প্রয়াত হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ছবির সামনে দুই নারী। বৈরুতের উপকন্ঠে।
প্রয়াত হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ছবির সামনে দুই নারী। বৈরুতের উপকন্ঠে।

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি সংঘাত কেন উসকে দিচ্ছেন ট্রাম্প

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন-পরবর্তী প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং এক দশক আগের আইএসের (আইএসআইএস) উত্থানের ক্ষত মধ্যপ্রাচ্যে এখনও তাজা।

সম্প্রতি মসুলের কাছে আইএসের গণকবর থেকে কুর্দি পেশমার্গা যোদ্ধা, ইরাকি নিরাপত্তাকর্মী ও ইয়াজিদি নারী-শিশুর ৩০টির বেশি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়ার দেইরি আল-জোরে আরও একটি গণকবরের সন্ধান মিলেছে, যা চলতি বছরেই দেশটিতে আবিষ্কৃত অন্তত ১৮টি গণকবরের একটি।

গত বছর সিরিয়ায় আলউই সম্প্রদায়ের ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা এবং সুওয়ায়দায় দ্রুজদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা নতুন গঠিত সিরিয়া রাষ্ট্রকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। গৃহযুদ্ধের ক্ষত না শুকাতেই লেবানন, সিরিয়া ও ইরাক—পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই এখন নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।

সিরিয়া–বিশারদ জোশুয়া ল্যান্ডিসের মতে, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে গঠিত কৃত্রিম মধ্যপ্রাচ্য সীমান্তব্যবস্থার এক সহিংস পরিণতি, যাকে তিনি ‘বড় ধরনের বিভাজনপ্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ওই চুক্তিতে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো সুন্নি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং আব্রাহামীয় ও অ-আব্রাহামীয় জাতিগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক নতুন রাষ্ট্রগুলোয় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। আজ প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজ নিজ জাতিগত ও ধর্মীয় সুরক্ষাবলয়ে ফিরে যাওয়ায় শতবর্ষী সেই কৃত্রিম ব্যবস্থা চরম সহিংসতার মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ছে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননের সাধারণ মানুষকে।

ঠিক এই মুহূর্তে মাঠে আবির্ভূত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান ও শিয়া রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা নেট সোয়ানসনকে বরখাস্ত করে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক ধ্বংসাত্মক নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট ও সাবেক আল–কায়েদা কমান্ডার আহমেদ আল-শারার বাহিনীকে ‘হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রণের’ দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সংবরণের চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা না বুঝেই এমন এক বিপজ্জনক খেলায় মেতে উঠেছেন, যার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ।

এখন ইয়েমেনের থমকে থাকা গৃহযুদ্ধ নতুন করে জ্বলে উঠেছে। হুতি ও সৌদি–সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় সরকারের মধ্যে দীর্ঘ চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে সুন্নি আলেমরা হুতিদের বিরুদ্ধে মক্কায় হামলার অভিযোগ এনেছেন; যদিও দলটি জানিয়েছিল, তারা মক্কায় নয়, বরং আরামকোর তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।

২০০৩ সালে ওয়াশিংটন যখন ইরাক আক্রমণ করে, তখন সেখানকার সাম্প্রদায়িক বিভাজন সম্পর্কে তাদের ধারণা এতটাই কম ছিল যে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তারা হাশেমীয় বংশের এক সুন্নি রাজাকে বসানোর কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভেবেছিল!

অথচ ইরাকের শেষ হাশেমীয় শাসককে ১৯৫৮ সালে গুলি করে হত্যা করে তাঁর লাশ রাজপথে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, দখলদার মার্কিন প্রশাসন সাদ্দাম আমলের ক্ষমতাবান ও সশস্ত্র সুন্নি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে রাতারাতি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অধিকারহীন করে ফেলে।

এরপর এক দশকের নৃশংস সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধে ইরাকের পরিস্তিতি পুরোপুরি বদলে যায়। যেসব এলাকায় সুন্নি ও শিয়াপাড়াগুলো পাশাপাশি মিলেমিশে থাকত, তা রাতারাতি আলাদা আলাদা শক্ত ধর্মীয় ছিটমহলে পরিণত হয়। আর নিজের ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী মানুষ সেই এলাকাগুলোকে হয় নিরাপদ আশ্রয়স্থল, না হয় সূর্যাস্তের পর বিপজ্জনক স্থান হিসেবে দেখতে শুরু করে।

আমেরিকান ও উপসাগরীয় সহায়তায় সিরিয়ায় উগ্র সুন্নি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের ফলে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ থেকেই ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জন্ম হয়। দ্রুতই এই ‘খিলাফত’ ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ, বিশেষ করে মসুল ও আনবার দখল করে নেয়। পরে মার্কিন বিমান সহায়তায় ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ) ও অন্যান্য পদাতিক বাহিনী অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করে আইএসের অস্তিত্ব ধ্বংস করে।

ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের শত্রুতা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একটি সংঘাত সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবেই তুলে ধরেছে। ১৯৮০-এর দশকে ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের আট বছরের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে সাদ্দামকে সমর্থন দিয়েছিল। এর কয়েক দশক পর, বাহরাইনে শিয়া গণ-অভ্যুত্থান দমনে সৌদি বাহিনীকে সমর্থন জোগায় ওয়াশিংটন।

২০১৫ সালে ইয়েমেনে জাইদি শিয়া হুতি আন্দোলনের বিরুদ্ধে সৌদি সরকারের বিমান হামলা, গোয়েন্দা তথ্য ও আকাশপথে জ্বালানি দিয়ে সহায়তা করে তারা। প্রতিটি সংঘাতের পেছনেই কোনো না কোনো আঞ্চলিক কারণ ছিল, কিন্তু ওয়াশিংটন বারবার এমন মিত্র ও নীতি বেছে নিয়েছে, যা কেবল একটি গল্পকেই জোরদার করেছে—যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত সুন্নি জোট বনাম শিয়া প্রতিরোধ আন্দোলন।

(বাঁ থেকে ডানে) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৪ মে ২০২৫

ইরাকে সাম্প্রতিক দাঙ্গার পর গড়ে ওঠা সশস্ত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করতে নতুন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে শিয়া মিলিশিয়াগুলো অস্ত্র সমর্পণে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে একদিকে ইরানের অনুগত মিলিশিয়া এবং অন্যদিকে জাইদির অধীন পুরো দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টার মধ্যে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত তৈরি হয়েছে।

পিএমএফ হলো একটি ছাতা সংগঠন, যার অধীন বদর, কাতায়েব হিজবুল্লাহ ও হারাকাত আল-নুজাবার মতো ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর পাশাপাশি ইরাক সরকারের সমর্থিত বেশ কিছু সামরিক ইউনিট রয়েছে। ২০১৪ সালে আইএসের বিরুদ্ধে ইরাকের প্রভাবশালী শিয়া ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানির ‘আত্মরক্ষামূলক জিহাদের’ ফতোয়ার পর এটি গঠিত হয়। এর দুই বছর পর পিএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গত আগস্টে ৯৬ বছরে পা দেওয়া সিস্তানি কখনোই সেই ফতোয়া তুলে নেননি। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে বা রাজনৈতিকভাবে এই ফতোয়ার পরিণতি কী হবে, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি। পিএমএফের মুখপাত্র মোহনাদ আল-ওকাবি যেমনটি স্পষ্ট করে বলেছেন, পিএমএফ যদি দেশের হাজার হাজার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে ইরাকের নিরাপত্তাব্যবস্থা ‘একমুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যাবে’।

মিলিশিয়া নেতাদের এই অবিশ্বাসের পেছনে ট্রাম্প আমলপূর্ব দীর্ঘ প্রেক্ষাপট রয়েছে। তাঁদের মূল আশঙ্কা হলো, মার্কিন সামরিক কর্মীরা প্রশিক্ষক, পরামর্শক বা ঠিকাদার হিসেবে ছদ্মবেশে পুনরায় ইরাকে ফিরে আসতে পারে। পাশাপাশি তারা উত্তরে তুরস্কের সামরিক তৎপরতা, আইএসের হুমকি ও দামেস্কে শারার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের অবস্থান নিয়েও গভীর সংশয়ে রয়েছেন।

এ অবিশ্বাসের শিকড় কেবল আধুনিক ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে শিয়া সংস্কৃতির শত শত বছরের ‘মজলুমিয়াত’ বা বঞ্চিত ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অনুভূতি। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত থেকে শুরু করে সাদ্দাম আমলের দমনপীড়ন এবং আইএসের গণহত্যার স্মৃতি এই জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বে গেঁথে রয়েছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই ব্যাখ্যা করে কেন ইরান বা লেবাননে শিয়াদের ওপর হামলার ঘটনায় ইরাকে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়—আর ঠিক একই কারণে ওয়াশিংটনের অস্ত্র সমর্পণের দাবি বাগদাদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সংবেদনশীলভাবে দেখা হয়।

সীমান্তের ওপারে ওয়াশিংটন সিরিয়ার সুন্নি ইসলামপন্থী শারা সরকারকে লেবাননের ‘হিজবুল্লাহকে সামলানোর’ জন্য উসকানি দিচ্ছে। যদিও সিরিয়ার কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এমন কোনো পদক্ষেপ দুই দেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

গত জুলাইয়ে মার্কিন ও সৌদি বিমান হামলায় পিএমএফের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে শিয়া মিলিশিয়ারা পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নেয়। তবে বদর নেতা হাদি আল-আমিরির হস্তক্ষেপে তা সাময়িকভাবে এড়ানো যায়। এর কিছুদিন পর অস্ত্রসমর্পণের চাপের মুখে ইরাকি কর্তৃপক্ষ পিএমএফ নেতা আব্বাস আল-ইয়াকুবিকে গ্রেপ্তার করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকিসহ শীর্ষ নেতারা সতর্ক করেছেন, জোর করে মিলিশিয়াদের অস্ত্র ত্যাগে বাধ্য করা হলে তা গোটা অঞ্চলে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দাবানল জ্বেলে দিতে পারে।

