মতামত

যে কারণে বিচারক হওয়ার বয়সসীমা ৩৪ হওয়া জরুরি

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) নিয়োগব্যবস্থা দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও কঠিন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাগুলোর একটি। প্রিলিমিনারি, এক হাজার নম্বরের লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে একজন প্রার্থীকে সিভিল জজ হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। অর্থাৎ এখানে মেধা, আইনজ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বিচারিক সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা রয়েছে।

তবু এই কঠিন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার দরজায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে—৩২ বছর বয়স পেরিয়ে গেলে কি একজন আইন গ্র্যাজুয়েট হঠাৎ বিচারক হওয়ার অযোগ্য হয়ে যান?

সম্প্রতি ১৯তম বিজেএস নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে আইন গ্র্যাজুয়েট ও প্রার্থীদের মধ্যে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা তাই কেবল একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি নিয়োগে ন্যায্য সুযোগ, রাষ্ট্রের মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার ও বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ মান।

দেশের মেধার অপচয় রোধের স্বার্থে, হেলথ ক্যাডারের মতো টেকনিক্যাল ক্যাডার সার্ভিস হওয়ায় বিজেএসের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৩৪ বছর করা ও বিসিএসের আদলে বিজেএসে নন–ক্যাডার ব্যবস্থা চালু করা—এ দুটি বিষয় এখন নীতিগতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অবশ্যই বয়স বাড়লেই কেউ ভালো বিচারক হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ৩২ বছর পার হলেই কেউ বিচারক হওয়ার অযোগ্য হয়ে যাবেন, এটিও গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়। বিচার বিভাগের নিয়োগনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কে সবচেয়ে যোগ্য, শুধু কে সবচেয়ে কম বয়সী নয়।

৩২ বছর কি যোগ্যতার কোনো জাদুকরি সীমারেখা? একজন প্রার্থী ৩১ বছর ১১ মাস বয়সে বিচারক হওয়ার যোগ্য, কিন্তু ৩২ বছর ১ দিন বয়সে তিনি সেই যোগ্যতা হারাবেন—এমন ধারণার পেছনে যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে আইন পেশার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন আইনের শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর বার কাউন্সিলের পরীক্ষা, পেশাগত নিবন্ধন ও আদালতে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোভিড–১৯ মহামারি, পরীক্ষা ও নিয়োগে বিলম্ব, দীর্ঘ সেশনজট ও অন্যান্য অনিবার্য বাস্তবতা।

ফলে একজন মেধাবী আইন গ্র্যাজুয়েটের বয়স ৩০ বা ৩১ পেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন হলো, যে সময়ের একটি বড় অংশ প্রার্থীর নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, সেই সময়ের মূল্যও কি তাঁকেই পুরোপুরি দিতে হবে? রাষ্ট্র যদি সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

বয়স নয়, পরীক্ষাই হোক মূল বাছাইয়ের মানদণ্ড

বিজেএস পরীক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রতিযোগিতামূলক বাছাইয়ের প্রক্রিয়া। একজন প্রার্থীকে প্রিলিমিনারি, কঠিন লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাহলে ৩৩ বছর বয়সী একজন প্রার্থী যদি একই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উত্তীর্ণ হতে পারেন, শুধু বয়সের কারণে তাঁর বিচারিক সক্ষমতা কমে যাবে—এমন কোনো স্বতঃসিদ্ধ যুক্তি নেই; বরং আইন পেশার ক্ষেত্রে বয়সের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতাও যোগ হতে পারে। আদালতে কাজ করা একজন আইনজীবী মামলা পরিচালনা, সাক্ষ্য–প্রমাণ, যুক্তিতর্ক, আদালতের কার্যক্রম ও বিচারপ্রার্থীর বাস্তব সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।

অবশ্যই বয়স বাড়লেই কেউ ভালো বিচারক হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ৩২ বছর পার হলেই কেউ বিচারক হওয়ার অযোগ্য হয়ে যাবেন, এটিও গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়। বিচার বিভাগের নিয়োগনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কে সবচেয়ে যোগ্য, শুধু কে সবচেয়ে কম বয়সী নয়।

৩৪ বছর করা কেন যৌক্তিক

বয়সসীমা ৩৪ বছর করার অর্থ এই নয় যে বিচার বিভাগে বয়সের কোনো সীমা থাকবে না; বরং এটি আইন পেশার বাস্তব সময় চক্র এবং বর্তমান সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সীমা হতে পারে।

৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত সুযোগ থাকলে একজন আইন গ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়, বার কাউন্সিল ও পেশাগত জীবনের প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে আরও পরিণত অবস্থায় বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।

এতে বিচার বিভাগের মান কমবে—এমন আশঙ্কারও শক্ত ভিত্তি নেই। কারণ, শেষ পর্যন্ত তাঁকে একই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ বয়সসীমা ৩৪ হওয়া মানে যোগ্যতার মান কমে যাওয়া নয়; বরং যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগের পরিধি বাড়ানো।

বিজেএসে নন–ক্যাডার ব্যবস্থা কেন নয়

বয়সসীমার পাশাপাশি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন। বিজেএস পরীক্ষায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্য থেকে একটি অংশ প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় সফল হন। আরেকটি অংশ মৌখিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। কিন্তু সহকারী বা সিভিল জজের পদসংখ্যা সীমিত হওয়ায় তাঁদের সবাইকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এখানেই রাষ্ট্রের সামনে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

