
জাতীয় উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নে জনসংখ্যাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সব সময় বিবেচনায় রাখা এবং জনসংখ্যানীতিকে অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এই পরিপ্রেক্ষিতে জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয় কেন জরুরি, তা নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম
বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। পৃথিবীর সবচেয়ে জনঘনত্বপূর্ণ দেশের অন্যতম আমাদের এই দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ১ হাজার ৩৬৬ জন (জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগ, ২০২৬)। উচ্চ জনঘনত্বের এ দেশে সরকারের উচিত জনসংখ্যার পরিমাণগত ও গুণগত উভয় ক্ষেত্রেই উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বিশ্বের অনেক দেশেই জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে—কোথাও মন্ত্রণালয় আছে, কোথাও জাতীয় কমিশন আছে। এসব প্রতিষ্ঠান জনমিতিক পরিবর্তন, জনগণনা ও প্রজননস্বাস্থ্য নীতিমালা তদারকি করে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হলো, কেন এ ধরনের কমিশন বা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন? দেশভেদে ভিন্ন পটভূমি থাকলেও এসব জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো তথ্য ও সরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা।
সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার (যেমন স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রতিরোধ); টেকসই উন্নয়ন (পানি, ভূমি ও পরিবেশগত সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা) এবং মানবাধিকার (১৯৯৪ সালের কায়রো সম্মেলনের পর ‘নিয়ন্ত্রণ’ থেকে ক্ষমতায়নকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন)। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, বিশেষ করে জাতিসংঘেরও রয়েছে কমিশন অন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিডি), যা সদস্যরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক জনসংখ্যা কর্মসূচির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে।
জাতিসংঘের যদিও একটি বৈশ্বিক সিপিডি রয়েছে, অনেক দেশ তাদের নিজস্ব জাতীয় জনসংখ্যা কমিশন গঠন করেছে। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উচ্চ ঘনত্ব বা পরিবর্তনশীল জনমিতিক গঠন দেশীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য একটি জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয় অত্যন্ত জরুরি। এর প্রধান কারণগুলো হলো—
প্রথমত, বাংলাদেশে জনসংখ্যাবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় বা জনসংখ্যা কমিশন প্রয়োজন, যাতে জাতীয় জনসংখ্যা নীতির সমন্বয় ও বাস্তবায়ন কার্যকরভাবে করা যায়। জনসংখ্যানীতি ২০০৪ এবং ২০১২-এর মূল লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অধিকন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আবির্ভূত হয়েছে।
► বৃহৎ যুব জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তিতে পরিণত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ► বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই ‘জনসংখ্যা পরিকল্পনা’ একটি কৌশলগত উন্নয়ন ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে জনসংখ্যানীতি হালনাগাদ হলেও সেটির সংস্কার ও বাস্তবায়ন দরকার। বর্তমানে জনসংখ্যা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় (যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকল্পনা, শ্রম ইত্যাদি) দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তবে জনসংখ্যানীতি বাস্তবায়নে ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে মূল ফোকাল পয়েন্ট।
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিল (এনপিসি) ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যকর নেই। একইভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় মূলত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারছে না।
ফলে বিশেষায়িত একটি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে জনসংখ্যানীতি বাস্তবায়নে ২৮টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় সাধন করতে একটি প্রতিষ্ঠান দরকার। জনসংখ্যাকে কেবল চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যগত বিষয় (যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণ, প্রজনন বা মাতৃস্বাস্থ্য) হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। আইসিপিডি ১৯৯৪ সম্মেলনের পর এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে ‘স্বাস্থ্য’ থেকে ‘উন্নয়ন’কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর।
এর সমাধান হতে পারে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, যা জনসংখ্যাকে একটি উন্নয়নমূলক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবে এবং জনমিতিক তথ্যকে জাতীয় বাজেট, অবকাঠামোগত চাহিদা এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করবে, যা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে শক্তিশালী করার জন্য একটি জনসংখ্যাবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা কমিশন অপরিহার্য। বাংলাদেশ অতীতে সফল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের জন্য পরিচিত হলেও ২০১১-২২ সময়ে অগ্রগতি মন্থর এবং বর্তমানে এখন নতুন নতুন উদ্ভূত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।
