মহিউদ্দিন আহমদের কলাম

মব প্রেশার গ্রুপ নয়, এটি নির্জলা সন্ত্রাস

একটি কাঠামো বা ব্যবস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে বা ভেঙে পড়লে সেটিকে আবার দাঁড় করানো খুব কঠিন। অসম্ভবও মনে হতে পারে। উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলোর এই এক সমস্যা। ঔপনিবেশিক আমলের কাঠামো রয়ে গেছে। তার ওপর পলেস্তারা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে দেশ। নতুন যা কিছু তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, তার ওপর পুরোনো কাঠামোর প্রভাব রয়েই গেছে।

ফলে আমাদের রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারছে না। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটছে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু নাগরিক স্বাধীনতা কোথায়?

স্বাধীনতার ব্যাপারটি আপেক্ষিক। যখন কেউ ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকেন, তখন তিনি নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার হন। কিন্তু যখনই তিনি ক্ষমতার অন্দরমহলে ঢুকে পড়েন, তখন তাঁর মুখ দিয়ে একটা বচন বের হয়—স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। কিংবা বলেন, আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, কিন্তু সমালোচনা হতে হবে ‘গঠনমূলক’।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কি কোনো সীমা আছে? অবশ্যই আছে। এই সীমা নির্ধারণ করে দেয় রাষ্ট্র। কিন্তু এটি নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা বা পরামর্শ করে হয় না। বিষয়টি এভাবেও বলা যায়, স্বাধীনতার পরিধি নিয়ে সমাজে ঐকমত্য নেই। ফলে সমাজের এক অংশের চোখে যেটি ন্যায্য, অন্যের চোখে সেটি অন্যায্য হয়ে যায়। একটি উদাহরণ দিই।

ধরা যাক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কেউ একজন ধুয়া তুলল, বইটি খারাপ। এতে আমাদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। যে এটি বলে, তার হয়তো একটি সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচিতি আছে। তো তার সঙ্গে জুটে যায় এক দঙ্গল লোক, অথবা সে-ই তার উত্তেজক কথাবার্তা দিয়ে লোক জুটিয়ে ফেলে। তারপর তারা দল বেঁধে চড়াও হয় ওই দোকানে, যেখানে বইটি বিক্রি হচ্ছে। সেখানেই শেষ নয়। এরপর তারা বইটির লেখক বা প্রকাশকের ওপর হামলা করে তাঁকে কান ধরে ওঠবস করায়, মারধর করে কিংবা পিটিয়ে মেরে ফেলে। এটা নিয়ে দুটো পক্ষ হয়ে যায়। এক পক্ষ বলে, ‘হামলাকারীরা’ মব। অন্য পক্ষ বলে, এটি মব নয়; ‘প্রেশার গ্রুপ’।

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে অজুহাত হিসেবে নিয়ে এই ‘হত্যা’–কে একধরনের ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা হতো। অনেকেই ভাবত, লোকটা তো আসলেই ক্রিমিনাল। মামলা হলে তো সে খালাস পেয়ে যেত। তারপর আবার অপরাধে জড়াত। মেরে ফেলাতে ভালোই হলো। এই ভাবনার পেছনে এই বিশ্বাস কাজ করে যে আমাদের বিচারব্যবস্থা অকার্যকর।

সম্প্রতি ঢাকায় একটি ‘মব–কাণ্ড’ ঘটেছে। মিরপুরে অনেক পুরোনো ও সুপরিচিত একটি মাজারে একদল শাস্ত্রবাদী সংঘবদ্ধ হামলা করেছে। তারা নিজের বিশ্বাসকে অন্যের বিশ্বাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেকটি উদাহরণ তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে, সেখানে অনেক ‘অনৈতিক’ কাজ হয়। তো এটি দেখার জন্য রাষ্ট্র আছে। এটি ‘মোকাবিলা’ করার লাইসেন্স তোমাদের কে দিল? অনেক বছর ধরেই চলছে তাদের উৎপাত। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এটি প্রশ্রয় পেয়ে লাগামছাড়া হয়। এখনো তার রেশ থেকে গেছে।

‘মব’–কে ন্যায্যতা দিতে মববাদীরা ‘মব জাস্টিস’-এর তত্ত্ব হাজির করলেন। এই তত্ত্বের সারকথা হলো, রাষ্ট্র ন্যায়বিচার না করলে জনতার আদালতে তার বিচার হবে। এখানে ‘জনতা’ হলো ওই মববাদীদের জোটানো লোক, যেন তারাই ন্যায়বিচারের পিদিম জ্বালিয়ে রেখেছে।

এ দেশে ‘জনতার আদালত’ শব্দটি খুবই মুখরোচক। নেতারা হাজার হাজার মানুষের সামনে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তোলেন—সংগ্রামী ভাইয়েরা, আপনাদের হাতে বিচারের ভার দিলাম, জনতার আদালতেই বিচার হবে। তো এভাবেই জনতার আদালত জনপ্রিয় হয়ে যায়। এটাকেই হাল আমলের তাত্ত্বিকদের কেউ কেউ নাম দিয়েছেন ‘প্রেশার গ্রুপ’। অর্থাৎ চাপ (প্রেশার) না দিলে কোনো কিছু আদায় করা যায় না। কেউ কেউ হয়তো এটাকে নতুন জমানার শ্রেণিসংগ্রাম হিসেবে দেখেন। এক তাত্ত্বিক তো বলেই ফেললেন, যারা ‘আন্দোলন’–কে মব বলে, তারা ‘স্বৈরাচারের দোসর’। অতএব তাকে পেটানো জায়েজ। এ দেশে যাকে-তাকে রাজাকার বা স্বৈরাচারের দোসর ট্যাগ দেওয়া একটা ‘ন্যুইসেন্সে’ পরিণত হয়েছে।

