ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন

মতামত

সংবিধান সংস্কার এবং স্থানীয় নির্বাচনের রোড ম্যাপ কবে আসবে

বহু বছর পর দেশের মানুষ দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রে ফিরতে পেরেছে। এবারের নির্বাচন ও নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মানুষের মনে অনেক স্বপ্ন কাজ করছে। বাংলাদেশে গত এক দশকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার ব্যাপক ক্ষয় হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে নির্বাচনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার ঘাটতির বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্রেসি ইনডেক্সেও বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড রেজিম’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কার ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ নতুন বিএনপি সরকারের সামনে গণতন্ত্রের ধসে পড়া ইমারত মেরামত করার একটি মোক্ষম সুযোগ তৈরি করে দেবে। এই পদক্ষেপগুলো বিএনপি সরকারকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় বিষয়টিকে একটি সুবিধাজনক অবস্থান থেকে মোকাবিলা করার সুযোগ করে দেবে।

বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের একটি অংশ থেকে বারবার প্রশ্ন উঠছে যে সংবিধান সংস্কার ও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বর্তমান সরকারের ভাবনা কী। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সংসদ অধিবেশনে এই প্রশ্নগুলো আরও জোরালোভাবে উঠে আসছে। ইরান যুদ্ধ এবং বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি সরকারকে ব্যস্ত রাখলেও বিরোধী দলগুলো সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ট্রল বা মিম ব্যবহার করে সরকারকে সংস্কারবিরোধী প্রমাণ করার প্রচেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে।

সংবিধান সংস্কার: রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও আইনি বাস্তবতা

গণভোট আসলে ৮৪টি বিষয়ের ওপর নয়, এটি মূলত ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাবের ওপর। যার মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, উচ্চকক্ষ গঠন ও ৩০টি সম্মত প্রস্তাব বাধ্যতামূলক করার মতো বিষয়গুলো। অন্য ৩৬টি অসাংবিধানিক প্রস্তাব নির্বাহী আদেশ বা সাধারণ আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। বিগত সরকার এসব কাজ শুরু করেছে এবং এরই মধ্যে মানবাধিকার কমিশন বা পুলিশ কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া গণভোটের অপেক্ষা না করেই চলমান। তা ছাড়া বিএনপির একত্রিশ দফা সংস্কার কর্মসূচি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে থেকেই আলোচিত হয়ে আসছিল।

এই গণভোট কোনো কয়েক শ পৃষ্ঠার আইনি ড্রাফট অনুমোদনের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। প্রশ্নটি আসলে খুব সহজ। গত ১৫ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আইনি ভিত্তি দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের পথে এগোনোর জন্য জনগণের নীতিগত সম্মতি আছে কি না। এবং জনগণ উত্তরটি খুব স্পষ্টভাবে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। এটি জনগণের ম্যান্ডেটকে আরও শক্তিশালী করেছে। যে ৬৯ শতাংশ জনগণ সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিএনপিকে ভোট দেওয়া অন্তত ৩৫ শতাংশ ভোটার রয়েছেন।

আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরনের সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে, ২০১০ সালে কেনিয়ার সংবিধান সংস্কার গণভোটে প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটার সমর্থন দিয়েছিলেন, যা বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইভাবে চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় গণভোট জনগণের ম্যান্ডেট নিশ্চিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, গণভোটে জয়ী হলেও বিজয়ী দল ৮৪টি প্রস্তাব অন্ধভাবে বাস্তবায়নে বাধ্য নয়। উচ্চকক্ষ গঠন ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিজয়ী দল নিজেদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পাবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী পদে একাধিকবার থাকার নিষেধাজ্ঞা, সরকারি কর্ম কমিশন, দুদক ও মহাহিসাবনিরীক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার মতো কিছু প্রস্তাবে বিএনপির সই অন্য দলের ভিন্নমত রয়েছে। এই অসম্মতিগুলোর ভিত্তিতে জয়ী দল সংসদে প্রস্তাবগুলো পরিবর্তন বা বাদ দিতে পারবে। এমনকি উচ্চকক্ষ বাধ্যতামূলক হলেও এর কাঠামো ও নিয়ম ঠিক করার ক্ষমতা নির্বাচিত সংসদের হাতেই থাকবে। অর্থাৎ ক্ষমতার চাবি কোনো অজানা জায়গায় হস্তান্তরিত হচ্ছে না।

বর্তমানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিএনপি বলছে যে বর্তমান সংবিধানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে এমন পরিষদ গঠন সম্ভব নয়। গণভোটে জয়ের পর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও তাঁরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর অতিরিক্ত শপথ গ্রহণ করেননি। তাঁদের এই দাবি সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও সমর্থন করেন। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের হাতেই ন্যস্ত। এই অবস্থায় আলাদা কোনো সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হলে হয় সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন, নয়তো এটিকে একটি পরামর্শমূলক সংস্থা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ককে জটিল করে তুলছে।

বিপক্ষ শক্তি অবশ্য দাবি করছে যে কেবল সংবিধান মেনে চললে খোদ নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন আসতে পারে। এমন অবস্থায় বিএনপি থেকে বিরোধী দলকে নোটিশ দিয়ে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঈদের পর হয়তো এ নিয়ে আলোচনা হবে। তবে সংস্কারের দায়ভার কেবল বিরোধী দলের নয়, সংখ্যাগুরু দল হিসেবে প্রধান দায়িত্ব বিএনপিরই। জনগণ তাদের ওপর যে বিপুল ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে তাদের প্রতিজ্ঞা পালন করতে হবে। বিএনপি নির্বাচনের সময়ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালিয়েছে এবং জুলাই চার্টার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। আমরা তাই দলের নেতাদের ওপর আস্থা রেখে জানতে চাই যে কোন প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করা হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে হলেও জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত।

একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপে অন্তত তিনটি ধাপ থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, ১৮০ দিনের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও খসড়া প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী তিন মাসে সংসদীয় প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনে গণভোট। এবং তৃতীয়ত, বাস্তবায়নের জন্য একটি স্পষ্ট ট্রানজিশন প্ল্যান। নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়া সংস্কারের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় আটকে যেতে পারে। তাই জনমনে আস্থা ফেরাতে বিএনপির পক্ষ থেকেই একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ আসা প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার: আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বনাম জনআকাঙ্ক্ষা

বিগত সরকারের সময় জাতীয় নির্বাচনের আগে যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাওয়া হয়েছিল, তখন বিএনপি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনের অবস্থান নিয়েছিল। মানুষও সেই দাবি মেনে নিয়েছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর এখন সব জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যদিও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়ে বলেছেন যে এ বছরেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কার্যক্রম আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় শাসন বিশ্লেষণেও এই প্রবণতা উঠে এসেছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় জবাবদিহি কমছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য হারাচ্ছে। টিআইবির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১-২৩ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে প্রশাসক থাকায় পরিচ্ছন্নতা বাজেটের মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা ভোটারদের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে, যা দূর করতে সরকারের বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিএনপির ইশতেহারে স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার কথা উল্লেখ রয়েছে। আদালতের রায়েও বলা আছে যে স্থানীয় উন্নয়নকাজ করবে স্থানীয় প্রশাসন আর সংসদ সদস্যদের কাজ হবে আইন প্রণয়ন করা। অথচ আমাদের দেশের সংসদ সদস্যরা স্থানীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে গিয়ে স্থানীয় সরকারকে নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। দেশের স্বার্থেই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। এর জন্য কেবল আইন নয়, নির্বাচনও জরুরি।

নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের কথা উঠলেও বর্তমানে তা নিয়ে আলোচনার গতি ধীর। এটি ঠিক যে শুষ্ক মৌসুম ছাড়া, অর্থাৎ অক্টোবরের আগে বড় পরিসরে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবে তা সফল করতে জুলাই মাস থেকেই রোডম্যাপ প্রস্তুত রাখা উচিত।

ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোয় স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন আলাদা সময়ে আয়োজন করে স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করা হয়েছে।

বিশেষ করে, ভারতের ৭৩ ও ৭৪তম সংশোধনী স্থানীয় সরকারকে সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়ে বাজেট ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় ২০০৫ সাল থেকে সরাসরি নির্বাচনের ফলে স্থানীয় উন্নয়নে গতি এসেছে। বাংলাদেশেরও এই পথেই হাঁটা উচিত। দেশের মানুষ বহুদিন ধরে স্থানীয় প্রতিনিধি পাচ্ছে না। এলাকার সঠিক উন্নয়নের জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর অত্যন্ত জরুরি।

সংবিধান সংস্কার যেমন কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঠিক তেমনি ক্ষমতাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। এই দুটি ক্ষেত্রে দেরি হওয়া মানে গণতন্ত্র শক্তিশালী করার সুযোগ হারানো। একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। মানুষ এখন কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, সুনির্দিষ্ট তারিখ ও জবাবদিহির কাঠামো চায়।

  • সুবাইল বিন আলম সদস্য, নাগরিক কোয়ালিশন

  • এহতেশামুল হক, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অ্যাটর্নি

* মতামত লেখকদের নিজস্ব