সরকারের সাম্প্রতিক জরিপগুলো (যেমন মিকএস ২০২৫, এসভিআরএস ২০২৩, ২০২২) একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করছে। দীর্ঘদিন কমার পর মোট প্রজননহার (টিএফআর) বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছেছে, যা প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজননহার ২ দশমিক ১ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একসময় পরিবার পরিকল্পনায় বৈশ্বিক সাফল্যের উদাহরণ হলেও অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়েছে, এমনকি গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার কমেছে। পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা কমার পরিবর্তে এখন বাড়ছে। ফলে বহুমুখী প্রভাব পড়বে, যা উন্নয়নে অন্তরায় হবে।
এ ক্ষেত্রে সেবার স্থবিরতা থাকায় একটি নিবেদিত মন্ত্রণালয় বা কমিশন মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনার সমস্যা নিরসনে (যেমন অনেক শূন্য পদ পূরণ; গর্ভনিরোধক সরবরাহ নিশ্চিত করা) কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে; বিশেষ করে ১. গর্ভনিরোধকের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, ২. আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ, ৩. প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসার এবং ৪. এনজিও ও সরকারি কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় সাধন। এখন চ্যালেঞ্জ শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়; বরং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠা। অধিকারভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রজননহারকে প্রতিস্থাপনযোগ্য হারে নিয়ে আসা এবং উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে জীবনমান বৃদ্ধি করা জরুরি।
জনসংখ্যাবিষয়ক একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানই কেবল পরিবার পরিকল্পনা শক্তিশালীকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা ও সেবা বৃদ্ধি এবং সামাজিক নীতিমালার মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে স্থিতিশীল করার কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে উচ্চ জনঘনত্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সীমিত ভূমি, পানি ও আবাসনব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো দরকার। ফলে উচ্চ জনঘনত্ব, দ্রুত নগর জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং সীমিত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বতন্ত্র জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এখানে আয়তনের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের বসবাস থাকায় ভূমি, পানি এবং অন্যান্য সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সম্পদের প্রাপ্যতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি নিবেদিত প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।
উচ্চ জনঘনত্ব থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলো হলো আবাসন ও নগর অবকাঠামোর ওপর চাপ; সীমিত ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ; কর্মসংস্থান ও শিক্ষার উচ্চ চাহিদা এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ। ফলে সব নীতি-পরিকল্পনায় জনঘনত্ব ও জনসংখ্যার গতিময়তায় মহাপ্রবণতার গতিধারা ও এর প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে একটি কমিশন বা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন।
চতুর্থত, বাংলাদেশের জনমিতিক পরিবর্তন এবং বয়স-লিঙ্গ কাঠামোর রূপান্তর ঘটছে। এ ক্ষেত্রে মূলত লক্ষণীয়—১. বৃহৎ যুব জনসংখ্যা, ২. ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে বার্ধক্যমুখী জনসংখ্যা, ৩. দ্রুত নগরায়ণ বৃদ্ধি, ৪. জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশের বেশি (প্রায় ১১ দশমিক ৫ কোটি মানুষ) কর্মক্ষম বয়সের অন্তর্ভুক্ত। বৃহৎ যুব জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তিতে পরিণত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সদ্ব্যবহারে যুবপ্রবাহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে—সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সমন্বয়ের জন্য কেন্দ্রীয় কোনো কমিশন না থাকলে এই সম্ভাবনা ‘জনমিতিক বোঝা’য় পরিণত হতে পারে, যা উচ্চ যুব বেকারত্ব এবং সামাজিক অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি বার্ধক্যমুখী জনসংখ্যার চাহিদা মোকাবিলা ও তাদের সঠিক ব্যবহার বাংলাদেশকে করতে হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৭ শতাংশ জনসংখ্যা (প্রায় ১ দশমিক ২ কোটি মানুষ) ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একটি জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা, বয়স্কদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা এবং সংকুচিত কর্মশক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং টেকসই নগর উন্নয়ন। ফলে জনমিতিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিক জনমিতিক প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দরকার; যা একটি নতুন কমিশন বা মন্ত্রণালয় গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রাধিকার পেতে পারে।