্তু এই অপ্রচলিত, এমনকি বলা চলে সেকেলে জাহাজগুলোকে আধুনিকীকরণ করার পরিবর্তে তাইওয়ানের উচিত সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে বাতিল করা এবং স্বল্প সম্পদকে তাদের প্রয়োজনীয় হালকা সারফেস জাহাজের দিকে চালিত করা।
প্রচলিত সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে সরে আসার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ঝুঁকি নিতে হবে এবং যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সঙ্গে আসা বাধা ও সমালোচনা অতিক্রম করতে হবে।
কয়েক বছর স্থবিরতা ও হ্রাসের পর তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যয় অবশেষে বাড়ছে।
তাইওয়ানের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং আইনসভা মে মাসে একটি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেটও পাস করেছে। তবে এই সম্পদ যদি পুরোনো প্রতিরক্ষা ধারণায় এবং স্বল্পসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ বড় যুদ্ধজাহাজে ব্যয় করা হয়, তবে তাইওয়ান মোটেও নিরাপদ হবে না।
হোমস লিয়াও তাইওয়ানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির ওয়ার কলেজের সাবেক সম্মানসূচক চেয়ার; ডেনিস ব্লেয়ার ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।