রাষ্ট্র একটি কঠিন, ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থীদের মেধা যাচাই করল। তাঁদের একটি অংশ মৌখিক পরীক্ষাসহ নিয়োগের প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ পর্যন্ত গিয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করলেন। কিন্তু পদসংখ্যা সীমিত হওয়ায় তাঁদের একটি অংশকে শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারি নিয়োগের সুযোগ ছাড়াই বিদায় নিতে হলো। এটি কি রাষ্ট্রীয় মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার? এখানেই বিসিএসের নন–ক্যাডার ব্যবস্থার আদলে বিজেএসেও একটি নন–ক্যাডার বা যোগ্য প্রার্থী প্যানেল চালুর চিন্তা করা যেতে পারে।

কেমন হতে পারে বিজেএসের নন–ক্যাডার ব্যবস্থা? এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে বিজেএসের মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য কোনো সরকারি পদে নিয়োগ দিতে হবে; বরং একটি নির্দিষ্ট ‘প্যানেল অব কোয়ালিফায়েড ক্যান্ডিডেটস’ তৈরি করা যেতে পারে।

এই প্যানেলে থাকা প্রার্থীদের মেধাক্রম, সংশ্লিষ্ট পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য আইনগত শর্ত যাচাই করে উপযুক্ত আইনভিত্তিক সরকারি পদে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আইন কর্মকর্তা, স্বতন্ত্র অ্যাটর্নি সার্ভিস, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আইন কর্মকর্তা, মানবাধিকার কমিশন কিংবা জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার সংশ্লিষ্ট পদ, সাব–রেজিস্ট্রারসহ আইনভিত্তিক বিভিন্ন পদে যেখানে সংশ্লিষ্ট নিয়োগের বিধি অনুমোদন করে, সেখানে এই প্যানেল থেকে প্রার্থী নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

এতে একই ধরনের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রকে বারবার পৃথক পরীক্ষা আয়োজন করতে হবে না; কমবে সময় ও প্রশাসনিক ব্যয়। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে একটি কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা মেধাবী আইন গ্র্যাজুয়েটদের রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তবে নন–ক্যাডার মানে স্বয়ংক্রিয় নিয়োগ নয়। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে স্বচ্ছতা ও আইনগত কাঠামো।

বিজেএসে উত্তীর্ণ হলেই যেকোনো পদে নিয়োগের অধিকার তৈরি হবে—এমন ধারণা তৈরি করা যাবে না। কোন পদে এই প্যানেল ব্যবহার করা যাবে, প্যানেলের মেয়াদ কত হবে, মেধাক্রম কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন যোগ্যতা যাচাই করা হবে ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী হবে—সবকিছু স্পষ্ট বিধিমালায় নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ নন–ক্যাডার ব্যবস্থা হবে যোগ্যতার স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় মানবসম্পদের ব্যবহার, কোনো ধরনের নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের পথ নয়।

বিচার বিভাগ কি শুধু তরুণদের জন্য

বিচার বিভাগের জন্য তরুণ মেধাবীদের প্রয়োজন—এ কথা সত্য। কিন্তু বিচার বিভাগ কেবল তরুণদের জন্য নয়; যোগ্যদের জন্যও। একজন বিচারকের প্রয়োজন আইনজ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ধৈর্য, সততা, বিচারিক মানসিকতা ও মানুষের বাস্তব সমস্যাকে বোঝার সক্ষমতা। বয়স এসব গুণের কোনো একক মাপকাঠি নয়।
৩২ বছর কোনো জাদুকরি সীমারেখা নয়, যার এক দিন আগে একজন প্রার্থী বিচারক হওয়ার উপযুক্ত এবং এক দিন পরে অনুপযুক্ত।

তাই হেলথ ক্যাডারের মতো বিজেএসের বয়সসীমা ৩৪ বছর করা এবং একই সঙ্গে কঠিন পরীক্ষায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করা কিন্তু পদসংখ্যার কারণে নিয়োগ না পাওয়া প্রার্থীদের জন্য বিসিএসের আদলে নন–ক্যাডার ব্যবস্থা চালু করা—দুটি বিষয়কে কেবল চাকরিপ্রার্থীদের দাবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়োগনীতির দক্ষতা, ন্যায্যতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু অর্থ নয়; যোগ্য মানুষও রাষ্ট্রের সম্পদ। একজন আইন গ্র্যাজুয়েটকে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে তাঁর মেধা শনাক্ত করার পর কেবল বয়সের কারণে তাঁকে সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া কিংবা পদসংখ্যার কারণে পরীক্ষায় সফল একজন প্রার্থীকে কোনো বিকল্প সরকারি কাজে ব্যবহার না করা—দুটিই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তাই এখন সময় এসেছে বিজেএস নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে একটু বড় করে ভাবার।

বয়সসীমা হোক ৩৪ বছর। আর বিজেএসে চালু হোক স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও বিধিসম্মত নন–ক্যাডার ব্যবস্থা। এতে শুধু চাকরিপ্রার্থীর লাভ হবে না; লাভবান হবে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সর্বোপরি রাষ্ট্র।

  • শামস নজীব প্রথম আলোর সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার
    *মতামত লেখকের নিজস্ব