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের উন্নয়নে সঠিক উপাত্তনির্ভর পরিকল্পনা বা গুণগত তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যানীতি প্রণয়নের জন্য সঠিক ও নির্ভরযোগ্য জনমিতিক তথ্য অপরিহার্য। জন্মহার, মৃত্যুহার, অভিবাসন ইত্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ দরকার। একটি জনসংখ্যা কমিশন এ ক্ষেত্রে যে কাজগুলো করতে পারে—১. প্রজননহার, অভিবাসন ও বার্ধক্য নিয়ে প্রামাণ্যনির্ভর নীতি-কৌশলগত গবেষণা করা, ২. জনগণনার তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করা, ৩. জাতীয় পরিকল্পনায় প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রদান করা। ফলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং পরিকল্পনা কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত হতে পারে জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয়।
ষষ্ঠত, জাতীয় উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নে জনসংখ্যাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সব সময় বিবেচনায় রাখা এবং জনসংখ্যানীতিকে অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীলতার ওপর জনসংখ্যাগত প্রবণতা সরাসরি প্রভাব ফেলে থাকে। বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই ‘জনসংখ্যা পরিকল্পনা’ একটি কৌশলগত উন্নয়ন ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। জলবায়ুজনিত অভিবাসন ও নগর চাপ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।
জীবন-জীবিকার চাহিদায় নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় আসছে, অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর ঘটছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের নগরায়ণ–সম্পর্কিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা (বৃহত্তর) শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখে পৌঁছে গেছে, যা এর ধারণক্ষমতাকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে। ফলে নগরায়ণ ব্যবস্থাপনায় ঢাকার মতো শহরে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ুজনিত অভিবাসন মোকাবিলায় এবং ক্রমবর্ধমান বার্ধক্যমুখী জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রয়োজন; যা হতে পারে জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয়।
সপ্তমত, নীতিগত সমন্বয় সাধনে একটি পৃথক কমিশন বা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন, যার মূল লক্ষ্য হবে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রদান এবং জনসংখ্যা বিষয়কে অভিবাসন, বার্ধক্য ও শ্রমবাজারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখা। এর মাধ্যমে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে বহু খাতভিত্তিক সমন্বয়সহ আধুনিক জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন ইস্যুতে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশে একটি জনসংখ্যা মন্ত্রণালয় বা কমিশন থাকলে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তুলনায় নগর-পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করে জনসংখ্যার বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারত।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ‘জনসংখ্যা ও উন্নয়ন’ এজেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে, যেখানে জনসংখ্যাকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশেও উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে সব সময় জনসংখ্যাকে স্থান দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে একটি জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয় গঠন করলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ব্যবস্থাপনা, নীতির সমন্বয়, জনমিতিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি এবং টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে। জনসংখ্যা উন্নয়নের কেন্দ্রে চলে আসবে, নীতিগত সমন্বয় জোরদার করবে—সুশাসন ও কার্যকর নীতিনির্ধারণ, আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে কাজ করবে।
বাস্তবতার নিরিখে সরকার চাইলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ (যেমন ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়া) কীভাবে তাদের জনসংখ্যাবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা কমিশন গঠন করেছে, তা থেকে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় অত্যন্ত ‘উচ্চ জনঘনত্ব’ ও ‘প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার’ নিশ্চিত করা এবং ‘দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা’য় রূপান্তর কার্যকরভাবে পরিচালনা করার পরিপ্রেক্ষিতে মানব পুঁজি তৈরিতে জনসংখ্যাকে অগ্রাধিকারমূলক এজেন্ডা হিসেবে দেখার জন্য বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত জনসংখ্যা কমিশন বা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেই আমি মনে করি।
● ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: mainul@du.ac.bd
*মতামত লেখকের নিজস্ব