সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এ জন্য সহ-উপাচার্যকে (শিক্ষা) আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষদের বর্তমান ডিন যুক্ত রয়েছেন।
আমরা প্রত্যাশা করব, এই কমিটি শুধু অতীতের অনিয়ম শনাক্ত করবে না, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নতুন প্রস্তাবও হাজির করবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে নানা রকম অনিয়মের কথা বিভিন্ন সময়ে শোনা যায়। এসব নিয়ে পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে সংবাদও হয়। কিন্তু যাঁরা নিয়োগ বোর্ডে থাকেন কিংবা নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁদের কখনো সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না।
বঞ্চিত প্রার্থীরা কখনো কখনো সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ উপস্থাপন করেন, নিয়োগের অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা তুলে ধরেন; কিন্তু ওই পর্যন্তই। এর কোনো প্রতিকারের খবর শোনা যায় না; বরং কিছুদিন পর আরেক ‘অনিয়ম’ খবরের শিরোনাম হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দুদক কিছু অনুসন্ধান চালাচ্ছে বটে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই রাজনৈতিক আক্রোশমূলক বলে মনে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গত সাড়ে ১৫ বছরের নিয়োগ পর্যালোচনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ভবিষ্যতের নিয়োগকর্তাদের জন্যও একটা সতর্কবার্তা। এই পর্যালোচনা সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নিয়মিত হওয়া দরকার। এ জন্য ইউজিসির তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরীক্ষা কমিটি থাকতে পারে
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়াতেই কমবেশি অনিয়ম ঘটে। মজার ব্যাপার হলো, এগুলোর অধিকাংশই কোনো সংবাদে আসে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা সব ধরনের নীতিনৈতিকতাকে অতিক্রম করে। এভাবে অযোগ্য বা কম যোগ্য প্রার্থী নিয়োগ পাওয়ায় যোগ্য প্রার্থীদেরও বড় অংশ এখন বিভিন্ন সূত্র থেকে তদবির বা সুপারিশ জোগাড়ের রাস্তা ধরেছেন। এটা সবাই মানবেন, শিক্ষক নিয়োগ যথাযথ না হলে উচ্চশিক্ষা স্তরে তা ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। আবার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম হলে প্রশাসনিক কাজে মেধা ও কর্মদক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়।
নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের একটি অংশ রীতিমতো সিন্ডিকেটের মতো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে থাকে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপকভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়। আত্মীয়তা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অঞ্চল বা জেলার পরিচয়—এগুলোও নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে কাজ করতে দেখা যায় কিংবা উপাচার্য বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট জেলার লোকজনকে বেশি নিয়োগ পেতে দেখা যায়। ইউজিসির বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বা নিয়োগ দিতে দেখা যায়।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কথাও প্রার্থীরা কখনো কখনো জানিয়েছেন। তবে এ ধরনের নিয়োগে সিলেকশন বোর্ডে থাকা শিক্ষকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগ দিতে দেখা যায়।
প্রার্থী কোন দল করেন কিংবা তিনি দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন বা আছেন কি না, এমন প্রশ্নও সাক্ষাৎকার বোর্ডে সরাসরি করতে দেখা গেছে। আবার এমনও হয়েছে, একজন প্রার্থী অন্য কাগজপত্রের সঙ্গে তাঁর দলীয় পরিচয়ের প্রমাণপত্রও যুক্ত করে দিয়েছেন! এসব দেখে মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপদস্থ নেতাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ তদবির-সুপারিশেও নিয়োগ পেতে দেখা গেছে।
এসব অনিয়ম শুধু আপত্তিকর নয়, ভবিষ্যতের জন্য আতঙ্কজনকও। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। আমাদের নিশ্চিত করা প্রয়োজন, কোনোভাবেই যাতে যোগ্য ও সেরা প্রার্থী বাদ না পড়েন।
নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার জন্যই নিয়োগ বোর্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা প্রায় ক্ষেত্রেই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে নিয়োগের নীতিমালা ও শর্ত আরও সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার। বিজ্ঞাপনে বিশেষ শর্ত যোগ করে কোনো প্রার্থীর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করা ঠিক নয়। সব ধরনের প্রার্থীর জন্যই তাঁর একাডেমিক ক্যারিয়ার ও সংশ্লিষ্ট দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ছাড়া লিখিত বা অন্য কোনো যাচাইমূলক পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন হলে প্রশ্নের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ যাতে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে, এ জন্য লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের আগে প্রার্থীর নাম-স্বাক্ষর বা অন্য সব চিহ্ন সরিয়ে ফেলা দরকার। সবচেয়ে ভালো হয়, লিখিত বা অন্য পরীক্ষায় কোন প্রার্থী কত নম্বর পেয়েছেন, সেটি নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দিতে পারলে।
এমনকি চূড়ান্ত নির্বাচিত প্রার্থীসহ সব প্রতিযোগীর পাবলিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর বা সিজিপিএ এবং অন্যান্য যোগ্যতা প্রকাশ করা উচিত। তাতে কোনো নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমে যাবে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া গোপন রাখার একটা অলিখিত রীতি তৈরি হয়েছে। অস্বচ্ছ নিয়োগ ও অনিয়মের বৈধতা দেওয়ার জন্যই মূলত এমনটি করা হয়।
নিয়োগ বোর্ডের প্রতিনিধি কম থাকলেও অনিয়মের সম্ভাবনা বাড়ে। প্রতিনিধি যদি বেশি থাকেন এবং তাঁরা যদি নিয়োগের জন্য তৈরি করা প্রোফর্মায় প্রার্থী সম্পর্কে তাঁদের মতামত ও সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে লিখিত আকারে জমা দেন, তবে সেগুলো ভবিষ্যতের দলিল হিসেবে কাজ করবে। নিয়োগ-পরবর্তী সময়ে ইউজিসির তদন্ত বা তদারকির ক্ষেত্রে এসব কাগজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে নিয়োগকর্তাদের মধ্যে পক্ষপাত ও অনিয়ম থাকলে সেটি এখান থেকে বোঝা সহজ হবে। ইদানীং নানা অজুহাতে অনলাইনে সিলেকশন বোর্ডের সভা আহ্বান করা হয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরাই ব্যস্ততার কারণে অনলাইনে যোগ দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের মতামত ও সিদ্ধান্ত জানিয়ে থাকেন। এভাবেও অনিয়মের সম্ভাবনা বাড়ছে।
এখানে আরেকটি ব্যাপার গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থীরা প্রায়ই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ বা যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এমনটি করা হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি অযোগ্যতা হিসেবে ধরা হবে, বিজ্ঞপ্তিতে এমন সতর্কতামূলক নির্দেশ লিখিত আকারে রাখা যায়। এ ধরনের যোগাযোগের বদলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর যোগ্যতার বিবরণসহ দুজন অধ্যাপকের লিখিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যাপারটি যুক্ত করা যায়। আর কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েক ধাপের দক্ষতা যাচাইমূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। কেবল মৌখিক পরীক্ষায় ভালো-মন্দের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা ঠিক হবে না।
নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগের শর্ত, প্রার্থীদের আবেদন ও সনদ, লিখিত বা অন্যান্য পরীক্ষার খাতা ইত্যাদি দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো ধরনের তদন্ত বা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে যাতে সেগুলো সামনে আনা যায়। প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে বর্তমানে স্ক্যান করেও এসব কাগজের সফট কপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। চূড়ান্ত নিয়োগের আগে প্রার্থীর সনদ ও নম্বরপত্র কিংবা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কাগজপত্র যাচাই করে নিতে হবে। কারণ, ভুয়া বা জাল সার্টিফিকেট ও কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার উদাহরণও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গত সাড়ে ১৫ বছরের নিয়োগ পর্যালোচনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ভবিষ্যতের নিয়োগকর্তাদের জন্যও একটা সতর্কবার্তা। এই পর্যালোচনা সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নিয়মিত হওয়া দরকার। এ জন্য ইউজিসির তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরীক্ষা কমিটি থাকতে পারে। এই কমিটি নিয়োগের অনিয়মের জন্য নিয়োগকর্তাদের সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনবে।
তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
*মতামত লেখকের নিজস্ব