এটা একদিন না একদিন ঘটবেই—এমনটাই যেন প্রত্যাশিত ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ এখন এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত অর্থনীতিবিদেরা যখন ‘ট্রিলিয়ন’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, তখন তা সাধারণত বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশগুলোর জিডিপি বা আজকের বিলিয়নিয়ারদের উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরের অপেক্ষায় থাকা বিপুল সম্পদের মূল্য বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। দৈনন্দিন কথাবার্তায় তো বটেই, কোনো একক ব্যক্তির সম্পদ বোঝাতে এই শব্দের ব্যবহার ছিল প্রায় অকল্পনীয়।
কিন্তু এখন আমরা প্রবেশ করেছি অলিগার্কিক যুগের এক নতুন পর্যায়ে। আগে যখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদের কথা বলা হতো, তখন তা বোঝাত কয়েক শ বিলিয়ন ডলার। মাত্র তিন বছর আগে মাস্কের মোট সম্পদের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার। যেভাবে এই সম্পদ বেড়েছে, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি এটি কী নির্দেশ করে, সেটাও গভীরভাবে ভাবার বিষয়। ট্রিলিয়নিয়ারদের বিষয়ে আমাদের দুটি বিষয় বুঝতে হবে—এক. এক ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত বড় একটি অঙ্ক; দুই. কেন এত বিপুল সম্পদ এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া বিপজ্জনক।
এত বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া কেন সমস্যা? প্রথম কারণ হলো রাজস্ব ন্যায়বিচার। অর্থনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান দেখিয়েছেন, বিলিয়নিয়াররা অন্যদের তুলনায় কার্যকরভাবে অনেক কম কর দেন। কারণ, আমাদের আইনি ব্যবস্থায় কর ফাঁকি দেওয়ার অসংখ্য সুযোগ রয়েছে, যেমন বিভিন্ন দেশে অবস্থিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অর্থ স্থানান্তর, আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার কিংবা সম্পদকে তথাকথিত ট্যাক্স হ্যাভেনে সরিয়ে রাখা।
বিলিয়নিয়ার ও ট্রিলিয়নিয়ারদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যুক্তি হলো অপচয়। একজন ব্যক্তির এত বিপুল অর্থ থাকার কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন নেই। অথচ পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হয় বা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই জীবন কাটায়। কারণ, সমাজ সম্মিলিতভাবে যে সম্পদ সৃষ্টি করে, তার সিংহভাগ দখল করে নেয় সবচেয়ে ধনীরা। তবে সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত তৃতীয় কারণটিতে—ক্ষতিকর প্রভাব। চরম সম্পদ কেন্দ্রীভবন গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। এটি অপ্রয়োজনীয় বিপুল গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও পরিবেশগত ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত, যা সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
এসব ক্ষতি সামাজিক সংকট তৈরি করে, এমনকি অর্থনৈতিক ক্ষতিও ডেকে আনে। কারণ, করপোরেট ক্ষমতার অসম ভারসাম্য অর্থনীতিকে কম ন্যায্য ও কম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে মাস্ক এই বিপদের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অনুদান দিয়েছেন। মাস্ক ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ( ইউএসএইড) কার্যত ভেঙে দিয়েছেন। এই সংস্থা মানবিক ও উন্নয়নমূলক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করত, যার মধ্যে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে জরুরি হস্তক্ষেপও ছিল।
সম্পদের চরম কেন্দ্রীভবন মানে চরম ক্ষমতা। আর মাস্ক তাঁর সেই ক্ষমতা ব্যবহার করছেন বর্ণবাদী ও বিদেশিবিদ্বেষী মনোভাবকে আরও ছড়িয়ে দিতে, বিশেষ করে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স কর্পের মাধ্যমে। তিনি ভয় ও সহিংস ভাষা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা ভোটারদের উগ্র ডানপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যদি আমরা এটি ঠেকাতে চাই, তাহলে বর্তমান সম্পদ কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শুধু মাস্কের এক ট্রিলিয়ন নয়, আমাদের প্রয়োজন ‘এক্সট্রিম ওয়েলথ লাইন প্রজেক্ট’-এর মতো উদ্যোগ। এর লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা—কোন পর্যায়ে গিয়ে সম্পদ সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে এবং কোথায় ‘সম্পদসীমা’ নির্ধারণ করা উচিত। কিন্তু এর শুরুটা হওয়া উচিত একটি মৌলিক উপলব্ধি থেকে: বিলিয়নিয়ার বা ট্রিলিয়নিয়ার হওয়া কোনো সফলতার প্রতীক নয়, বরং এটি এমন একটি বিকল ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার জীবনের জন্য ক্ষতিকর।
● ইনগ্রিড রবেইন্স বেলজিয়ান-ডাচ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক
গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত