বাংলাদেশে শহরের অলিগলি থেকে নদীর তলদেশ পর্যন্ত বর্জ্য ছড়িয়ে আছে অবাধে। পাহাড়সম আবর্জনার স্তূপ যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী।
বাংলাদেশে শহরের অলিগলি থেকে নদীর তলদেশ পর্যন্ত বর্জ্য ছড়িয়ে আছে অবাধে। পাহাড়সম আবর্জনার স্তূপ যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী।

মতামত

আবর্জনা যখন লুকিয়ে থাকা সম্পদ

প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ চাকরি, পড়াশোনা কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশে যান। অনেকেই ফিরে এসে প্রায় একই কথা বলেন, সেখানে নেমেই চোখে পড়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা। বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ নয়। সিনেমা, টিভি শো কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদ দেখলেও স্পষ্ট বোঝা যায়, উন্নত দেশগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু হয় ঘর থেকেই।

রান্নাঘর ও বাথরুমের জৈব বর্জ্য একদিকে; কাগজ, কার্ডবোর্ড ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আরেক দিকে। আর যেগুলো রিসাইকেল করা যায় না, সেগুলো আলাদা করে রাখা হয়। এই আলাদা করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল প্রশ্ন হলো কোন ধরনের বর্জ্য কোথায় যাবে, কীভাবে পুনর্ব্যবহার বা পুনঃচক্রায়ন হবে এবং কোনটি শেষ পর্যন্ত ল্যান্ডফিলে যাবে। এই পুরো প্রক্রিয়াই পরিকল্পিত।

বাংলাদেশে শহরের অলিগলি থেকে নদীর তলদেশ পর্যন্ত বর্জ্য ছড়িয়ে আছে অবাধে। পাহাড়সম আবর্জনার স্তূপ যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অথচ আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা, যারা নব্বইয়ের দশকে ভয়াবহ গণহত্যার ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছিল, তারাই আজ পরিচ্ছন্ন শহর গড়ার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তাহলে আমরা পারব না কেন?

সত্তরের দশকে বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম প্রায় একই রকম দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে ছিল। মাথাপিছু আয় ছিল এক শ থেকে নয় শ ডলারের মধ্যে। চার দশক পর দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর উন্নত দেশের কাতারে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামও দ্রুত এগিয়েছে। বাংলাদেশও এগিয়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে দেয়, শিল্পায়ন, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সুশাসনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও নগর ব্যবস্থাপনাও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানসিকতা। ময়লা ফেলা আমার কাজ, পরিষ্কার করা সরকারের কাজ—এই ধারণা বদলাতে হবে। নাগরিক হিসেবে বর্জ্য আলাদা করে দেওয়া ও নির্দিষ্ট স্থানে রাখা নৈতিক দায়িত্ব

আমরা যাকে প্রতিদিন আবর্জনা বলে ফেলে দিই, একটু ভিন্নভাবে তাকালে সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি সুপ্ত খনি। অথচ এই আবর্জনাই হতে পারে জ্বালানি, সার ও কর্মসংস্থানের উৎস।

জনবহুল বাংলাদেশের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিসংখ্যান বলছে, সিটি করপোরেশন কিছু উদ্যোগ নিলেও তার বেশির ভাগই অপর্যাপ্ত। বর্জ্যের সামান্য অংশ প্রক্রিয়াজাত হয়, বাকিটা জমে থাকে বটমলেস ল্যান্ডফিলে। ফলে নির্গত হয় মিথেনের মতো শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। বর্ষায় এই বর্জ্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে জলাবদ্ধতা বাড়ায়। প্লাস্টিক ও পলিথিন মাটির উর্বরতা শক্তি কমাচ্ছে, নদীকে ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় করে তুলছে। এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও কৃষিতেও।

এই দুই সংকটের সমাধান আসলে লুকিয়ে আছে ওই বর্জ্যের স্তূপেই। সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারণা বলে, বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। কমানো, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃচক্রায়নের পাশাপাশি যুক্ত করতে হবে পুনরুদ্ধার, অর্থাৎ বর্জ্য থেকে শক্তি ও সার উৎপাদন। এর শুরু হতে হবে উৎস থেকেই। বাসা, বাজার, রেস্তোরাঁ ও শিল্পকারখানায় পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা না করলে পরের সব ধাপই ব্যর্থ হয়।

এ কাজ শুধু প্রচারণায় হবে না। দরকার আইন, তদারকি ও প্রয়োজনে জরিমানা। একই সঙ্গে মানুষকে বোঝাতে হবে বাড়িতে বর্জ্য আলাদা করা কোনো
বাড়তি ঝামেলা নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার ভিত্তি। তরুণ বেকারদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেতে পারে সংগ্রহ ও পৃথক্‌করণে। স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে খাল, নদী ও জলাশয় পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন অ্যাপ চালু করা সম্ভব, যেখানে বর্জ্য সংগ্রহকারী ও সরবরাহকারীরা আর্থিক প্রণোদনা ও
স্বীকৃতি পাবেন।

বাংলাদেশের বর্জ্যের বড় অংশই জৈব। খাবারের উচ্ছিষ্ট, সবজির খোসা ও বাজারের পচা অংশ অ্যানারোবিক ডাইজেশন প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করে বায়োগ্যাসে রূপান্তর করা যায়। সেখান থেকে পাওয়া জৈব সার রাসায়নিক সারের বিকল্প হতে পারে। এতে মাটির স্বাস্থ্য ফিরবে, কৃষকের খরচ কমবে। অন্যদিকে প্লাস্টিক, কাগজ ও ধাতু রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে পাঠিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি করা সম্ভব। তবে যেসব প্লাস্টিক রিসাইকেল করা যায় না, সেগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গেলে পরিবেশ সুরক্ষার কঠোর মান নিশ্চিত করতে হবে।

এই সমন্বিত ব্যবস্থার সুফল বহুমাত্রিক। পরিবেশদূষণ কমবে, ল্যান্ডফিলের চাপ হ্রাস পাবে, জলবায়ুঝুঁকি কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে। বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জ্বালানি–নিরাপত্তা বাড়াবে। জৈব সার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। সবচেয়ে বড় কথা, পুরো প্রক্রিয়ায় বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বাস্তবতার পথে বাধাও আছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বড় বিনিয়োগ এবং মানুষের অভ্যাস বদলানো সহজ নয়। সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে নীতিমালা, মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে। পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপে বেসরকারি খাত যুক্ত হলে গতি আসতে পারে। সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্ষম ও তথ্যভিত্তিক হতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের ল্যান্ডফিলগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আধুনিক কংক্রিটভিত্তিক ল্যান্ডফিলের বদলে বটমলেস ল্যান্ডফিল তৈরি করে পরিবেশ, কৃষিজমি ও মানুষের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানসিকতা। ময়লা ফেলা আমার কাজ, পরিষ্কার করা সরকারের কাজ—এই ধারণা বদলাতে হবে। নাগরিক হিসেবে বর্জ্য আলাদা করে দেওয়া ও নির্দিষ্ট স্থানে রাখা নৈতিক দায়িত্ব। স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যুক্ত করলে নতুন প্রজন্মের অভ্যাস বদলাবে।

  • ইমতিয়াজ মির্জা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

    মতামত লেখকের নিজস্ব