
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটি পুরোনো গল্প মনে পড়ে গেল। একদিন গাছের ডালে বসে দা দিয়ে সেই ডালই কাটছিলেন হোজ্জা। তা দেখে এক পথচারী চেঁচিয়ে বলল, ‘আরে, করছ কী? তুমি তো পড়ে যাবে!’ খানিক পর হোজ্জা সত্যিই ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে গেলেন। তখন পথচারীর উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘ভাই, তুমি তো দেখছি ভবিষ্যৎ জানো। বলো তো, আমি কবে মারা যাব?’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চলতি আচরণ অনেকটা হোজ্জার মতো। তিনি নিজেই যেন নিজের বিপদ ডেকে আনছেন। এ বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তিনি ব্যালটে নেই, কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টিকে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অথচ নিজের দলকে জেতাতে সাহায্য করার বদলে ট্রাম্প এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা রিপাবলিকান প্রার্থীদের কাজ আরও কঠিন করে তুলছে।
ট্রাম্প ও তাঁর দলের জন্য সবচেয়ে বড় গলার কাঁটা হলো ইরান যুদ্ধ। দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশায় শুরু করা এই যুদ্ধ এখন ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বেড়েছে। রয়টার্সের সর্বশেষ জরিপে মাত্র ৩৪ শতাংশ মানুষ ইরানে মার্কিন হামলা সমর্থন করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা অনুমোদন করেছে আরও কম—মাত্র ১৭ শতাংশ।
দাম বাড়ার কারণ অবশ্য শুধু ইরান যুদ্ধ নয়। বাণিজ্যে সমতা আনার নামে ট্রাম্প যে ব্যাপক আমদানি শুল্ক আরোপ করেছেন, তার প্রভাবও বিভিন্ন পণ্যের দামে পড়েছে। সম্প্রতি কানাডার সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্যবিরোধে জড়িয়েছে তাঁর প্রশাসন। পাল্টাপাল্টি শুল্কের ফলে বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোতে উদ্বেগ বেড়েছে। যেমন মেইন। সেখানে নিজের আসন ধরে রাখতে কঠিন লড়াইয়ে পড়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স। তিনি প্রকাশ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের কানাডা-শুল্কের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই শুল্ক মেইনের ব্যবসা, কৃষক, জেলে ও সাধারণ পরিবারের খরচ বাড়াবে। নিজের দলের প্রেসিডেন্টের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই এখন তাঁকে ভোটারদের কাছে যেতে হচ্ছে।
একই সমস্যা ট্রাম্পের অভিবাসননীতি নিয়েও। দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি কঠোর অভিবাসননীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অননুমোদিত প্রবেশ কমাতে তাঁর প্রশাসন সাফল্যও দাবি করতে পারে। কিন্তু দেশের ভেতরে ব্যাপক ধরপাকড় ও বহিষ্কার অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসন এখন নতুন রাজনৈতিক সমস্যায় পড়েছে।
এই অভিযানে হিস্পানিক জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ে হিস্পানিক ভোটারদের বাড়তি সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখন সেই সমর্থনে ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ জরিপে মাত্র ৩৯ শতাংশ হিস্পানিক মানুষ ট্রাম্পের অভিবাসননীতি সমর্থন করেছে। এই প্রবণতা নভেম্বর পর্যন্ত টিকে থাকলে হিস্পানিক ভোট গুরুত্বপূর্ণ, এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকায় রিপাবলিকান প্রার্থীরা সমস্যায় পড়তে পারেন।
এটি যে কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়, তার প্রমাণ মিলেছে ফ্লোরিডায়। তিনবার নির্বাচিত রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মারিয়া এলভিরা সালাজার তাঁর পুনর্নির্বাচনী প্রচারের একটি বিজ্ঞাপনে সরাসরি ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেছেন, ২০২৪ সালে যেসব হিস্পানিক ভোটার ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিলেন, তাঁরা আজ প্রতারিত বোধ করছেন।
ইরান যুদ্ধ, শুল্ক ও অভিবাসনের বাইরেও এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের অবস্থান জনমতের সঙ্গে সংঘর্ষে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা সেন্টার তার একটি উদাহরণ।
সাম্প্রতিক এক জরিপে ৬৫ শতাংশ মানুষ নিজেদের এলাকায় এ ধরনের ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেছে; সমর্থন করেছে মাত্র ১১ শতাংশ। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন এগুলোকে আমেরিকার প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য বলে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে।
ডাকযোগে ভোট নিয়েও একই সংঘাত। দেশের ৩১ শতাংশ মানুষ ডাকযোগে ভোট দিয়ে থাকে, যাদের অধিকাংশই রিপাবলিকান। ট্রাম্প নিজেও ডাকযোগে ভোট দিতে অভ্যস্ত। অথচ কারচুপির অভিযোগ তুলে ডাকভোট বন্ধ করার নানা চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
তাহলে নীল ঢেউ কি আসছে? ৩ নভেম্বরের ব্যালটে ট্রাম্পের নাম না থাকলেও এই নির্বাচন তাঁর ওপর একটি গণভোট বা রেফারেন্ডাম। সমস্যাটা সেখানেই। ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের জরিপে তাঁর কাজের প্রতি সমর্থন দিয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ আমেরিকান। একই জরিপে নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পছন্দ করেছে ৪৩ শতাংশ, রিপাবলিকানদের ৩৫ শতাংশ।
দ্য নিউ রিপাবলিক পত্রিকার সম্পাদক মাইকেল টমাস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে নির্বাচন বাতিল করতে ট্রাম্প ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার মতো পদক্ষেপের আশ্রয় নিতে পারেন। ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধের শিরোনামেই তিনি লিখেছিলেন, নভেম্বরে ক্যু করার পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প।
বিখ্যাত নির্বাচনী বিশ্লেষক নেট সিলভারের সর্বশেষ নির্বাচনী মডেলেও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তাঁর মডেলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে ৬৫ শতাংশ। প্রতিনিধি পরিষদেও মডেলটি ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে রাখছে।
এ বাস্তবতায় ট্রাম্প ভিন্ন ছক কষছেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এখন তাঁর কথায় ওঠে, তাঁর কথায় বসে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে সে অবস্থা বদলে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।
ট্রাম্প নিজেও সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জানুয়ারিতে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের তিনি বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে ডেমোক্র্যাটরা তাঁকে অভিশংসনের চেষ্টা করবে। আর তা ঠেকাতে ছক কষছেন ট্রাম্প। এর একটি বড় ক্ষেত্র হলো নির্বাচনী মানচিত্র। ট্রাম্পের আহ্বানে টেক্সাস থেকে শুরু হওয়া মানচিত্র পুনর্বিন্যাসের ফলে কংগ্রেসে সব মিলিয়ে ৬ থেকে ১০টি অতিরিক্ত আসন দখলের আশা করছে রিপাবলিকান দল।
কিন্তু বিপদ তাতে কাটবে বলে মনে হয় না। হিস্পানিক ভোটারদের দলবদল ও নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ট্রাম্পের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। মনে রাখা দরকার, নির্বাচনী মানচিত্র বদলিয়েও একটি মৌলিক সমস্যা এড়ানো কঠিন। যেখানে মাত্র ৩২ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পের কাজে সন্তুষ্ট, সেখানে রিপাবলিকান দল যে পা হড়কে পড়তে পারে, তাতে কোনো বিস্ময়ের কিছু নেই। সে কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্প কি তার ফল মেনে নেবেন?
এই প্রশ্ন এখন আর নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। দ্য নিউ রিপাবলিক পত্রিকার সম্পাদক মাইকেল টমাস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে নির্বাচন বাতিল করতে ট্রাম্প ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার মতো পদক্ষেপের আশ্রয় নিতে পারেন। ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধের শিরোনামেই তিনি লিখেছিলেন, নভেম্বরে ক্যু করার পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প।
টমাস্কির আশঙ্কার ভিত্তি হলো ট্রাম্প-সমর্থকদের তৈরি ১৭ পৃষ্ঠার একটি খসড়া নির্বাহী আদেশ। তাতে ২০২০ সালের নির্বাচনে কথিত চীনা হস্তক্ষেপকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে সেই নির্বাচনের ফল বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে। টমাস্কির আশঙ্কা, ২০২০ সালে যা ট্রাম্প বাস্তবায়ন করতে পারেননি, ২০২৬-এ এসে তা করার চেষ্টা করতে পারেন।
কিছুদিন আগে এমন সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প তা সরাসরি নাকচ না করে বলেন, ‘এর আগেও তো অবাক সব কাণ্ড হয়েছে। আপাতত এর চেয়ে বেশি কিছু বলব না।’
অতএব, ৩ নভেম্বরের নির্বাচন ঘিরে প্রশ্ন শুধু কে জিতবে, তা নয়। আরেকটি প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে—ফল তাঁর বিপক্ষে গেলে ট্রাম্প তা কতটা সহজে মেনে নেবেন?
হোজ্জা অন্তত ডাল ভেঙে পড়ে যাওয়ার পর বুঝেছিলেন, বিপদটা কোথা থেকে এসেছিল। ৩ নভেম্বর জানা যাবে, ট্রাম্পও তা বুঝেছেন কি না।
● হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
* মতামত লেখকের নিজস্ব