অন্যদিকে লেবাননে ১৮টি স্বীকৃত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতা বিভক্ত থাকায় সেখানকার পরিস্থিতি আরও জটিল। বৈরুতের অদূরে সরকারের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কোনো সশস্ত্র সমান্তরাল শক্তির উপস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে কোনো রাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে না। তবে হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের অস্ত্রের ভবিষ্যৎ ওয়াশিংটন বা ইসরায়েল নির্ধারণ করতে পারে না এবং এটি সম্পূর্ণ লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

ইরানি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি সংবলিত ব্যানারের কাছে বসে আছেন কয়েকজন। তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে, ইরান

১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণ ও দখলের প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। চার দশক ধরে লেবাননের শিয়াদের কাছে তাদের মূল বক্তব্য একই রয়ে গেছে—রাষ্ট্র যখনই ব্যর্থ হবে, তখনই দক্ষিণ লেবাননকে পরবর্তী ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার একমাত্র শক্তি হলো হিজবুল্লাহ।

নাঈম কাসেম এই একই যুক্তি ব্যবহার করে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সরকারের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলের দালালি’ করার অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার শর্তে মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাবটি স্রেফ কূটনীতির আড়ালে আত্মসমর্পণের নামান্তর।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আউন ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের যুক্তি হলো, কোনো মিলিশিয়া গোষ্ঠী স্বাধীনভাবে যুদ্ধ বা শান্তির সিদ্ধান্ত নিলে সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকে না। তবে ইসরায়েলি বাহিনী এখনো দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশ দখল করে রাখায় সরকারের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে না।

সীমান্তের ওপারে ওয়াশিংটন সিরিয়ার সুন্নি ইসলামপন্থী শারা সরকারকে লেবাননের ‘হিজবুল্লাহকে সামলানোর’ জন্য উসকানি দিচ্ছে। যদিও সিরিয়ার কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এমন কোনো পদক্ষেপ দুই দেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে ইরাকের ইরান-ঘনিষ্ঠ শিয়া গোষ্ঠীগুলো শারাকে সতর্ক করে দিয়েছে, হিজবুল্লাহ বা লেবাননের শিয়া ‘প্রতিরোধ আন্দোলনের’ বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে গণ্য হবে এবং এতে ইরাক থেকে সামরিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।

ইরান যুদ্ধও উপসাগরীয় অঞ্চলেও সুন্নি-শিয়া সম্পর্কের ভঙ্গুর ভারসাম্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বাহরাইনে, যেখানে সুন্নি রাজপরিবারের অধীন শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বসবাস করে, সেখানে শিয়া ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা, আলেমদের গ্রেপ্তার এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার শোক প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে কুয়েতও শিয়াদের ধর্মীয় সমাবেশে কড়াকড়ি আরোপ, হাজার হাজার মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল এবং ‘সাম্প্রদায়িক উসকানি’র অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে।

আর এখন ইয়েমেনের থমকে থাকা গৃহযুদ্ধ নতুন করে জ্বলে উঠেছে। হুতি ও সৌদি–সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় সরকারের মধ্যে দীর্ঘ চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে সুন্নি আলেমরা হুতিদের বিরুদ্ধে মক্কায় হামলার অভিযোগ এনেছেন; যদিও দলটি জানিয়েছিল, তারা মক্কায় নয়, বরং আরামকোর তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।

নতুন কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আগুন জ্বললে তার মাশুল সবচেয়ে আগে গুনতে হবে সেই সাধারণ মানুষকে, যাঁদের এই রাজনীতির ওপর কোনো হাত নেই। শিয়া বেসামরিক নাগরিকেরা আবারও ইরানের প্রক্সি হিসেবে বিবেচিত হবেন, সুন্নিদের দেখা হবে উগ্রবাদী বা উপসাগরীয় দেশের দালান হিসেবে, আর আলউইদের দেখা হবে পতিত স্বৈরাচারের অবশিষ্টাংশ হিসেবে। ছোট ছোট সম্প্রদায়—ইয়াজিদি, খ্রিষ্টান, দ্রুজরা—আবারও বড় বড় সশস্ত্র বাহিনীর মাঝখানে পড়ে পিষে যাবে।

এই আগুন ইতিমধ্যেই জ্বলতে শুরু করেছে। হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে শরণার্থীদের সংখ্যা। ওয়াশিংটনের উচিত হবে প্রথমেই নিজেদের হারিয়ে যাওয়া বিশেষজ্ঞ জ্ঞান পুনর্নির্মাণ করা। ইরাকি শিয়া রাজনীতি, লেবাননের সাম্প্রদায়িক সমীকরণ, সিরিয়ার সংখ্যালঘু এবং এই অঞ্চলের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বোঝেন—এমন দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রশাসনে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, যাতে হোয়াইট হাউস যে মহাবিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা এড়ানো সম্ভব হয়।

  • হেকমত আবুখাতির ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকসন স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের শিক্ষার্থী এবং কোয়িন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক।

ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।