সবাই তো এক রকম নন। অনেকেই হুজ্জত-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না, আইনের বাইরে যেতে চান না। তাঁদের চোখে ‘মব জাস্টিস’ বলে কিছু নেই। এটা হলো ‘মব ভায়োলেন্স’। এক দঙ্গল লোক যখন–তখন যার-তার ওপর কোনো একটা ছুতোয় চড়াও হয়, তাকে সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এটা যদি চলতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্র, আইন, বিচারব্যবস্থা বলে কিছু থাকবে না।

‘হাসিনা হটাও’ আন্দোলনের পর দেশে একটা স্থিতি আসবে বলে মনে হয়েছিল। সেটি হয়নি। শুরুর দিকে মানুষের মনে একধরনের স্বস্তি ও আশাবাদ কাজ করলেও ক্রমে তা বুদ্‌বুদের মতো উবে গেছে। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, এত আন্দোলন, এত ত্যাগ, এত রক্তপাত, তারপর আমরা কী পেলাম, কোথায় এলাম? এই সুযোগে কিছু লোক বলতে শুরু করেছে—আগেই তো ভালো ছিলাম! ফলে নাগরিকদের আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যে পুরোনো রাজনৈতিক ঝগড়াটা আবার উঁকি দিচ্ছে।

মবের কাজটা কী? কারা এর সঙ্গে জোটে? তাদের কী ধান্দা? এসব নিয়ে আলোচনার তেমন কিছু নেই। আমরা চোখের সামনেই দেখছি, কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে এসব করে। কোথাও কোনো অঘটন ঘটলে বা নিয়মের ব্যত্যয় হলে আইনের লোকদের ত্বরিত উপস্থিতি দেখা যায় না। কিছু মানুষ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এগিয়ে আসে। তারপর তারা ব্যাপারটি রাষ্ট্র তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ছেড়ে দেয়। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় এটা হয় না।

আমরা প্রায়ই শুনি, অমুক জায়গায় গণপিটুনিতে এতজন মারা গেছে। যারা মারা গেছে, তারা প্রকৃত অপরাধী হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ‘শত্রু’–কে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। সুযোগ বুঝে অনেকেই পুরোনো হিসাব চুকিয়ে দেন। একই সঙ্গে চলে লুটপাট। ‘মবতন্ত্র’ আসলে রাজনৈতিক বিশ্বাসের আবরণে নিম্নমানের বখাটেপনা।

রাজনীতিকে আশ্রয় করে মব হৃষ্টপুষ্ট হয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে মব শক্তি পায় না, শুকিয়ে মরে। প্রশ্ন হলো, মব কেন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়? এ নিয়ে একটা বিতর্ক হতে পারে। আমার মনে হয়, রাষ্ট্রের কর্তারা যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সামর্থ্য হারান বা কোনো মতলব আঁটেন, তখন তাঁরা এটা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেন। ‘গণপিটুনি’–তে কেউ মারা গেলে নিহত ব্যক্তি যদি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর লোক হয়, কেবল তখনই রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসে। ভিকটিমকে যদি কেউ ‘ওউন’ না করে বা সে যদি কোনো প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠীর কেউ না হয়, তাহলে তাকে নিয়ে রাষ্ট্র মাথা ঘামায় না।

একটা সময় ছিল, যখন ‘বিহারি’ বা ‘রাজাকার’ বলে ধাওয়া করে ধরে পিটুনি দিয়ে মেরে ফেললে রাষ্ট্র আপত্তি করত না। আমরা এরপর দেখেছি ‘ক্রসফায়ার’ নাটক। সন্ত্রাসী বা চোরাকারবারি ধরার নামে যে কাউকে ধরে এনে গুলি করে মেরে ফেলা যেত। তারপর তাদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হতো, অমুকের নামে অতগুলো খুন, ডাকাতি কিংবা ধর্ষণের মামলা আছে। অর্থাৎ নিহত ব্যক্তিটি ভয়ংকর। সুতরাং তাকে মেরে ফেললে কোনো অসুবিধা নেই।

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে অজুহাত হিসেবে নিয়ে এই ‘হত্যা’–কে একধরনের ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা হতো। অনেকেই ভাবত, লোকটা তো আসলেই ক্রিমিনাল। মামলা হলে তো সে খালাস পেয়ে যেত। তারপর আবার অপরাধে জড়াত। মেরে ফেলাতে ভালোই হলো। এই ভাবনার পেছনে এই বিশ্বাস কাজ করে যে আমাদের বিচারব্যবস্থা অকার্যকর। প্রশ্ন হলো, আমরা কি বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজাব, নাকি রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিংবা জনতার হাতে বিচারের ভার ছেড়ে দেব?

  • মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব