
মাসের পর মাস যুদ্ধ, চাপ আর কূটনৈতিক নাটকীয়তার পর লেবানন কার্যত ইসরায়েলের সঙ্গে একটি ‘ইচ্ছাপত্রে’ প্রবেশ করেছে। এর প্রতিক্রিয়া আসতে দেরি হয়নি। লেবাননের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও তাদের মিত্ররা এই চুক্তির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। রাস্তায় প্রতিবাদ হয়েছে, সংবাদমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এই দলিলে সমস্যার অভাব নেই। এটি অবাস্তব, রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক এবং সাংবিধানিক দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সমঝোতা ভবিষ্যতের একটি নতুন যুদ্ধের পথ তৈরি করছে, যেখানে দায় চাপানো হবে লেবাননের ওপরেই।
ইসরায়েল বহুদিন ধরেই অস্পষ্ট ভাষায় তৈরি অন্তর্বর্তী চুক্তি, ঘোষণা ও ঝুলে থাকা প্রশ্নের সুবিধা ভোগ করে এসেছে। অসলো চুক্তির কথাই ধরা যাক। এর নামই ছিল ‘নীতিগত ঘোষণা’। সেখানে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য কিছু সাধারণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সীমান্ত, বসতি, জেরুজালেম, শরণার্থী, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব—সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরে নির্ধারণের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ‘পরে’ আর কখনো আসেনি।
বরং এই অন্তর্বর্তী কাঠামোই স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সেখানে ইসরায়েল নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতা ধরে রেখেছে। দখলদারি বাড়িয়েছে। ভূমি দখল চালিয়ে গেছে। তারা সব দোষ চাপিয়েছে সেই ফিলিস্তিনিদের ওপর, যাদের ওপর এমন শর্ত চাপানো হয়েছিল, যা পূরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভবই ছিল না।
লেবাননের সংবিধান রাষ্ট্রকে তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার নির্দেশ দেয়। ফলে এমন কোনো ঘোষণা গ্রহণযোগ্য নয়, যা চুপিসারে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তোলে বা লেবাননের সার্বভৌমত্বকে ইসরায়েলের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল করে।
লেবানন আর ফিলিস্তিন এক নয়, পরিস্থিতিও এক নয়। কিন্তু কূটনৈতিক যুক্তি আশঙ্কাজনকভাবে মিল খুঁজে দেয়। লেবানন ও ইসরায়েল ‘সংঘাত শেষ করার ইচ্ছা’ ঘোষণা করছে, অথচ চূড়ান্ত সমাধান এড়িয়ে যাচ্ছে। এটি দেখতে নমনীয় মনে হলেও বাস্তবে এটি একধরনের ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।
এই যে কাঠামো লেবানন এখন মেনে নিয়েছে, সেটি কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, লেবানন রাষ্ট্র কোনো আদেশ দিয়ে হিজবুল্লাহকে বিলোপ করতে পারে না। হিজবুল্লাহর অস্ত্র কেবল সামরিক বাস্তবতা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক যুক্তির সঙ্গেও জড়িত। প্রতিরোধ, সম্প্রদায়ের সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে এটি কাজ করে। ওয়াশিংটনে বসে কোনো দলিলে সই করে এই কাঠামো ভেঙে ফেলা যায় না।
একইভাবে লেবাননের সেনাবাহিনী হঠাৎ শক্তিশালী সার্বভৌম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে পরিণত হতে পারে না। বাস্তবে এটি অর্থসংকটে ভুগছে, অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে, রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ এবং বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সেই সহায়তাও আবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমারেখা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
ফলে লেবাননের কাছ থেকে এমন জায়গায় সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতো আচরণ আশা করা হচ্ছে, যেখানে তার সক্ষমতা সবচেয়ে দুর্বল। তাকে এমন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হচ্ছে, যাদের পরাজিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাকে এমন শত্রুর সঙ্গে আলোচনা করতে বলা হচ্ছে, যাকে সে প্রতিরোধ করতে পারে না। তাকে এমন দায়িত্ব নিতে বলা হচ্ছে, যার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সেই শক্তিগুলোর ওপর, যারা লেবাননের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেয় না।
সামরিকভাবে লেবানন ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। তাই তার হাতে যে কয়েকটি অস্ত্র আছে, তা হলো কূটনৈতিক, আইনি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র। যদি ‘উত্তেজনা কমানো’র নামে এই ক্ষেত্রগুলোও সীমাবদ্ধ করা হয় (যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করা), তাহলে রাষ্ট্রকে সেই জায়গাতেই নিরস্ত্র করা হচ্ছে, যেখানে তার কিছুটা শক্তি এখনো আছে।
এর সঙ্গে রয়েছে সাংবিধানিক জটিলতা। তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে লেবাননের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হয়তো এই দলিলকে বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক বোঝাপড়া হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন। কিন্তু নাম বদলালেই বাস্তব বদলায় না। যদি এতে যুদ্ধ, শান্তি, ভূখণ্ড, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, নিরাপত্তা, স্বীকৃতি বা আইনি সীমাবদ্ধতার মতো বিষয় থাকে, তবে এটি নিছক কূটনৈতিক কাগজ নয়।
লেবাননের সংবিধান কোনো একক ব্যক্তিকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেয় না। আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন। যুদ্ধ ও শান্তি–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার আওতায় পড়ে এবং বড় সিদ্ধান্তের জন্য একাধিক স্তরের সম্মতি দরকার।
কিন্তু এই ‘ইচ্ছাপত্র’ ব্যবহার করে যদি চুক্তির মতো দায়বদ্ধতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা সংবিধানের সুরক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর শামিল। লেবাননের সংবিধান রাষ্ট্রকে তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার নির্দেশ দেয়। ফলে এমন কোনো ঘোষণা গ্রহণযোগ্য নয়, যা চুপিসারে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তোলে বা লেবাননের সার্বভৌমত্বকে ইসরায়েলের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল করে।
এ জায়গাতেই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। হিজবুল্লাহ, আমাল আন্দোলন ও তাদের মিত্ররা সহজেই এ প্রক্রিয়াকে বিলম্বের জালে ফেলতে পারে। তারা যুক্তি দিতে পারে, এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন। তারা প্রশ্ন তুলতে পারে, এটি কি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ? তারা ইসরায়েলের প্রত্যাহার নিয়ে স্পষ্টতা চাইতে পারে। আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার অধিকার সীমিত করার বিরোধিতা করতে পারে। সব মিলিয়ে বিষয়টি কমিটি, বিতর্ক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় আটকে যেতে পারে।
● সামি হালাবি বৈরুতভিত্তিক নীতি-গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘বাদিল: দ্য অল্টারনেটিভ পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর নীতি পরিচালক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত